বছরখানেক আগেও দেশের আমদানি ব্যয় ছিল মাসে ৪ থেকে সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলারের ঘরে। কিন্তু চলতি অর্থবছরে প্রতি মাসে আমদানি ব্যয় প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে ঠেকেছে। আমদানির এ ব্যয় দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য ঘাটতিতেও নতুন রেকর্ড তৈরি করেছে। রেকর্ড ঘাটতি তৈরি হয়েছে সরকারের চলতি হিসাবের ভারসাম্যেও। বৈদেশিক বাণিজ্যের এ সংকট প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে দেশের ব্যাংক খাতে। চাহিদামতো ডলার সংগ্রহ করতে না পেরে ঋণপত্রের (এলসি) দায় পরিশোধে চাপে পড়তে হচ্ছে ব্যাংককে।
এলসির দায় পরিশোধে সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জে পড়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রধান চার ব্যাংক। ডলার সংকটে পড়ে সোনালী ব্যাংক বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) জ্বালানি তেল আমদানির এলসি খোলাই বন্ধ করে দিয়েছে। একাধিক এলসির দায় যথাসময়ে পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়েছে অগ্রণী ব্যাংক। এ নিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকটির সঙ্গে বিপিসি ও জ্বালানি তেল বিক্রেতা বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পর্কেও দূরত্ব তৈরি হতে শুরু করেছে। বিপিসি, পেট্রোবাংলাসহ সরকারি প্রধান আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর এলসির দায় পরিশোধে চাপে পড়ছে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ও রূপালী ব্যাংকও। প্রতিদিনই ডলারের জন্য এ ব্যাংকগুলোকে বাংলাদেশ ব্যাংকের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
বৈদেশিক মুদ্রার বাজার স্থিতিশীল রাখতে গতকালও রিজার্ভ থেকে ৬ কোটি ডলার বিক্রি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ নিয়ে চলতি অর্থবছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে প্রায় ৪ বিলিয়ন বা ৪০০ কোটি ডলার বিক্রি করতে হয়েছে। তার পরও চাহিদার তুলনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জোগান দেয়া ডলার খুবই কম বলে অভিযোগ ব্যাংকগুলোর শীর্ষ নির্বাহীদের।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই ’২১-ফেব্রুয়ারি ’২২) দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ১ হাজার ৩৪৪ কোটি ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৯ দশমিক ৪৬ শতাংশ কম। একই সময়ে দেশ থেকে ৩ হাজার ২০৭ কোটি ডলারের পণ্য রফতানি হয়েছে। ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশের রফতানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২৯ দশমিক ৮০ শতাংশ। সব মিলিয়ে রেমিট্যান্স ও রফতানি আয় বাবদ গত আট মাসে দেশে ৪ হাজার ৫৫১ কোটি ডলার বৈদেশিক মুদ্রা এসেছে। বিপরীতে একই সময়ে ৫ হাজার ৪৩৭ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছে বাংলাদেশ।
বৈদেশিক মুদ্রা আয় ও ব্যয়ে তৈরি হওয়া এ অসামঞ্জস্যতার কারণে ফেব্রুয়ারি শেষে সরকারের চলতি হিসাবে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২৮৩ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে উল্টো ৮২ কোটি ডলার উদ্বৃত্ত ছিল চলতি হিসাবে। চলতি হিসাবের বড় ঘাটতি রাষ্ট্রের ব্যালান্স অব পেমেন্টকেও (বিওপি) নেতিবাচক ধারায় নামিয়ে এনেছে। গত ফেব্রুয়ারি শেষে বিওপির ঘাটতির পরিমাণ ২০৫ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে।
চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে গড়ে আমদানি ব্যয় হয়েছে ৬৭৯ কোটি ডলার। অর্থবছরের বাকি চার মাসে একই হারে আমদানি হলে বছর শেষে দেশের আমদানি ব্যয় ৮১ বিলিয়ন ডলার ছাড়াবে। ইতিহাস সৃষ্টি করা এ আমদানি প্রবৃদ্ধি চলতি হিসাবের ঘাটতিকে ২০ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যেতে পারে। এ অবস্থায় দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের বিদ্যমান সংকটের মাত্রা ভয়াবহ পর্যায়ে গিয়ে ঠেকতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর মনে করেন, ইউক্রেন যুদ্ধসহ বৈশ্বিক নানা কারণে আগামীতে জ্বালানি তেল-গ্যাসসহ খাদ্যপণ্যের দাম আরো বাড়বে। এ কারণে আমদানি ব্যয় ৮১ বিলিয়ন ডলারে সীমাবদ্ধ থাকার সম্ভাবনাও কম। তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরেই চলতি হিসাবে ২০ বিলিয়ন ডলারের বেশি ঘাটতি হবে। এ পরিস্থিতি দু-তিন বছর স্থায়ী হলে আমাদের অর্থনীতির বেশ অবনতি হতে পারে। দেশী-বিদেশী উৎস থেকে সরকার ঋণ গ্রহণের পরিমাণ বহু গুণ বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতেও বিদেশী ঋণ বড় হচ্ছে। আমদানি ব্যয়ের সঙ্গে বিদেশী ঋণ পরিশোধ প্রক্রিয়া যুক্ত হলে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের সংকট আরো গভীর হবে।
নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে ব্র্যাক ব্যাংকের এ চেয়ারম্যান বলেন, দেশের বাইরে যাওয়ার জন্য গতকাল আমি নিজেই ৯২ টাকা দরে ডলার কিনেছি। অথচ ব্যাংক খাতে ডলারের দাম ৮৬ টাকা ২৫ পয়সায় বেঁধে রাখা হয়েছে। চাহিদার সঙ্গে জোগানের সমন্বয় না হওয়ার কারণেই দেশের আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারের সঙ্গে খুচরা বাজারে ডলারের দামে বড় ধরনের তারতম্য সৃষ্টি হয়েছে। ডলারের বিপরীতে কৃত্রিমভাবে টাকার শক্তিশালী অবস্থান ধরে রেখে কোনো লাভ নেই।
তবে ডলারের দাম বাজার পরিস্থিতির ওপর ছেড়ে দেয়ার একেবারেই পক্ষপাতী নয় বাংলাদেশ ব্যাংক। বৈদেশিক মুদ্রাবাজার স্থিতিশীল রাখতে চলতি অর্থবছরের শুরু থেকে প্রায় প্রতিদিনই বাংলাদেশ ব্যাংক ডলার বিক্রি করেছে।
এর পরও ডলারের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক। দেশের আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে গতকাল ডলারের ঘোষিত দর ছিল ৮৬ টাকা ২৫ পয়সা। যদিও ঘোষিত দরের চেয়েও এক-দেড় টাকা বেশি দরে ব্যাংকগুলো ডলার লেনদেন করেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। অন্যদিকে খুচরা বাজারে (কার্ব মার্কেট) প্রতি ডলারের দাম ৯৩ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। ২০২১ সালের জুনে প্রতি ডলারের ঘোষিত মূল্য ছিল ৮৪ টাকা ৮০ পয়সা।
ঘোষিত দরের চেয়ে বাজার থেকে বেশি দামে ডলার কিনতে হচ্ছে বলে জানান রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আতাউর রহমান প্রধান। তিনি বলেন, বাজার থেকে বেশি দরে ডলার কিনে বিপিসিসহ রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর এলসির দায় পরিশোধ করতে হচ্ছে। এক্ষেত্রে প্রতি এলসিতেই লোকসান হচ্ছে ৫-৭ কোটি টাকা। তার পরও রাষ্ট্রের স্বার্থে আমরা এলসির দায় পরিশোধ করছি। কারেন্সি সোয়াপসহ বিভিন্ন মাধ্যমে বাজার থেকে ডলার সংগ্রহ করতে হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক আরো বেশি ডলার বিক্রি করলে বাজার কিছুটা স্বাভাবিক হতো।
যথাসময়ে এলসির দায় পরিশোধ না করার কারণে বিদেশী তেল বিক্রেতাদের কাছে নেতিবাচক বার্তা যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান এবিএম আজাদ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, বাজারে ঘোষিত দরে ডলার পাচ্ছে না বলে ব্যাংকগুলো দাবি করছে। এ কারণে সোনালী ব্যাংক আমাদের এলসি খোলাই বন্ধ করে দিয়েছে। অগ্রণী ব্যাংক আমাদের কিছু ঋণপত্রের দায় পরিশোধে দেরি করেছে। এ কারণে কিছু ক্ষেত্রে বিদেশী তেল বিক্রেতারা মনঃক্ষুণ্নও হচ্ছেন। বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতির বিচারে সব পক্ষই কিছুটা উদারতা দেখাচ্ছে। তবে যথাসময়ে এলসির দায় পরিশোধে ব্যর্থ হলে দেশের বদনাম হয়। আমরা কোনো নেতিবাচক পরিস্থিতি চাই না।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মতো দেশের অনেক বেসরকারি ব্যাংকও যথাসময়ে এলসির দায় পরিশোধ করতে ব্যর্থ হচ্ছে। এ নিয়ে সম্প্রতি দেশের ব্যাংকগুলোকে যথাসময়ে এলসির দায় পরিশোধে তাগিদও দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, যেসব ব্যাংকের রেমিট্যান্স ও রফতানি আয় ভালো, তারা অপেক্ষাকৃত ভালো অবস্থায় আছে। এ ব্যাংকগুলোকে অন্যের মুখাপেক্ষী হতে হচ্ছে না। কিন্তু যে ব্যাংকের রেমিট্যান্স ও রফতানি আয় ভালো নেই, তাদের অবস্থা খারাপ। তবে ডলারের বাজার এখনো একেবারে নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে যায়নি। চাইলে কোনো না কোনোভাবে বাজারে ডলার পাওয়া যাচ্ছে।
দেশের আমদানি ব্যয়ে বড় ধরনের উল্লম্ফন হওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে টান পড়েছে। রেমিট্যান্সে বড় প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি বাজার থেকে কিনে নেয়া ডলারে গত অর্থবছরে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ তরতর করে বেড়েছে। যদিও গত নয় মাসে রিজার্ভের প্রবৃদ্ধি থমকে গেছে। গত ৩০ মার্চ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৪৪ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলার। যদিও গত বছর রিজার্ভের পরিমাণ ৪৮ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত উঠেছিল।
সামগ্রিক বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, আমদানি প্রবৃদ্ধির কারণে বৈদেশিক মুদ্রাবাজার কিছুটা চাপে আছে। তবে উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো কোনো পরিস্থিতি নেই। আমাদের রফতানি আয়ে বড় প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। ঈদ উপলক্ষে রেমিট্যান্সও বাড়বে। বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক ডলার সরবরাহ করছে।










