পদত্যাগের পর দেশ ছেড়ে চলে গেছেন শেখ হাসিনা। গতকাল দুপুরের পর এ খবর ছড়িয়ে পড়লে সারা দেশে আনন্দ মিছিল করে ছাত্র-জনতা। তবে কিছু স্থানে মন্ত্রী, এমপি, আওয়ামী লীগ নেতা ও দলটির কার্যালয়ে ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে। এতে অনেক মানুষ হতাহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। বিস্তারিত প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরে-
চট্টগ্রাম: নগরীর প্রতিটি এলাকায় মানুষের মিছিল দেখা গেছে। তবে মিছিল থেকে চট্টগ্রামের নিউমার্কেটে আওয়ামী লীগের কার্যালয় ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। চট্টগ্রাম সিটি মেয়র রেজাউল করিমের বাড়ি ছাড়াও নগরীতে সংসদ সদস্যের বাড়িসহ সার্কিট হাউজ ও থানায় হামলা এবং অগ্নিসংযোগের খবর পাওয়া গেছে।
জানা গেছে, বিকাল ৪টার দিকে চট্টগ্রামে দারুল ফজল মার্কেটে নগর আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে ভাংচুর ও আগুন দেয়া হয়। মিছিল থেকে কার্যালয়টিতে আগুন দেয়া হয়। এছাড়া চসিক মেয়র মো. রেজাউল করিম চৌধুরীর বহদ্দারহাট এলাকার বাড়িতে ভাংচুরের পর আগুন দেয়া হয়। এছাড়া রাউজানের সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীর বাসায়ও আগুন দেয়া হয়। আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীদের বাড়িতেও হামলার ঘটনা ঘটেছে।
নগরীর কাজীর দেউড়িতে অবস্থিত সার্কিট হাউজে হামলা ও ভাংচুর হয়েছে। পাহাড়তলী, পতেঙ্গা, চাঁদগাঁও থানায় হামলা চালিয়ে অস্ত্র লুটের ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ সদস্যরা থানায় না থাকায় অন্যান্য থানাও বড় ধরনের হামলা ও ভাংচুরের ঝুঁকিতে রয়েছে।
নগরীর ডবলমুরিং থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত এক পুলিশ সদস্য বণিক বার্তাকে মুঠোফোনে জানান, নগরীর বিভিন্ন থানায় পুলিশ সদস্যরা নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করছেন। তবে তাদের করণীয় কী সেটা তারা জানেন না।
সিলেট: নগরের বিভিন্ন সরকারি স্থাপনা ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বাড়িতে হামলা ও ভাংচুরের খবর পাওয়া গেছে। প্রবাসী ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী শফিকুর রহমান চৌধুরীর বাসভবন ভাংচুর ও আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেনসহ কয়েকজন এমপির বাসভবনে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে।
অন্যদিকে হবিগঞ্জে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও হবিগঞ্জ-৩ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য মো. আবু জাহিরের বাড়ি ৪ ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখার পর আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়েছে। এতে পাঁচতলা বাড়ির প্রথম ও দ্বিতীয় তলা পুড়ে গেছে। একই সময় জাহিরের বাড়ির পাশে সাবেক সংসদ সদস্য আবদুল মজিদ খানের বাড়িতেও আগুন দেয়া হয়। রাত সাড়ে ৯টার দিকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সংসদ সদস্য জাহিরের বাড়িতে ঢুকে ভেতরে থাকা জনতাকে বুঝিয়ে সরিয়ে আনেন। পরে রাত সাড়ে ১০টার দিকে সেনা সদস্যরা সংসদ সদস্যের বাড়ির নিয়ন্ত্রণ নেন। এ সময় সংসদ সদস্য ও তার দলের কিছু নেতাকর্মী বাড়িটির চতুর্থ তলায় ছিলেন বলে একটি সূত্র জানিয়েছে।
ফেনী: শেখ হাসিনার দেশ ত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়লে ফেনীর সর্বত্র ছাত্র-জনতা আনন্দ মিছিল করে। বেলা ৩টার দিকে হাজার হাজার মানুষ শহরের রাস্তায় রাস্তায় মিছিল করে। বিকালে বিক্ষুব্ধ জনতার একটি অংশ শহরের কলেজ রোডের ফেনী পৌরসভা কার্যালয়ে হামলা, ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। একই সময় ফেনী শহরের চাড়িপুরের ব্যক্তিগত অফিস এবং বাড়িতে হামলা, ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নিজাম উদ্দিন হাজারীর তিনটি বহুতল ভবন, একটি বাগানবাড়ি, গরুর খামারে হামলা, ভাংচুর করা হয়। এছাড়া শহরের বাঁশপাড়ায় সদর উপজেলা চেয়ারম্যান শুসেন চন্দ্র শীলের কার্যালয়ে হামলা, ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। পাশেই তার বাসাতেও হামলা ও ভাংচুর করা হয়। মাস্টারপাড়ায় ফেনী পৌরসভার কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ নেতা খোকন হাজারীর কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ করা হয়।
গাজীপুর: শেখ হাসিনার পদত্যাগের খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সড়ক ও মহাসড়কে নেমে আসে মানুষ। মাথায় ও হাতে পতাকা বেঁধে তারা বিজয় চিহ্নসহ আনন্দ প্রকাশ করে। স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে গাজীপুর। মিষ্টিও বিতরণ করতে দেখা গেছে। রাজবাড়ী রোড, শিববাড়ী মোড়, ডুয়েট এলাকা, বাসস্ট্যান্ড এলাকা, জয়দেবপুর চৌরাস্তা, বোর্ড বাজার, সালনা, মাওনা, টঙ্গী, ঢাকা ময়মনসিংহ ও ঢাকা টাঙ্গাইল মহসড়কে মানুষের ঢল নামে। এ সময় কিছু মানুষ জাতীয় চার নেতার প্রতিকৃতি ভেঙে ফেলে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের ভেতরে স্থাপিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরালও ভাংচুর করে। এছাড়া গাজীপুর সিটি মেয়র জায়েদা খাতুনের বাসভবনে আগুন দেয়ার খবর পাওয়া গেছে। মহানগর যুবলীগের আহ্বায়ক রাসেল সরকারের জয়দেবপুর চৌরাস্তার বাসভবনেও আগুন দেয়া হয়েছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া: শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বিজয় মিছিল হয়েছে। দুপুরের পর বিভিন্ন এলাকা থেকে ছাত্র-জনতা রাস্তায় নেমে আসে। এ সময় উত্তেজিত জনতা সদর থানায় আগুন লাগিয়ে দেয়। এছাড়া থানার সামনে থাকা তিনটি পিকআপ ও একটি ট্রাকে আগুন দেয়। এ সময় পুলিশ হামলাকারীদের ওপর গুলি ছোড়ে। এতে কমপক্ষে ১০ জন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। পরে সেনাবাহিনীর একটি দল থানা থেকে পুলিশ সদস্যদের উদ্ধার করে। এছাড়া মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবন, ব্যাংক এশিয়াসহ বিভিন্ন স্থানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি ভাংচুর করা হয়। পরে তারা জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শাহদাৎ হোসেন শোভন, রিমো আনসারী, জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মো. হেলাল উদ্দিনসহ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা চালায়। এ সময় কয়েকটি স্থানে অগ্নিসংযোগ করা হয়। আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের বাসভবনেও ভাংচুর করা হয়েছে।
বরিশাল: নগরীতে মিছিল করেছে ছাত্র-জনতা। নথুল্লাবাদ, সিঅ্যান্ডবি রোড, বেলেস পার্কে আনন্দ মিছিল করে তারা। পরে জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের কার্যালয় ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। এছাড়া বরিশাল সিটির বর্তমান মেয়র আবুল খায়ের আব্দুল্লাহর বাসভবনে ভাংচুর করা হয়।
পাবনা: শেখ হাসিনার দেশ ত্যাগের খবরে মিছিল হয়েছে পাবনায়। মিষ্টি বিতরণের পাশাপাশি আওয়ামী লীগপন্থী ব্যবসায়ীদের প্রতিষ্ঠান ও নেতাকর্মীর বাড়িতে ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকুর বাসভবনেও ভাংচুরে করা হয়েছে।
বরগুনা: জেলার বিভিন্ন স্থানে মিছিল করছে ছাত্র-জনতা। এ সময় মিষ্টির বদলে কাঁঠাল বিতরণ করতে দেখা গেছে। গতকাল বিকালে মিছিলটি শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে কেন্দ্রীয় সদরঘাট মসজিদ ও বরগুনা প্রেস ক্লাব চত্বর এসে অবস্থান নেয়।
চাঁদপুর: সমাজকল্যাণমন্ত্রী দীপু মনির বাসা ও জেলা পরিষদ অফিসে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। এছাড়া আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের বাসাবাড়িতে হামলার খবর পাওয়া গেছে। এর আগে আনন্দ মিছিল করে সর্বস্তরের মানুষ। এ সময় একে অন্যের মাঝে মিষ্টি বিতরণ করতে দেখা গেছে।
ঝালকাঠি: আওয়ামী লীগ নেতা আমির হোসেন আমুর বাসভবনে অগ্নিসংযোগ ও জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে ভাংচুর হয়েছে। শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর পরই জনতার দখলে চলে যায় ঝালকাঠি শহর। বিক্ষুব্ধ জনতা রাজপথে নেমে মিছিল করে। শহরের রোনালসে সড়কে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য আমির হোসেন আমুর বাসভবনে বিকালে আগুন ধরিয়ে দেয় বিক্ষুব্ধ জনতা। পরে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা এসে আগুন নিভিয়ে ফেলে। এ সময় বাসভবনের মধ্যে ভাংচুর ও লুটপাট করা হয়। পরে বিক্ষুব্ধ জনতা টাউন হলের জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে ভাংচুর চালায়। এছাড়া বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগ নেতাদের বাসা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়।
খুলনা: শহরের শিববাড়ি মোড়ে ছাত্র-জনতা মিছিল করেছে। মিষ্টি বিতরণও করেছে অনেকে। শেখ হাসিনার পদত্যাগের খবরে শত শত তরুণ-তরুণী শহরে জড়ো হয়। তাদের হাতে ও মাথায় ছিল জাতীয় পতাকা।
লক্ষ্মীপুর: রায়পুর ও রামগঞ্জ থানা ভাংচুর করেছে দুর্বৃত্তরা। রামগঞ্জ থানায় অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে। এছাড়া জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নুরউদ্দিন চৌধুরী নয়ন, সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান একেএম সালাহ উদ্দিন টিপু, পৌরসভার মেয়র মোজাম্মেল হায়দার মাসুম ভূঁইয়া, ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি চৌধুরী মাহমুদুন্নবী সোহেল ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক রাকিব হোসেন লোটাসের বাসভবনে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। তবে আগুন নেভানোর জন্য কারো কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। এর আগে আওয়ামী লীগ নেতা নয়ন, যুবলীগ নেতা টিপু ও ছাত্রলীগ নেতা সোহেলে বাসায় আগুন দেয়া হয়।
মাদারীপুর: সংসদ সদস্য শাজাহান খান ও আ ফ ম বাজাউদ্দিন নাছিমের বাসভবনে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া শাজাহান খানের ভাই হাফিজুর রহমানের বাসভবন, হোটেল ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেও হামলা হয়েছে।
নরসিংদী: শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশ ছেড়ে যাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর নরসিংদীতে আনন্দ মিছিল হয়েছে। এ সময় ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে। জেলা আওয়ামী লীগ অফিস, হাজীপুর ইউপি চেয়ারম্যানের বাড়ি ও হাজীপুরে নন্দ বেকারিতে অগ্নিসংযোগ করা হয়। এছাড়া আওয়ামী লীগ নেতা দিপক সাহার বাড়ি, এসএম কাইয়ুমের বাড়ি, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মনির হোসেনের ব্যক্তিগত অফিসসহ আওয়ামী লীগ নেতাদের বাড়িঘরে হামলা হয়েছে। নরসিংদী রেলওয়ে স্টেশন ও প্রেস ক্লাবের সামনেসহ বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরাল ভেঙে ফেলা হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ: পুলিশ লাইন, আড়াইহাজার থানা, নারায়ণগঞ্জ ক্লাব, রাইফেল ক্লাব, সংসদ শামীম ওসমানের জামতলার বাড়ি, উত্তর চাষাড়ায় তার পৈত্রিক বাড়ি হিরামহল, চাষাড়া মোড়ে তার দাদার বাড়ি বায়তুল আমান, উত্তর চাষাড়ায় নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের এমপি সেলিম ওসমানের বাড়িসহ বিভিন্ন স্থানে ভাংচুর হয়েছে।
এছাড়া নেত্রকোনার মদনে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে আগুন ও মুক্তিযোদ্ধা কার্যালয়সহ বিভিন্ন স্থাপনায় ভাংচুর হয়েছে। রাঙ্গামাটির বনরূপায় ট্রাফিক পুলিশ বক্স ও পৌর আওয়ামী লীগ সভাপতি মো. সোলায়মানের আবাসিক হোটেলে ভাংচুর হয়েছে। হামলার চেষ্টা করা হয়েছে রাঙ্গামাটি পৌরসভার মেয়র ও জেলা যুবলীগ সভাপতি আকবর হোসেন চৌধুরীর বাসভবনে। তবে এ সময় কয়েকজন হামলাকারীদের নিবৃত করে। ইটপাটকেল ছোড়া হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের রেস্ট হাইজেও। রংপুরের রাজপথে মিছিল করেছে ছাত্র-জনতা। নগরীর শাপলা চত্বর, পায়রা চত্বর, লালবাগ চত্বর, পার্ক মোড়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন শহীদ আবু সাঈদ চত্বর, মডার্ন মোড়, প্রেস ক্লাব চত্বর, জাহাজ কোম্পানি মোড়, টাউন হল চত্বর, জিলা স্কুল মোড়সহ বিভিন্ন এলাকায় মিছিল বের করে ছাত্র-জনতা।










