দেশে সমুদ্রপথে পণ্য আমদানি ও রফতানির ৯৩ শতাংশই হয় চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এ বন্দরের মাধ্যমে পণ্য ওঠানামা বাড়ছে। গত পাঁচ বছরে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে পণ্য আনা-নেয়ায় প্রবৃদ্ধি ছিল ১০ শতাংশের মতো। তবে বাণিজ্য বাড়লেও সমান্তরালভাবে বন্দরটির সক্ষমতা বাড়েনি। অপ্রতুল অবকাঠামো ভবিষ্যতের কাঙ্ক্ষিত সেবা নিশ্চিত করতে পারবে না, এমন শঙ্কাও রয়েছে। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মেরুদণ্ড হলেও অবহেলিতই রয়ে গেছে চট্টগ্রাম বন্দর।

কভিড-১৯ পরিস্থিতিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বন্দরের কার্যক্রম যেখানে সংকুচিত করে আনা হয়েছে, সেখানে উল্টো চিত্র চট্টগ্রাম বন্দরের ক্ষেত্রে। চট্টগ্রাম বন্দরে গত মাসে কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে ২ লাখ ৬৯ হাজার ৪৪৬ একক (২০ ফুট দীর্ঘ হিসেবে)। গত বছরের মার্চে হ্যান্ডলিং হয়েছিল ২ লাখ ৪৯ হাজার ৬৬৯ একক। কনটেইনারের পাশাপাশি এ বন্দর দিয়ে গত মাসে কার্গো হ্যান্ডলিং হয়েছে ১ কোটি ১০ লাখ ৪২ হাজার ৮১৮ টন, যেখানে গত বছরের মার্চে এর পরিমাণ ছিল ১ কোটি ২ লাখ ৬৪ হাজার ৪০২ টন। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় কনটেইনার ও কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ৭ শতাংশ। চট্টগ্রাম বন্দরে গত বছর কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে ২৮ লাখ ৩৯ হাজার ৯৭৭ একক।

আমদানি-রফতানি পণ্য পরিবহন এখনো আবর্তিত হচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দরকে ঘিরে। তবে এ বন্দরের সক্ষমতা উন্নয়নে বিনিয়োগ হয়েছে প্রয়োজনের তুলনায় সামান্যই। অন্যদিকে বিকল্প হিসেবে পায়রা ও মাতারবাড়ীতে সমুদ্রবন্দর স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বিনিয়োগ হচ্ছে বিপুল অর্থ। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা উন্নয়নে নেয়া বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে ভবিষ্যতের চাপও মোকাবেলা করা সহজ হতো।

জাইকার প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০২৬ সাল নাগাদ এ বন্দরের মাধ্যমে কনটেইনার পরিবহন হবে ৩৪ লাখ ৯ হাজার একক। ২০৪১ সালে তা বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় ৬৯ লাখ একক। বৈদেশিক বাণিজ্য বাড়তে থাকায় এককভাবে চাপও বাড়ছে চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর। চট্টগ্রাম বন্দরকে ঘিরে অর্থনৈতিক অঞ্চল, তৈরি পোশাক, ইস্পাত, সিমেন্ট, তেল শোধনাগার, জাহাজ নির্মাণ শিল্পসহ ব্যবসায়িক কার্যক্রম বাড়ছে পাল্লা দিয়ে। ফলে সময়মতো অবকাঠামো উন্নয়নে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ না নেয়ায় বছরের স্বাভাবিক সময়ে আমদানি-রফতানি পণ্য পরিবহনের চাপ নিতে হিমশিম খেতে হয়। ফলে জাহাজজট হয়ে আমদানি-রফতানি কার্যক্রমে ব্যয় বাড়ে ব্যবসায়ীদের।

জানা গেছে, বন্দর কর্তৃপক্ষ অন্তত ২০২১ সালের মধ্যে প্রথম ধাপে বে টার্মিনালে পণ্য ওঠানো-নামানোর কাজ শুরু করার পরিকল্পনা নিয়েছিল। এছাড়া রয়েছে মাতারবাড়ীতে বন্দর নির্মাণ, লালদিয়া মাল্টিপারপাস টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ। পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালের নির্মাণকাজ শেষ হচ্ছে আগামী ডিসেম্বরে। এটা হলে গত ১৩ বছরে চট্টগ্রাম বন্দরের উদ্যোগে নতুন কোনো সমুদ্রগামী জেটি ব্যবহারের সুযোগ পাবেন ব্যবসায়ীরা। এ টার্মিনালে কনটেইনার হ্যান্ডলিং ক্ষমতা হবে বছরে ৪ লাখ ৫০ হাজার একক। পাশাপাশি ১ নম্বর জেটির পাশে সার্ভিস জেটির কাজ ডিসেম্বরে শেষ হবে। ইয়ার্ড ও টার্মিনালের ইকুইপমেন্ট ক্রয় করা হচ্ছে ১১৪টি।

তবে বন্দর ব্যবহারকারী ব্যবসায়ীরা বলছেন, চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য যেসব প্রকল্পের কথা বলা হচ্ছে, ভবিষ্যতে চাপ সামলাতে এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বে টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প। যদিও প্রকল্পটির অগ্রগতি মোটেও সন্তোষজনক নয়। আমদানি-রফতানি পণ্য পরিবহন বাড়তে থাকায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ২০১২ সালে প্রথম বে টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। এটি নির্মাণে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের অনুমতি মেলে ২০১৪ সালে। তখন থেকে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসহ (সিডিএ) একাধিক সংস্থার অনাপত্তিপত্র নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হলেও পরে তা কেটে যায়। কিন্তু এখন পর্যন্ত বে টার্মিনালের জায়গা অধিগ্রহণই শেষ হয়নি। ভবিষ্যতের পণ্য পরিবহন চাপ সামাল দিতে বে টার্মিনাল নির্মাণ অতি দ্রুত শেষ করতে সুনির্দিষ্ট টাইম ফ্রেম বেঁধে দেয়াসহ প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য ফাস্ট ট্র্যাক প্রকল্পের আওতাভুক্ত করার দাবি বন্দর ব্যবহারকারী ব্যবসায়ীদের।

বন্দর ব্যবহারকারী ফোরাম ও চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মাহবুবুল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দরে এখনো বছরের বেশির ভাগ সময় জাহাজজট লেগে থাকার কারণ হলো, বন্দরটিতে সক্ষমতার চেয়ে বেশি পণ্য আসে। ভবিষ্যৎ চাপ সামাল দিতে এ বন্দরের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হলো বে টার্মিনাল। অথচ এখন পর্যন্ত ভূমি অধিগ্রহণকাজই শেষ হয়নি প্রকল্পটির। এ প্রকল্পের সঙ্গে সড়ক, অভ্যন্তরীণ নৌপথ ও রেলে পণ্য পরিবহনের সহজ যোগাযোগের সুবিধা রয়েছে। ফলে টার্মিনালের পাশে ঢাকামুখী সড়ক ও রেল যোগাযোগ থাকায় বিনিয়োগও সীমার মধ্যে থাকবে।’

বন্দরের তথ্যমতে, বে টার্মিনালের বড় সুবিধা হচ্ছে, এক বছর পরপর একবার রক্ষণাবেক্ষণ খননকাজ করে বন্দরে জাহাজ ভেড়ানো যাবে। ফলে বন্দর পরিচালনায় খরচও কমবে। চট্টগ্রাম বন্দরে বে টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় জমির মধ্যে মাত্র ৬৮ একরের দখল বুঝে পেয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য বাকি আরো ৮০৩ একর ভূমি মঞ্জুরির বিষয়টি ভূমি মন্ত্রণালয়ে পেন্ডিং রয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম শাহজাহান এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশের অর্থনীতি যে গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরও প্রয়োজনীয় কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। বৈশ্বিক মহামারীর এ সময়েও ২৪ ঘণ্টা বন্দরের কার্যক্রম সচল রাখা হয়েছে। বিদ্যমান সক্ষমতা ব্যবহারের পাশাপাশি বন্দরের সম্প্রসারণকাজও এগিয়ে চলছে। পতেঙ্গা টার্মিনাল এ বছরের ডিসেম্বরেই যুক্ত হচ্ছে। পাশাপাশি মাতারবাড়ী বন্দরের নির্মাণকাজও চলছে। বে টার্মিনালের জন্য এখন পর্যন্ত ৬৮ একর জমি বুঝে পাওয়া গেছে। বাকি জমির ব্যাপারে আমাদের অনুরোধে ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সারসংক্ষেপ যাবে। আশা করছি, জমি অধিগ্রহণের বিষয়টি দ্রুত অগ্রসর হবে।’

বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে ভারতের তিনটি রাজ্যে ট্রানজিট পণ্য পরিবহন শুরু হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পাইরেসি শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে। চট্টগ্রাম বন্দর আইএসপিএস কোড কমপ্লায়েন্সের জন্য সক্ষমতা বাড়িয়েছে।

বন্দর কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ উপদেষ্টা কমিটির সভায় নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ মেজবাহ্ উদ্দিন চৌধুরী বলেছেন, চট্টগ্রাম বন্দর যে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তা বারবার প্রমাণিত হয়েছে। এ বন্দর শুধু বাংলাদেশের নয়, এ অঞ্চলের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। চট্টগ্রাম বন্দর যখন তার সক্ষমতার চূড়ান্ত পর্যায়ে, তখন পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল, বে টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। আরো কীভাবে ভালো করে চট্টগ্রাম বন্দরকে সেন্টার অব এক্সিলেন্স বানানো যায়, সে ব্যাপারে সবাইকে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

এর আগে বিপুল অর্থ ব্যয়ে সরকার পায়রায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছিল। অদূরভবিষ্যতে বাণিজ্যিক সম্ভাবনা না থাকায় এবং ড্রেজিংয়ে বিপুল অর্থ ব্যয়ের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে শেষমেশ পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছে সরকার। জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) বলছে, বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও ভবিষ্যতে খুবই সীমিত পরিসরে ব্যবহার হবে পায়রা বন্দর। অন্যদিকে মোংলা বন্দরের সর্বোচ্চ গভীরতা সক্ষমতা সাত মিটার। গভীরতা কম হওয়ায় তুলনামূলক বেশি ড্রাফটের জাহাজ এ বন্দরে ভিড়তে পারে না।