বহুজাতিক কোম্পানি শেল অয়েলের মালিকানায় থাকা পাঁচটি গ্যাসক্ষেত্র কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিতাস, হবিগঞ্জ, কৈলাসটিলা, বাখরাবাদ ও রশিদপুর—এ পাঁচ গ্যাসক্ষেত্র ক্রয়ে ১৯৭৫ সালের ৯ আগস্ট চুক্তি সই হয়। গ্যাসক্ষেত্রগুলো কিনে রাষ্ট্রীয়করণ করেন তিনি। এখনো দেশীয় কোম্পানির সরবরাহকৃত গ্যাসের ৮২ শতাংশ জোগান দিচ্ছে বঙ্গবন্ধুর কেনা এ পাঁচ গ্যাসক্ষেত্র।
পেট্রোবাংলার দৈনিক গ্যাস উৎপাদন প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় তিনটি গ্যাস কোম্পানির আওতায় বর্তমানে গ্যাসের দৈনিক সরবরাহ সাড়ে ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে বঙ্গবন্ধুর কেনা পাঁচটি কূপ থেকে সরবরাহ হচ্ছে ৬৬০ মিলিয়ন ঘনফুটের কিছু বেশি গ্যাস।
দেশের জ্বালানি স্বনির্ভরতার কথা বিবেচনা করে বঙ্গবন্ধু বিপুল পরিমাণ মজুদের এ পাঁচটি গ্যাসক্ষেত্র কিনেছিলেন। এগুলো কিনতে ওই সময় ব্যয় হয়েছিল সাড়ে ৪ মিলিয়ন পাউন্ড।
গ্যাসক্ষেত্রগুলো কিনে নেয়ার সময় বঙ্গবন্ধুর একান্ত সচিব ছিলেন ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, পাঁচটি গ্যাসক্ষেত্র কিনে নেয়ার পেছনে মূলত বঙ্গবন্ধুর চিন্তা ছিল স্বয়ম্ভরতা। সে সময় শেল কোম্পানিতে তার অনেক বন্ধুবান্ধব ও ঘনিষ্ঠজনেরা ছিলেন। তারাও শেলের কাছ থেকে গ্যাসক্ষেত্র কেনার জন্য সহযোগিতা করেছিলেন তাকে। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে জ্বালানি খাতের স্বয়ম্ভরতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু বিদেশী ১৭টি কোম্পানিকে দেশের অভ্যন্তরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে সুযোগ দিয়েছিলেন। সব মিলিয়ে জ্বালানি যে একটি দেশের স্পর্শকাতর বিষয়, সেটি তিনি অনুভব করেছিলেন সে সময়।
জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, নামমাত্র মূল্যে বঙ্গবন্ধুর কেনা গ্যাসক্ষেত্রগুলো দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় এখনো সিংহভাগ জোগান দিয়ে যাচ্ছে। স্বনির্ভরতা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের গুরুত্ব বিবেচনা করলে জ্বালানি খাত কতটা স্পর্শকাতর বিষয় সেটি উপলব্ধি করা যায়।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে গতকাল আয়োজিত এক সেমিনারে উপস্থাপিত প্রবন্ধে দেখানো হয়, ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে সময় পাঁচটি গ্যাসক্ষেত্র কিনেছিলেন, সে সময় ওইসব গ্যাসক্ষেত্রে সাড়ে ১২ টিসিএফ গ্যাস রিজার্ভ ছিল। তখনকার সময়ে এ গ্যাসের আর্থিক মূল্য ছিল ৪-৫ মিলিয়ন ডলার। মজুদ এ গ্যাসের বর্তমান বাজারমূল্য ৩ লাখ ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
১৯৭১ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত দেশে আরো ১৪টি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। এসব গ্যাসক্ষেত্র স্থানীয় কোম্পানি আবিষ্কার করেছে। কিন্তু সেখান থেকে বড় ধরনের কোনো মজুদ আবিষ্কার হয়নি। গত দুই দশকে দেশে গ্যাস অনুসন্ধানে জোরালো কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। এমনকি গ্যাস অনুসন্ধান নিয়ে গত চার দশকে যেসব জরিপ হয়েছে, সেগুলোর বিষয়েও তেমন কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।
পেট্রোবাংলা ও সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, ১৯১০ সালে এ ভূখণ্ডে প্রথম গ্যাস অনুসন্ধান কূপ খনন করা হয়। এরপর ১১০ বছরে দেশে ৯০টির বেশি অনুসন্ধান কূপ খনন করা হয়েছে। তবে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত ৪১টি কূপ খনন করা হয়েছে। অর্থাৎ বছরে খনন করা হয়েছে একটিরও কম কূপ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্যাসক্ষেত্র থাকা কোনো দেশে বছরে এর চেয়ে কম কূপ খননের নজির নেই।
জ্বালানি বিভাগ সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ পর্যন্ত ৭৭টি অনুসন্ধান কূপ খনন করে ২৩টি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। এর মধ্যে ২০০২-০৮ পর্যন্ত মাত্র দুটি কূপ খনন হয়। এরপর গত ১৩ বছরে আরো ১৯টি অনুসন্ধান কূপ খনন করে পাঁচটি গ্যাসক্ষেত্র পাওয়া গিয়েছে। অর্থাৎ গড়ে প্রতি সাড়ে তিনটি কূপ খননে একটি গ্যাসক্ষেত্র পাওয়া গিয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাস অনুসন্ধানে বড় ধরনের উদ্যোগ না নেয়ায় উল্লেখযোগ্য নতুন মজুদ আবিষ্কৃতও হয়নি। এর বিপরীতে আমদানিনির্ভরতায় জোর দেয়া হয়েছে। তার নেতিবাচক ফলও দেখা গিয়েছে দেশের গ্যাস খাতে। চাহিদার বিপরীতে গ্যাস সরবরাহ না থাকায় শিল্প-কারখানা ও বিদ্যুৎ উৎপাদন সংকটে পড়েছে। সংকট রয়েছে আবাসিকেও।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈশ্বিকভাবে প্রতি পাঁচটি অনুসন্ধান কূপের বিপরীতে একটিতে গ্যাস পাওয়া যায়। বাংলাদেশে এর চেয়ে ভালো ফল পাওয়ার পরও গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দেয়া হয়নি।
জ্বালানি বিভাগের দাবি, ২০০৯ থেকে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত ২১টি অনুসন্ধান কূপ, ৫০টি উন্নয়ন কূপ ও ৫৬টি ওয়ার্কওভার কূপ খননের ফলে দেশীয় উত্স থেকে এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন বেড়েছে। এ সময়ে আধুনিক চারটি রিগ কেনা হয়েছে। পাঁচটি নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। ৩১ হাজার ৫০২ কিলোমিটার টুডি সিসমিক জরিপ এবং ৬ হাজার ৬১ কিলোমিটার থ্রিডি সিসমিক জরিপ কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। একই সঙ্গে গ্যাস উত্তোলন বৃদ্ধির জন্য ২২টি ওয়েলহেড কম্প্রেসার বাস্তবায়নাধীন রয়েছে।
গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধির বিষয়ে গতকাল জ্বালানি নিরাপত্তা-বিষয়ক এক সেমিনারে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী জানান, গত ১০ বছরে দেশে এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বেড়েছে। ২০০৯ সালে দেশে গ্যাস সরবরাহ ছিল ১ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট। বর্তমান সরকার সেটি ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুটে উন্নীত করেছে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও শিল্পায়নের প্রভাবে গ্যাসের চাহিদা ব্যাপক হারে বেড়ে গিয়েছে। এ কারণে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে একটা বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
দেশে এখন পর্যন্ত ২৮টি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। এর মধ্যে ২০টি গ্যাসক্ষেত্র উৎপাদনে রয়েছে, যেগুলোর মোট গ্যাস সরবরাহ সক্ষমতা ২ হাজার ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুটের কিছু বেশি। এর মধ্যে বিদেশী বহুজাতিক কোম্পানি শেভরন ও তাল্লোর নিয়ন্ত্রণে গ্যাস সরবরাহ সক্ষমতা রয়েছে ১ হাজার ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। বাকি সাড়ে ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ সক্ষমতা রয়েছে দেশীয় তিনটি কোম্পানির আওতায়।










