পরমাণু প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাইরয়েড, কিডনি, লিভার ও বোন ক্যান্সারের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও উন্নত চিকিৎসা সম্প্রসারণের জন্য বাংলাদেশে নিউক্লিয়ার মেডিসিন কার্যক্রম পরিচালনা করার উদ্যোগ নেয় সরকার। জটিল এসব রোগের সর্বাধুনিক ও সাশ্রয়ী সেবা প্রদানে দেশের আটটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্সেস (ইনমাস) স্থাপনের কাজ শুরু হয়। কিন্তু তিন বছরের এসব প্রকল্প শেষ হয়নি ছয় বছরেও। ফলে শুরু করা যায়নি সেবা প্রদানও। এমনকি বিশেষায়িত সেন্টারগুলোয় লিফট স্থাপনের জন্য আরসিসি শিয়ার ওয়াল (বাইরের দেয়াল, মেঝে ও ছাদের চাপ ভূমির ভেতরে থাকা ভিত্তিতে ছড়িয়ে দেয়ার উপযোগী উল্লম্ব কাঠামো) কাটায় উদ্বোধনের আগেই হুমকিতে পড়েছে ভবনের স্থায়িত্ব। সরকারের প্রকল্প মনিটরিং সংস্থা আইএমইডির পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে এমন কিছু অসংগতি। 

আইএমইডির নিবিড় পরিবীক্ষণ সমীক্ষায় বলা হয়েছে, ইনমাস ভবনের বাইরের দেয়ালে ক্ল্যাডিং (দেয়ালের সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য বাইরের অংশে ব্যবহৃত রঙিন সিমেন্টের আস্তরণ) খসে পড়লে জনদুর্ঘটনার শঙ্কা রয়েছে। ক্ল্যাডিং মেরামত করার জন্য অনেক অর্থ ও সময় প্রয়োজন। তাই এ ধরনের ভবনের বাইরের দেয়ালে ক্ল্যাডিং বা টাইলস ব্যবহার পরিহারের পরামর্শ আইএমইডির। সমীক্ষায় কেটে ফেলা আরসিসি শিয়ার ওয়াল একটি ভবনের আনুভূমিক ও দরজার গুরুত্বপূর্ণ অংশ বহন করে বলে উল্লেখ করা হয়। তাছাড়া ভবনের বিভিন্ন কক্ষে এমনকি টয়লেট জোনেও কাঠের দরজা ব্যবহার করা হয়েছে, যা দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। সমীক্ষা বলছে, মেট্রিক পদ্ধতিতে প্রকল্পের সমস্ত ডিজাইন ও ড্রয়িং করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও এ প্রকল্পে তা মানা হয়নি।

সরজমিনে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে বৈদ্যুতিক লাইনের কাজ চলছে। আটতলা ভবনে দুটি লিফট লাগানো হয়েছে। টয়লেটসহ সব কক্ষে কাঠের দরজা লাগানো হয়েছে আর মেডিকেলের অন্য ভবনের সঙ্গে মিল রাখার জন্য বাইরের দেয়ালে খয়েরি রঙের ক্ল্যাডিং ব্যবহার করা হয়েছে।

এভাবে নকশার বাইরে গিয়ে ভবনের দেয়াল কাটা হলে ঝুঁকি হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নির্মাণ প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. খাঁন মাহমুদ আমানত। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘ড্রইংয়ের বাইরে পরামর্শকের অনুমতি ছাড়া কোনো কাজ করা হলে তা অননুমোদিত কাজ হবে। সে হিসেবে এটার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।’ ঝুঁকির মাত্রার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সত্যিকার অর্থেই যদি শিয়ার ওয়াল কাটা হয়, তাহলে সমস্যা তৈরি হতে পারে।’ ডিজাইন না দেখে এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে না চাইলেও তিনি জানান, নকশার মেট্রিক পদ্ধতিটি রাজউকের একটি নিয়ম। তবে কম্পিউটার মডেলিংয়ের মাধ্যমে ঝুঁকির মাত্রা জানা যাবে বলে জানান বুয়েটের একই বিভাগের আরেক অধ্যাপক ড. মেহেদী আহমেদ আনসারী। এতে সময় লাগবে এক মাস।  

তৃতীয় পক্ষের সহায়তা নিয়ে নিবিড় পরিবীক্ষণগুলো করে আইএমইডি। এবারের প্রতিবেদনটি বুয়েটের প্রকৌশলীদের মাধ্যমে প্রস্তুত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। প্রকল্পটির খসড়া প্রতিবেদনে ভবনের হুমকির বিষয়টি থাকলেও আইএমইডির মূল প্রতিবেদনে ভবনের দেয়াল কাটার বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে আইএমইডির-সংশ্লিষ্ট সেক্টরের পরিচালক খলিল আহমেদ কোনো সদুত্তর না দিয়ে খসড়া প্রতিবেদন দেখে জানাবেন বলে মন্তব্য করেন। 

২০১৭ সালে অনুমোদন পাওয়া প্রকল্পটি ২০২০ সালে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দুবার সংশোধনীসহ তিন দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে তিন বছর থেকে ছয় বছর করা হলেও সেখানে এখনো সেবা শুরু করা যায়নি। এ দীর্ঘসূত্রতাকে প্রকল্পের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা বলছে আইএমইডি। আর প্রয়োজনের তুলনায় পরমাণু প্রযুক্তিতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংকটও রয়েছে। এসব সেন্টারের জন্য আমদানি করা যন্ত্রপাতির মান নিয়ন্ত্রণ ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং টেকনিশিয়ানদের প্রশিক্ষণের ঘাটতি হওয়াকেও ঝুঁকি হিসেবে দেখছে আইএমইডি। তাই সেবা শুরু করতে দ্রুত ইনমাসের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ প্রদানের পরামর্শ সংস্থাটির।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন। সংস্থাটি দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে এ পর্যন্ত ১৪টি ইনমাস স্থাপন করেছে। বর্তমানে তা সম্প্রসারণের প্রচেষ্টা চলছে। প্রথমে এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫৮২ কোটি টাকা। পরে প্রথম সংশোধনী প্রস্তাবের মাধ্যমে প্রায় ৭ শতাংশ ব্যয় বাড়িয়ে ৬২২ কোটি টাকা করা হয়। পরে আবার দ্বিতীয় সংশোধনীর মাধ্যমে ব্যয় কিছুটা কমিয়ে ৬০৪ কোটি টাকা করা হয়। আইএমইডির তথ্যমতে, এ বছরের এপ্রিল পর্যন্ত প্রকল্পটির আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ৮৯ শতাংশ। সাড়ে ৪ কোটি টাকায় ১০টি অ্যাম্বুলেন্স কেনার কথা থাকলেও কেনা হয়েছে মাত্র দুটি। এতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১ কোটি টাকা। স্থানীয় যন্ত্রপাতি, আসবাব কেনাসহ বেশকিছু কাজ বাকি আছে। 

পরিবীক্ষণে উঠে আসা অসংগতি নিয়ে আইএমইডি সচিব আবুল কাশেম মো. মহিউদ্দীন বলেন, ‘এভাবে ভবন কাটা ঠিক না। যেহেতু কাটা হয়ে গেছে এখন আর তেমন কিছু করার নেই।’ 

প্রকল্পটির মেয়াদ ও ব্যয়বৃদ্ধির বিষয়ে আইএমইডির পর্যালোচনায় বলা হয়, প্রথমে ঢাকার দুটি ইনমাসে দুটি করে এবং বাকি ছয়টিতে একটি লিফট লাগানোর চিন্তা ছিল। পরে সবক’টিতে দুটি লিফট ও ইন্টেরিয়র কাজ বাড়ানো হয়। প্রকল্পটি অনুমোদনের সময় প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্টদের প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজনে বিদেশী প্রশিক্ষক দেশে এনে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেয়ার নির্দেশনা দেন। এতে প্রশিক্ষণে বরাদ্দ বাড়িয়ে প্রকল্পটির ব্যয় বাড়ানো হয়। আর হাসপাতালগুলোয় জায়গার স্বল্পতা ও বিদ্যুতের সাবস্টেশন নির্মাণকাজেও সময় লেগে যায়। সবশেষে কিছু কম গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি ক্রয় তালিকা থেকে বাদ দিলে ব্যয় কিছুটা কমে আসে। 

প্রকল্পটির সার্বিক বিষয়ে জানতে প্রকল্প পরিচালক ড. মো. মজিবুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। 

উল্লেখ্য, ইনমাস স্থাপনের জন্য নির্ধারিত আটটি হাসপাতালের মধ্যে রয়েছে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট, গোপালগঞ্জের শেখ সায়েরা খাতুন মেডিকেল কলেজ। এছাড়া পাবনা, কুষ্টিয়া, যশোর, কক্সবাজার ও সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও প্রকল্প চলমান রয়েছে।