দ্বীপ জেলা ভোলার গ্যাস অবশেষে সিএনজি (কমপ্রেসড ন্যাচারাল গ্যাস) আকারে রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে আসছে। শুরুতেই তিতাস গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের আওতাধীন শিল্প এলাকা গাজীপুরের গ্রাফিকস টেক্সটাইলে সরবরাহ হবে। সিএনজি আকারে গ্যাস আনার এ কার্যক্রম আজ বেলা ১১টায় রাজধানীর একটি হোটেলে উদ্বোধন করা হবে। সেখানে উপস্থিত থাকবেন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মো. নূরুল আলম।
দীর্ঘ দূরত্বের গ্যাস পরিবহনে সারা দেশে সঞ্চালন কোম্পানির পাইপলাইন ব্যবহার করা হয়। তবে এবারই প্রথম ভোলা থেকে নদী ও সড়কপথ ব্যবহার করে এ গ্যাস নিয়ে আসা হচ্ছে। ভোলা থেকে রাজধানী ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে গ্যাস পরিবহনে মূলত ‘ক্যাসকেড’ পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে। ক্যাসকেড হচ্ছে উচ্চচাপের গ্যাস সিলিন্ডার স্টোরেজ সিস্টেম, যেখানে অনেকগুলো ছোট ছোট সিলিন্ডার থাকে। এরপর তা কম্প্রেসার দিয়ে সিলিন্ডারে রিফিল করে বিশেষভারে রূপান্তরিত ট্রাকে বা বার্জে অন্যত্র পরিবহন করা হয়।
পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, ভোলা থেকে সিএনজি আকারে আনা গ্যাস শুরুতে তিতাসের আওতাধীন শিল্প-কারখানায় চাহিদা অনুসারে সরবরাহ করা হবে। জ্বালানি খাতের বেসরকারি কোম্পানি ইন্ট্রাকো রিফুয়েলিং স্টেশন লিমিটেড কাজটি করছে।
সিএনজি আকারে গ্যাস সরবরাহের বিষয়টি জানতে চাইলে ইন্ট্রাকো রিফুয়েলিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) রিয়াদ আলী সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘শিল্পে দৈনিক পাঁচ মিলিয়ন ঘনফুট হারে গ্যাস সরবরাহ দেয়ার সক্ষমতা তৈরি করেছে ইন্ট্রাকো। এরই মধ্যে সফলভাবে পরীক্ষা সম্পন্ন করেছি আমরা। আজ উদ্বোধনের প্রথম দিন গাজীপুরের গ্রাফিকস টেক্সটাইলে গ্যাস সরবরাহ দেয়া হবে। আমরা শিল্প-কারখানার চাহিদার ভিত্তিতে সরাসরি গ্যাস সরবরাহ করব।’
ভোলা থেকে এ গ্যাস সিএনজি আকারে আনতে কোন পথ ব্যবহার করা হয়েছে এবং কত সময় লাগছে সে বিষয়ে বিস্তারিত জানায়নি ইন্ট্রাকো। তবে গ্যাস সরবরাহ চুক্তির কাগজপত্র থেকে জানা গেছে, ভোলা থেকে গ্যাস আনার জন্য ইন্ট্রাকো ভোলার ইলিশা ঘাট থেকে লক্ষ্মীপুরের মজু চৌধুরীর ঘাট, এরপর ফেরি থেকে চৌমুহনী-ফেনী-কুমিল্লা-মেঘনা গোমতী ব্রিজ হয়ে গাজীপুরের কাঁচপুর-ভুলতা-কাঞ্চন ব্রিজ পার হয়ে গাজীপুর ও ময়মনসিংহের ভালুকা রুট ব্যবহার করবে। এ রুটে শুরুতেই দৈনিক ৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পরিবহনের পরিকল্পনা ইন্ট্রাকোর। দ্বিতীয় ধাপে দৈনিক ২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
ভোলার গ্যাস সিএনজি আকারে শিল্পাঞ্চলে সরবরাহ দেয়ার জন্য চলতি বছরের ২১ মে ইন্ট্রাকো ও গ্যাস বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (এসজিসিএল) মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির সাত মাস পর এ গ্যাস শিল্পে আসা শুরু হলো।
ইন্ট্রাকো সিএনজি আকারে ভোলার গ্যাস সরবরাহের জন্য প্রতি ঘনমিটারের মূল্য নির্ধারণ করেছে ৪৭ টাকা ৬০ পয়সা। যদিও চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর হওয়া বর্ধিত দর অনুসারে শিল্পে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ৩০ টাকা। সিএনজি ফিলিং স্টেশনে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ৪৩ টাকা। সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানির পক্ষে কোম্পানি সচিব শাহ আলম মোল্লা এবং ইন্ট্রাকোর পক্ষে ব্যবস্থাপনা পরিচালক রিয়াদ আলী ওই চুক্তিতে সই করেন।
ভোলায় এ পর্যন্ত দেড় ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস আবিষ্কার হলেও বৃহৎ আকারে সেখানে ব্যবহারের সুযোগ নেই। আবার গ্যাসের সঞ্চালন লাইন না থাকায় এ গ্যাস জাতীয় গ্রিডেও সরবরাহ করা যাচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে চলতি বছরের শুরুর দিকে ভোলার গ্যাস সিএনজি আকারে পরিবহন করে শিল্প-কারখানায় সরবরাহ দেয়ার উদ্যোগ নেয় সরকার। বিষয়টি নিয়ে পেট্রোবাংলা কাজ শুরু করে। এরপর নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও তথ্য-উপাত্ত যাচাই শেষে সিএনজি আকারে গ্যাস পরিবহনের সিদ্ধান্ত নেয় সংস্থাটি।
জানতে চাইলে পেট্রোবাংলার নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে জানান, ভোলার গ্যাস সিএনজি করে আনার জন্য ইন্ট্রাকো বেশ কয়েকদিন ধরেই পরীক্ষামূলকভাবে সিএনজি করে মূল ভূখণ্ডে আনছে। আজ এটির উদ্বোধন করার মধ্য দিয়ে কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হচ্ছে। এ গ্যাস কিছুটা হলেও শিল্পের সংকট কাটাতে সাহায্য করবে বলেও জানান তিনি।
ভোলা থেকে সিএনজি আকারে গ্যাস আনাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের ভাষ্যে, ‘পাইপলাইন নেই ভোলায়। তার অর্থ এই নয় এ গ্যাস ব্যবহারের সুযোগ নেই। নানা ধরনের প্রযুক্তির সহায়তায় এ গ্যাস মূল ভূখণ্ডের শিল্পাঞ্চলে দিলে এবং তাতে খরচ কম হলে সেটা করা উচিত।’
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক বদরূল ইমাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ভোলার গ্যাস অবশেষে আসছে, এটা ভালো খবর। আপাতত শিল্পের গ্রাহকরা এ গ্যাস নিলে তাদের কিছুটা হলেও সংকট দূর হবে। তবে সরবরাহ কত দ্রুত ও নিরাপদে করা যায় সেটাই চ্যালেঞ্জ। শিল্পে গ্যাস বৃহৎ আকারে বাড়ানো গেলে ভোলার গ্যাসও জাতীয় গ্রিডের পাশাপাশি অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’
দ্বীপ জেলা ভোলায় ১৯৯৫ সালে গ্যাসের মজুদ আবিষ্কার হয়। জেলার শাহবাজপুরে প্রথম গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করে বাপেক্স। এরপর ২০১৮ সালে ভোলা নর্থ নামে দ্বিতীয় গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার হয়। চলতি বছরে ইলিশা-১ কূপকে ভোলার তৃতীয় গ্যাসক্ষেত্র এবং দেশের ২৯তম গ্যাসক্ষেত্র ঘোষণা করা হয়। এ তিনটি গ্যাসক্ষেত্রে নয়টি কূপ রয়েছে।
গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের আড়াই দশক পেরিয়ে গেলেও ভোলা থেকে বৃহৎ আকারে গ্যাস উত্তোলন নিয়ে বড় কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি সরকারের। বিভিন্ন সময় নানামুখী পরিকল্পনা করা হলেও কখনো অর্থনৈতিক, আবার কখনো রাজনৈতিক কারণে তা পিছিয়ে গেছে। ভোলার কূপগুলোর দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা ১২০ মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু ব্যবহার হচ্ছে ৬৫ মিলিয়ন ঘনফুটের কিছু বেশি।










