দেশে প্রতি বছর অতিবৃৃষ্টির কারণে জলাবদ্ধতা ও বন্যায় প্রায় ২০ লাখ হেক্টর জমির ধান কোনো না কোনোভাবে আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড়ের কারণে আকস্মিক বন্যা, অতি বন্যা, জোয়ারের বন্যা, পাহাড়ি ঢলের বন্যার কারণে আবাদি জমি ক্রমাগত কমে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে আমন মৌসুমে আশার আলো দেখাচ্ছে বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) উদ্ভাবিত বিনা ধান-১১।
বন্যার পানির মধ্যে ২০-২৫ দিন টিকে থেকে ভালো ফলন দিচ্ছে বিনা ধান-১১। পাশাপাশি আগাম জাতের কারণে দুই ফসলি জমিকে তিন ফসলিতে রূপান্তর করতে পারছেন দেশের কৃষকরা। বিশেষ করে ময়মনসিংহ, বরেন্দ্র ও উত্তরাঞ্চলের দুই ফসলি জমি এখন তিন ফসলিতে রূপান্তর হচ্ছে। জলমগ্নতা সহিষ্ণু, উচ্চফলনশীল ও আগাম আমন ধানের জাত বিনা ধান-১১। জাতটি ২০১৪ সালে উদ্ভাবন হওয়ার পর গত কয়েক বছর বিভিন্ন পর্যায়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আবাদের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। চলতি বছর সারা দেশে হাজারের ওপর প্রদর্শনী প্লটের মাধ্যমে আবাদ করা হচ্ছে। পাশাপাশি কৃষকের প্রভাব ও সুবিধাগুলো মূল্যায়ন করছে বিনা। সেখানে দেখা গেছে, জলবায়ুর পরিবর্তনের ঘাত মোকাবেলা করে এ জাত কৃষকের জন্য বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে। পাশাপাশি জমিকে আরো আবাদের আওতায় আনার মাধ্যমে শস্যের নিবিড়তা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
জানা গেছে, গত ৪০-৫০ বছরে দেশের বৃষ্টিপাত পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, যখন বৃষ্টি হওয়ার প্রয়োজন তখন বৃষ্টি হচ্ছে না। সেই বৃষ্টিটা হচ্ছে অন্য সময়। ফলে বৃষ্টির পরিমাণ, ধরন, স্থায়িত্বকাল এবং সময় পাল্টে গেছে। এর প্রভাব পড়েছে কৃষিজ পণ্যের উৎপাদন ব্যবস্থাপনায়। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের কৃষি খাতে দৃশ্যমান অভিঘাত হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
বাংলাদেশে রোপা আমন মৌসুমের চাষাবাদকৃত ধানের জাতগুলো নিয়মিতভাবে বিভিন্ন প্রতিকূল অবস্থায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে। আকস্মিক বন্যার মধ্যেও আমন ধানের ফলন অপরিবর্তিত রাখার জন্য বিনার বিজ্ঞানীরা উদ্ভাবন করেছেন জলমগ্নতা সহিষ্ণু ধানের জাত বিনা ধান-১১। আমনের এ জাত ২০-২৫ দিন জলমগ্নতা সহ্য করার পরও বন্যা আক্রান্ত জমিতে হেক্টরপ্রতি পাঁচ থেকে সাড়ে পাঁচ টন ফলন দিচ্ছে।
এছাড়া বন্যামুক্ত স্বাভাবিক জমিতে ছয়-সাড়ে ছয় টন পর্যন্ত ফলন দিতে সক্ষম। আমন মৌসুমে জাতটির জীবনকাল ১১০-১১৫ দিন। স্বল্প জীবনকালবিশিষ্ট হওয়ায় এ জাত চাষাবাদ করে সহজেই শস্যনিবিড়তা বাড়ানো সম্ভব। সর্বোপরি দেশের টেকসই খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিনা ধান-১১ বিশেষ ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন বিনার মহাপরিচালক কৃষিবিদ ড. মির্জা মোফাজ্জল ইসলাম।
তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, আগের আমন জাতগুলোর জীবনকাল বেশি হওয়ায় উত্তরবঙ্গসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকরা বছরে দুটির বেশি ফসল চাষ করতে পারত না। নতুন শস্য বিন্যাসে ময়মনসিংহসহ আশপাশের জেলার কৃষকরা আগাম আমন-সরিষা/পাটশাক/রবি ফসল-বোরো চাষ করছে। তাছাড়া স্বল্প জীবনকালবিশিষ্ট এসব জাত চাষাবাদ করে বরেন্দ্র অঞ্চলসহ দেশের অন্যান্য জেলার কৃষকরা দুই ফসলি জমিকে তিন-চার ফসলি জমিতে রূপান্তর করেছে। উত্তরাঞ্চলে আমন কাটার পর কৃষকরা সহজেই একবার বা দুইবার আলু চাষ করে থাকেন। নতুন শস্য বিন্যাসে আগাম আমন-সরিষা-বোরো বা আগাম আমন-আলু দুইবার-আউশ চাষ করা যাচ্ছে। এতে শস্যনিবিড়তা বৃদ্ধি পেয়ে বছরে তিন-চারটি ফসল উৎপাদন হচ্ছে।
রংপুর অঞ্চলে দুইবার আলু চাষ খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং আগাম আলুতে কৃষক অধিক লাভবান হয়ে থাকেন। তাছাড়া আশ্বিন মাসের শেষে এ ধান কাটা হয়। ফলে এ সময় গো-খাদ্যের চাহিদা মিটছে।










