রাজধানীর ধানমন্ডির বাসিন্দা আব্বাস আলী। ঈদের এ ছুটিতে গতকাল মিরপুর জাতীয় চিড়িয়াখানায় ঘুরতে আসেন সপরিবারে। স্ত্রী আর ছোট সন্তান ছাড়াও সঙ্গে ছিলেন গ্রাম থেকে আসা বাবা-মা ও ভাই-বোন। ধানমন্ডি থেকে মিরপুর-১ নম্বর পৌঁছতে তাদের সময় লেগেছে পৌনে ১ ঘণ্টা। অথচ মিরপুর গোলচত্বর থেকে জাতীয় চিড়িয়াখানার মূল ফটক—সোয়া দুই কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতেই সময় লেগেছে ১ ঘণ্টারও বেশি। তাও আবার দীর্ঘ সময় জ্যামে বসে থাকার পর গাড়ি থেকে নেমে তারা হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছেন। ফলে চিড়িখানায় ঢোকার আগেই ক্লান্ত হয়ে পড়েন সবাই। ঈদ বিনোদনের অভিজ্ঞতা জানতে চাইলে আব্বাস আলী বলেন, ‘আর কখনো চিড়িয়াখানায় আসব না।’

কেবল আব্বাস আলীই নন, নগরীর যারাই ঈদের ছুটি কাটাতে চিড়িয়াখানা কিংবা জাতীয় উদ্যানে ঘুরতে এসেছে সবাই পড়েছে চরম ভোগান্তিতে। মূলত ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনসহ (ডিএনসিসি) সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর অব্যবস্থাপনার কারণেই এ দুর্ভোগ।

সরজমিনে দেখা গেছে, চিড়িয়াখানার সামনের দেড়-দুই কিলোমিটার এলাকার ফুটপাত পুরোটাই ভ্রাম্যমাণ হকারের দখলে। দর্শনার্থীদের তাই হাঁটতে হচ্ছে মূল সড়কে নেমে। আবার সড়ক অটোরিকশার দখলে। চিড়িয়াখানার দর্শনার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হকার ও যানজটের কারণে পুরো ঈদ আনন্দ ভোগান্তিতে পরিণত হয়েছে।

সাভার থেকে পরিবারের সঙ্গে গতকাল চিড়িয়াখানায় এসেছিল দ্বাদশ শ্রেণীর শিক্ষার্থী লামিয়া। সে বলে, ‘ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্যামে বসে থেকে রাস্তায় নেমে দেখি হেঁটে যাওয়ারও সুযোগ নেই। ফুটপাত পুরোটাই হকারদের দখলে। রাস্তা দিয়েও হাঁটার সুযোগ নেই, অটোরিকশা আর বাসের কারণে। তাই অনেক কষ্ট করে এগোতে হয়। যারা একটু বয়স্ক কিংবা একেবারেই শিশু তাদের জন্য তো আরো কষ্ট।’

ফাঁকা ঢাকায় নগর বিনোদন কেন্দ্রগুলোর অব্যবস্থাপনার দায় পুরোপুরি নগর কর্তৃপক্ষের। তারা মূলত বিষয়টি ভেবেই দেখেনি—এমন মন্তব্য করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের এ সভাপতি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌এ নগরীতে দুই ধরনের মানুষ ঈদ করে। যারা এখানকার স্থায়ী বাসিন্দা, আর যাদের যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। উচ্চবিত্তরা চলে যায় দেশের বাইরে। মধ্যবিত্তরা কেউ গ্রামে, কেউ পর্যটন জোনে। যারা নগরীতে থেকে গেল, তাদের বিনোদনের জায়গাও সীমিত। ফাঁকা ঢাকায়ও যদি নগর কর্তৃপক্ষ এ স্বল্পসংখ্যক মানুষকে হাঁটার কিংবা মৌলিক সেবাগুলো দিতে ব্যর্থ হয় তাহলে ধরে নিতে হবে এ বিষয়ে তাদের কোনো আগ্রহই ছিল না।’

ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘নগর কর্তৃপক্ষ কোটি কোটি টাকা খরচ করে ঈদ মিছিল করেছে, এটা সাধুবাদযোগ্য। কিন্তু চিড়িয়াখানার সামনের হকারদের নিয়ন্ত্রণ করতে কোনো টাকাই খরচ হতো না। এই যে নিম্নবিত্ত বা নিম্নমধ্যবিত্তরা একটু স্বস্তির জন্য বিনোদন কেন্দ্রে গিয়ে আরো বেশি অস্বস্তি ও অসুস্থতা নিয়ে ফিরে আসে, এখান থেকেই বোঝা যায়, আমাদের নগর ব্যবস্থাপনা কতটা ভঙ্গুর। সত্যি বলতে, নগর কর্তৃপক্ষ চিড়িয়াখানা বা নগরীর বিনোদন কেন্দ্রগুলো নিয়ে ভাবেইনি। তারা যদি মাঠে থাকত তাহলে আমরা প্রশ্ন তুলতে পারতাম যে তারা ১০টা প্যারামিটারে পাঁচটা পেরেছে পাঁচটা পারেনি। এখন তারা তো মাঠেই নামেনি। নাগরিক হিসেবে এটা আমাদের জন্য লজ্জার—এছাড়া আর কিছু বলার নেই।’

ঈদের আনন্দ উদযাপনে গত দুইদিনেই চার লাখেরও বেশি দর্শনার্থী রাজধানীর জাতীয় চিড়িয়াখানায় ভ্রমণ করেছে। তবে বিনোদন কেন্দ্রটির প্রবেশপথের ট্রাফিক সিস্টেমের অবস্থা খুবই খারাপ। হকারের পাশাপাশি সড়কের দুই পাশে করা হয়েছে অবৈধ গাড়ি পার্কিং। ফলে চলাচলের রাস্তা সংকীর্ণ হয়ে গেছে। এ কারণে এক-দেড় কিলোমিটার রাস্তা পাড়ি দিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় লাগছে। অথচ রাজধানীর অন্য সড়কগুলো একেবারেই ফাঁকা ঈদের এ ছুটিতে। কমার্স কলেজ মোড় থেকে চিড়িয়াখানার মূল ফটক পর্যন্ত যানজট সৃষ্টি হচ্ছে, যার কারণে ভাড়া বেড়ে গেছে কয়েক গুণ।

চিড়িয়াখানায় ঘুরতে এসে সব ধরনের সেবায় দর্শনার্থীদের গুনতে হচ্ছে বাড়তি টাকা। পার্কিং এলাকায় বড় করে লেখা আছে—প্রাইভেট কার ৪০ টাকা, মোটরসাইকেল ২০ টাকা। অথচ ইজারাদাররা ঈদের কথা বলে নিচ্ছেন ২০-৬০ টাকা বেশি। বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন যাত্রাবাড়ীর গাড়িচালাক রাসেল প্রধান। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‌আমি হাইয়েস গাড়ি নিয়ে এসেছি। আমার থেকে ১০০ টাকা রেখেছে। কিন্তু লেখা আছে ৪০ টাকা। দেশটা যেন মগের মুল্লুক। আইনের তোয়াক্কা না করেই আমাদের পকেট কাটা হয়, তাহলে আমরা সাধরণ নাগরিকরা কোথায় যাব?’

চিড়িয়াখানার ভেতরে গিয়েও দেখা গেছে অব্যবস্থাপনা। পাবলিক টয়লেট ছিল অপ্রতুল। তার ওপর ৫ টাকার জায়গায় নেয়া হয়েছে ১০ টাকা করে। ভেতরে খাবারের নির্দিষ্ট দোকান ছাড়াও অনেক হকারকে আইসক্রিম, জুস, চিপস ও পানি বিক্রি করতে দেখা গেছে। তবে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে কোলের শিশুদের নিয়ে। মানুষের ভিড়ে তাদের অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ে।

অন্যান্য বছরের চেয়ে এ বছর নগরের বিনোদন কেন্দ্রগুলো আরো বেশি আরামদায়ক হওয়ার প্রত্যাশা ছিল নগরবাসীর। কিন্তু সেটি না হওয়া নাগরিক সেবাপ্রতিষ্ঠানের চূড়ান্ত ব্যর্থতা বলে মন্তব্য করেছেন স্থপতি ইকবাল হাবিব। বণিক বার্তাকে নগর পরিকল্পনাবিদ বলেন, ‘‌সিটি করপোরেশনে কারো চিন্তায় এল না, ওই এলাকায় হাজার হাজার মানুষ আসবে। তাদের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করার জন্য একটা ব্যবস্থা রাখি, হকারদের বসতে দেয়া হবে না। আবার যারা পার্কিং, পাবলিক টয়লেট ইজারা নিয়েছে, তাদের সঙ্গে বসে বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলি—কারো মাথায় এসব চিন্তা আসেনি। তারা (নগর কর্তৃপক্ষ) ঈদ মিছিল নিয়ে উচ্ছ্বসিত। প্রচারসর্বস্ব অনুষ্ঠান আগেও যেমন ছিল, এখনো তাই হচ্ছে নাগরিক সেবাপ্রতিষ্ঠানগুলোয়। কিন্তু নাগরিক সেবার মূল যে জায়গা, সেখানে কোনো পরিবর্তন আসেনি। ফাঁকা ঢাকার চরম অব্যবস্থাপূর্ণ বিনোদন কেন্দ্রগুলোই তার প্রমাণ।’

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএনসিসির প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চিড়িয়াখানা এলাকায় হকার, পার্কিংসহ যেসব অনিয়ম হয়েছে সেগুলো সমাধান করে উচ্ছেদ করা হবে। নাগরিকদের নিরাপত্তা ও বিনোদনের সুযোগ আমরা গুরুত্ব দিয়ে দেখছি।’