২০১৮ সালে প্রায় ৭০ লাখ টাকা ব্যয়ে সিলেট নগরের সোনারপাড়া মসজিদের পুকুরের চারপাশে নির্মাণ করা হয় গার্ডওয়াল ও রেলিং। এরপর চলতি বছরের শুরুতে আবার পুকুরটি সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হয়। এ উদ্যোগের শুরুতে এক্সক্যাভেটর দিয়ে খনন করা হয়। অথচ গত মাসে পুকুরটি একেবারেই ভরাট করে দেয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভরাট যদি করা হয় তাহলে সংস্কারের নামে সরকারের কোটি টাকা কেন খরচ করা হয়েছে। আবার পুকুরসহ জলাধার ভরাটে আইনি নিষেধাজ্ঞাও রয়েছে। অথচ সিলেটের রায়নগর এলাকার এ পুকুর ভরাট করেছে জলাধার রক্ষার দায়িত্বে থাকা খোদ সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক)। পুকুরটির অবস্থান নগরের ১৯ নং ওয়ার্ডের রায়নগর সোনারপাড়ায়।

একসময় সিলেট নগরজুড়ে ছিল অসংখ্য দীঘি আর পুকুর। অপরিকল্পিত নগরায়ণ আর যততত্র বহুতল ভবন নির্মাণের কারণে ভরাট হয়ে গেছে এসবের বেশির ভাগই। হাতে গোনা যে কয়টি টিকে আছে সেগুলোও নানা কৌশলে চলছে ভরাটের চেষ্টা। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ব্যক্তি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে জলাশয় ভরাটের অভিযোগ উঠলেও এবার সিটি করপোরেশনই নগরের পুরনো এ পুকুর ভরাট করে দিয়েছে।

পুকুর ভরাট করা নিয়ে সিসিকের পক্ষ থেকে পাওয়া গেছে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য। স্থানীয় কাউন্সিলর বলছেন, পুকুর খননকালে আশপাশের স্থাপনায় ফাটল দেখা দেয়ায় পুকুরটি ভরাট করে দেয়া হয়েছে। আর সিটি করপোরেশনের প্রকৌশল শাখা বলছে, সোনারপাড়া মসজিদ কমিটির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পুকুরটি ভরাট করা হয়েছে। পুকুরের জায়গায় মার্কেট তুলতে চায় মসজিদ কমিটি।

সরকারি বা ব্যক্তিমালিকানাধীন জলাধার ভরাট করা আইনত নিষিদ্ধ জানিয়ে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন, সিলেটের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিম কীম বলেন, পুকুর-দীঘির রক্ষার দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের। তারা কোনো পুকুর ভরাট করতে পারে না। এটা সুস্পষ্ট আইনের লঙ্ঘন।

তিনি বলেন, মার্কেট নির্মাণের জন্য পুকুর ভরাট আরো বড় অপরাধ। আর মসজিদ কমিটি যদি পুকুরটি ভরাট করতে চায়, তাহলে দুই বছর আগে যখন প্রায় কোটি টাকা ব্যয়ে সংস্কার করা হলো, তখন কেন তারা এ কথা জানাল না। সরকারি অর্থের অপচয়ের পর কেন ভরাটের আবদার?

গত মঙ্গলবার সোনারপাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, মাটি ফেলে ভরাট করে ফেলা হয়েছে পুকুরটি। পুকুর ভরাট করে ফেলা হলেও চারপাশে সিটি করপোরেশনের নির্মাণ করা গার্ডওয়াল ও রেলিং এখনো রয়ে গেছে।

জানা যায়, সোনারপাড়ার এ পুকুরের চারপাশে প্রায় ৭০ লাখ টাকা ব্যয়ে গার্ডওয়াল ও এসএস রেলিং নির্মাণ করে সিটি করপোরেশন। নির্মাণ করা হয় ঘাট। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে সিটি মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী ও ১৯ নং ওয়ার্ডের তত্কালীন কাউন্সিলর দিনার খান হাসু এ কাজের উদ্বোধন করেন। ওই বছরই এ নির্মাণকাজ শেষ হয়। পুকুর ভরাট হয়ে গেলেও গার্ডওয়াল নির্মাণকাজের ফলক এখনো রয়ে গেছে। এরপর চলতি বছরের শুরুতে এ পুকুর সংস্কারের উদ্যোগ নেয় সিটি করপোরেশন। গত ফেব্রুয়ারিতে এক্সক্যাভেটর দিয়ে শুরু হয় পুকুর খননকাজ। এ সংস্কারে আরো প্রায় ৩০ লাখ টাকা ব্যয় হয়। তবে পুকুর থেকে কিছু মাটি উত্তোলনের পরই পূর্ব ও উত্তর পাশের আরসিসি গার্ডওয়ালসহ রাস্তা ধসে পড়ে। একই সঙ্গে আশপাশের একাধিক বহুতল ভবনের দেয়ালে ফাটল দেখা দেয়। এরপর বন্ধ হয়ে যায় সংস্কারকাজ।

স্থানীয়রা জানান, গত মাসে (অক্টোবরে) হঠাৎ করে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে মাটি ফেলে পুকুরটি ভরাট করে দেয়া হয়।

স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, ২০১৮ সালে পুকুর সংস্কারের কাজটি পেয়েছিল পিনু অ্যান্ড কানু নামের এক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। পরে তত্কালীন কাউন্সিলর দিনার খান হাসু ঠিকাদারের কাছ থেকে কিনে নিয়ে নিজে কাজটি করান। কাউন্সিলর নিজে ঠিকাদার হওয়ায় তার ইচ্ছামতো কাজ করেন। নিম্নমানের কাজের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। দিনার খান হাসু বিদেশে থাকায় এ ব্যাপারে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সিটি করপোরেশনের ১৯ নং ওয়ার্ডের বর্তমান কাউন্সিলর এসএম শওকত আমীন তৌহিদ বলেন, পুকুরটি খননের সময় এক্সক্যাভেটর দিয়ে অতিরিক্ত মাটি উত্তোলনের কারণে চারপাশের আরসিসি ওয়াল ও রস্তা ধসে পড়ে। এতে আশপাশের ভবনেও ফাটল দেখা দেয়। ফলে বাধ্য হয়ে পুকুরটি ভরাট করে দিতে হয়। ভরাটের আগে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেয়া হয়েছে।

তবে পুকুর ভরাটের ব্যাপারে ভিন্ন কথা বলেছেন সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান। তিনি বলেন, পুকুরটি মসজিদের মালিকানাধীন। মসজিদ কমিটি থেকে পুকুরটি ভরাটের জন্য আমাদের কাছে আবেদন করা হয়েছিল। মসজিদের আয়ের জন্য তারা এখানে মার্কেট করতে চান। তাদের আবেদন বিবেচনায় নিয়ে পুকুরটি ভরাট করা হয়েছে।

পুকুর ভরাটে আইনি নিষেধাজ্ঞা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আইনের নিষেধের কথা আমরা জানি। আমরাও পুকুরসহ কোনো ধরনের জলাশয় ভরাট করার পক্ষে নই। বরং সিটি করপোরেশন নগরীর ছড়া-দীঘিগুলো উদ্ধারে কাজ করছে। কিন্তু এ পুকুর ছোট হওয়ায় ও খননের সময় ফাটল দেখা দেয়ায় মসজিদ কমিটির আবেদন বিবেচনায় নেয়া হয়েছে।