ইউএনওসহ বিভিন্ন দফতরের ১৮ কর্মকর্তার লিখিত অভিযোগের পর সংবাদ সম্মেলন করেছেন লালমনিরহাটের আদিতমারীর উপজেলা চেয়ারম্যান ফারুক ইমরুল কায়েস। সংবাদ সম্মেলনে তিনি পাল্টা দাবি করেন, ইউএনও মুহাম্মদ মনসুর উদ্দিনই তাকে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করেছেন। এমনকি ‘একবার আমরা (সরকারি কর্মকর্তারা) ক্ষেপলে সরকারের চেয়ার থাকে না, আর আপনি তো দুই পয়সার উপজেলা চেয়ারম্যান’ বলেও হুমকি দিয়েছেন বলে অভিযোগ তুলেছেন।
এর আগে উপজেলা চেয়ারম্যান ফারুক ইমরুল কায়েসের বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ এনে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত নালিশ করেছেন ইউএনও মুহাম্মদ মনসুর উদ্দিনসহ ১৮ সরকারি কর্মকর্তা। অভিযোগপত্রে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ইউএনওকে ‘বেশি কথা বললে পিটিয়ে নরসিংদী পাঠিয়ে দেবো’- বলে হুমকি দেয়ারও অভিযোগ করা হয়েছে। এমন অভিযোগ ওঠার পর সংবাদ সম্মেলনে পাল্টা অভিযোগ তুললেন উপজেলা চেয়ারম্যান।
গতকাল শনিবার (১৪ নভেম্বর) বিকালে লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার ভাদাই ইউনিয়নের আদিতমারী উত্তরপাড়া এলাকায় নিজবাড়ীর উঠানে সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যের পর সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন উপজেলা চেয়ারম্যান ফারুক ইমরুল কায়েস। এসময় লিখিত বক্তব্যের দুই পৃষ্ঠার কাগজ গণমাধ্যম কর্মীদের নিকট সরবরাহের পাশাপাশি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ মনসুর উদ্দিনের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগের বিভিন্ন প্রকল্পের কাগজসহ ৫১ পৃষ্ঠার ‘প্রমাণাদি’ সরবরাহ করা হয়।
লিখিত বক্তব্যে উপজেলা চেয়ারম্যান বলেন, ‘গত বৃহস্পতিবার(১২ নভেম্বর) আমার বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসক মহোদয়ের নিকট অসত্য ও মনগড়া অভিযোগ করা হয়েছে। মূলত সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনি প্রকল্পের আওতায় সুবিধাভোগী ব্যক্তির তালিকায় ব্যাপক অসংগতি ও অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এসব বিষয়ে ১২ নভেম্বরের সমন্বয় সভায় ভিজিডি কার্ড বিতরণ ও তালিকা প্রস্ততকরণে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাসহ দায়িত্বশীলদের অনিয়ম ও দুর্নীতি না করার তাগিদ প্রদান করি। এতে উপজেলা নির্বাহী অফিসারসহ ওই কর্মকর্তা আমার উপর ক্ষিপ্ত হয়ে অশোভন আচরণের চেষ্টা করলে আমি সম্মান রক্ষার্থে সভাস্থল ছেড়ে নিজ কক্ষে চলে আসি। আসার সময় করিডোরের সিসিটিভির সংযোগটি বিচ্ছিন্ন দেখতে পেয়ে আমার ব্যক্তিগত কর্মকর্তাকে সেটি পরীক্ষার জন্য বলি। এসময় ইউএনও সেখানে উপস্থিত হয়ে আমার সহকারী হুমায়ুন এর সাথে অশালীন আচরণ করে মারপিট করতে তেড়ে যান। তাকে ইউএনও বলেন, ‘তোর কোন বাবার অর্ডারে এখানে উঠেছিস, মোবাইল কোর্ট করে চৌদ্দ শিকের ভাত খাওয়ায় ছেড়ে দিব। তোর কোন বাপ আছে তোকে বাঁচায় দেখবো।’
তিনি অভিযোগে বলেন, ‘হুমায়ুন হতবম্ভ হলে আমি এগিয়ে যাই এবং বলি সংযোগটি ছেঁড়া মনে হলো তাই আমি উঠতে বলেছি। আমার কথা শেষ হতে না হতেই ইউএনও বলেন, ‘উপজেলা কি বাপ-দাদার পৈত্রিক সম্পত্তি মনে করেন মিয়া। এখানে ঘাস খেয়ে আসিনি। পাঁচ বছরের জন্য চেয়ারম্যান হয়ে ভাব দেখান না-কি। আমরা ক্ষেপলে সরকারের চেয়ার থাকে না, আপনি তো দুই পয়সার চেয়ারম্যান।’
তিনি আরো অভিযোগ করেন, ‘উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ মনসুর উদ্দিন এ উপজেলায় যোগদানের পর থেকে উপজেলাটিকে দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করেছেন। প্রত্যেকটি কাজেই উৎকোচ আদায় করেন তিনি। তার অনিয়ম দুর্নীতিতে ঠিকাদার, ইউপি চেয়ারম্যান, অধঃস্তন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অতিষ্ট হয়ে উঠেছেন। কিন্তু ভয়ে কেউ-ই মুখ খোলার সাহস পান না।’
উপজেলা চেয়ারম্যান লিখিত বক্তব্যে আরো দাবি করে বলেন, ‘ইউএনও নিজের খেয়াল খুশি মতো সরকারের অপ্রত্যাশিত খাতের টাকা খরচ করে থাকে। কোনো নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করেই কাল্পনিক প্রকল্প দেখিয়ে এবং একই প্রকল্প বারবার দেখিয়ে ব্যক্তিগত কাজে খরচ করেন। মুজিব শতবর্ষ উদযাপনের নাম করে বিভিন্ন জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী, ঠিকাদার, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিকট থেকে মোটা অঙ্কের চাঁদা তুলে নিজে আত্মসাৎ করেছেন। হাট-বাজার থেকে উত্তোলনকৃত ইজারার টাকা থেকে ১০ শতাংশ হারে কমিশন নেন। এ উপজেলায় যোগদানের পর থেকে কোনো নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে তিনি নিজেই ঠিকাদারি করেন (উপজেলার কোয়ার্টার মেরামত)। উপজেলায় নিয়মিত মাসিক সভা ও রেজুলেশন করার কথা থাকলেও ইউএনও তা না করে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ নামকাওয়াস্তে বাস্তবায়ন করে মোটা অঙ্কের টাকা আত্মসাৎ করেন। সরকারি পরিপত্র অনুযায়ী বিভিন্ন উন্নয়নমুলক কাজের বাস্তবায়ন কমিটিতে উপজেলা চেয়ারম্যান সভাপতি থাকার কথা থাকলেও তিনি অনেক ক্ষেত্রেই সে নিয়ম মানেন না। কোনো ক্ষেত্রে আমার অজান্তে এবং স্বাক্ষর ছাড়াই কাজ সম্পাদন করেন।’
তিনি আরো বলেন, ‘ইউএনও যোগদানের পর প্রথমে দুর্নীতি করার হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেন তার গাড়ি চালক আজিজুল ইসলামকে। সরকারি গাড়ি নিয়ে আজিজুল ইসলামের মাধ্যমে সরকারি চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তির নিকট টাকা আদায়, ঠিকাদারি কাজ দেওয়ার কথা বলে উৎকোচ বাণিজ্য ও ধারকর্যের কথা বলে নিরব চাঁদাবাজী করে আসছেন তিনি। এসব চরম অনিয়ম ও দুর্নীতি থেকে বিরত থাকতে ইউএনও এবং তার গাড়ি চালককে বারবার সতর্ক করা হলে নিজেকে রক্ষা করতে ইউএনও গাড়ি চালক আজিজুল ইসলামকে বরখাস্ত করলেও নিজে বহাল থেকে অনিয়ম ও দুর্নীতি করেই চলেছেন। আমি মূলত এসব সীমাহীন অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রতিবাদ করায় আমার ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে প্রতিশোধ নিতে পরিকল্পিতভাবে জেলা প্রশাসক মহোদয়ে নিকট লিখিত বানোয়াট অভিযোগ করেছেন। আমি আপনাদের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সংশ্লিষ্ট সকলের সুদৃষ্টি কামনা করছি।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ মনসুর উদ্দিন বলেন, ‘উপজেলা চেয়ারম্যান মহোদয় সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে যেসব বিষয়ে অভিযোগ করেছেন তা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। আমি এ ধরনের কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতির সাথে জড়িত নই। এছাড়া আপত্তিকর কোনো মন্তব্যও আমি করিনি।’










