দেশে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা বেড়েই চলেছে। প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে। ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১ সালে দেশে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ থেকে দুর্ঘটনার সংখ্যা ছিল ৮৯৪। অর্থাৎ দিনে গড়ে দুটির বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ দুর্ঘটনাগুলো মূলত গ্যাসের লিকেজ থেকে ঘটে। সিলিন্ডারের হোস পাইপ, রেগুলেটর, গ্যাস ভালভের মতো গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশের ত্রুটির কারণে গ্যাস লিক হয়। সেই লিকেজ থেকে গ্যাস বেরিয়ে বাইরে কোথাও জমতে থাকে। সামান্য আগুন, এমনকি স্ফুলিঙ্গের সংস্পর্শে আসার সঙ্গে সঙ্গে জমে থাকা সেই গ্যাস ভয়াবহ বিস্ফোরণ সৃষ্টি করে।
তেমনই এক বিস্ফোরণে দগ্ধ হয়ে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছেন নারায়ণগঞ্জের আসমা বেগম। গত রোববার বাড়ির পাশে একটি গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে দগ্ধ হন তিনিসহ ১১ জন। আগুনে আসমার মুখ, হাত-পা ঝলসে গেছে, শ্বাসনালিসহ পুড়ে গেছে শরীরের ৪০ শতাংশ। ওই দুর্ঘটনায় গুরুতর দগ্ধ দুজন এরই মধ্যে মারা গেছেন। একই দিন ময়মনসিংহের ভালুকায়ও গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে সহোদর তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
বেশ কয়েকটি গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ঘটনার তদন্ত করেছেন ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক (অপারেশন) দেবাশীষ বর্ধন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের বেশির ভাগ ঘটনার নেপথ্যে থাকে ত্রুটিপূর্ণ যন্ত্রাংশ ব্যবহার। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ত্রুটি পাওয়া যায় গ্যাস ভালভ ও রেগুলেটরে। কিছু ক্ষেত্রে মানহীন হোস পাইপ থেকেও এমন লিকেজ হয়। এ ধরনের দুর্ঘটনা রোধে সিলিন্ডার নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি এর ব্যবহারকারীদেরও সচেতনতা বাড়াতে হবে বলে মনে করেন এ কর্মকর্তা।
প্রতিবেশী দেশের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ভারতে বাসাবাড়িতে ব্যবহারের জন্য সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহার করা হয়। সেখানে পাইপলাইনের গ্যাস সংযোগ নেই। বিপুল পরিমাণে সিলিন্ডার ব্যবহার হলেও সে দেশে সিলিন্ডার বিস্ফোরণের মতো দুর্ঘটনা ঘটে না। কারণ সেখানে সিলিন্ডার ও এর যন্ত্রাংশের মান কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। পাশাপাশি সিলিন্ডার ব্যবহারের ক্ষেত্রেও ভারতীয়রা অনেক সচেতন। কিন্তু সে তুলনায় আমাদের দেশের সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহারকারীদের মধ্যে এখনো সেই সচেতনতা তৈরি করা যায়নি।
গত রোববার নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানার আলীগঞ্জ বেপারিবাড়ি এলাকায় গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে নিহত জজ মিয়ার ছেলে প্রত্যক্ষদর্শী সিয়াম জানান, তাদের বাড়ির গলিতেই এ দুর্ঘটনা ঘটেছে। পাশের বাড়ির ট্রাক মালিক আবদুল বাতেন তার গাড়িতে ব্যবহূত গ্যাস সিলিন্ডারটি মেরামত করতে নিয়ে যান। এ সময় অন্য একটি ট্রাকের চালক আলম মিয়া সিগারেটে আগুন ধরালে ওই সিলিন্ডারটি বিস্ফোরিত হয়। এতে আগুন ছড়িয়ে পড়ে দগ্ধ হন কয়েকটি পরিবারের নারী ও শিশুসহ ১১ জন। একই সঙ্গে জজ মিয়ার বাড়ির গ্যাস লাইনের রাইজারেও আগুন ধরে যায়। পরে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ২ ঘণ্টা চেষ্টার পর সেই আগুন নেভাতে সক্ষম হন।
একই দিন রাত সোয়া ৯টার দিকে ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার সিডস্টোর এলাকায় গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের আগুনে দগ্ধ হয়ে মারা যায় একই পরিবারের ঘুমন্ত তিন শিশু। এ দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে কাজ শুরু করে ভালুকা ফায়ার সার্ভিসের জ্যেষ্ঠ স্টেশন অফিসার আল মামুনের নেতৃত্বে একটি কমিটি। দুর্ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা প্রাথমিক আলামতের বরাত দিয়ে আল মামুন জানান, বাসাটির রান্নাঘরে ব্যবহূত গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে এ দুর্ঘটনা ঘটে। ঘটনাস্থল থেকে সিলিন্ডারের ক্ষতিগ্রস্ত একটি রেগুলেটর উদ্ধার করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, রেগুলেটরটি ত্রুটিপূর্ণ ছিল। সে কারণেই এ দুর্ঘটনা ঘটেছে। ফায়ার সার্ভিস সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, ২০২১ সালে ৮৯৪টি গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে আহত হয়েছে ৭৫ জন। এসব ঘটনায় আটজনের মৃত্যু হয়েছে। সর্বশেষ রোববার নারায়ণগঞ্জ ও ময়মনসিংহের ঘটনায় ১৪ জন দগ্ধ হয়েছেন। তাদের মধ্যে মারা গেছেন পাঁচজন এবং হাসপাতালে শঙ্কটাপন্ন অবস্থায় চিকিৎসাধীন অন্তত তিনজন।
একের পর এক গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা দুষছেন বিস্ফোরক পরিদপ্তরকে। তাদের দাবি, একটি গ্যাস সিলিন্ডার ন্যূনতম ২০ বছর ব্যবহার করার কথা। কিন্তু নিয়ম অনুযায়ী, এ সময়ের মধ্যে কয়েক দফায় রেগুলেটর ও ভালভ পরিবর্তন করতে হয়। এ দুটি যন্ত্রাংশই মূলত গ্যাস লিকেজ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেশের সিলিন্ডারগুলোয় মানহীন রেগুলেটর ও ভালভ ব্যবহারের ফলে লিকেজ সৃষ্টি হয়। অথচ সিলিন্ডার ও এতে ব্যবহূত যন্ত্রাংশের মান পরীক্ষার দায়িত্ব বিস্ফোরক পরিদপ্তরের। কিন্তু যথাযথভাবে এসব গ্যাস সিলিন্ডারের মান পরীক্ষা করা হয় না। আর এ সুযোগে বাজারে ছড়িয়ে পড়ছে মানহীন গ্যাস সিলিন্ডার ও এতে ব্যবহূত যন্ত্রাংশ।
দেশে বর্তমানে ৬০ লাখের বেশি গ্রাহক এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার করেন। এ গ্রাহকের একটি বড় অংশই গ্রামাঞ্চলের। এ মুহূর্তে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে মোট ৩০টি কোম্পানির অন্তত দুই কোটি সিলিন্ডার বাজারে রয়েছে। বিস্ফোরক পরিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত এক বছরে এলপিজি সিলিন্ডার আমদানি করা হয়েছে ৬ লাখ ১৩ হাজার ৩২৩টি। এলপিজি ছাড়া অন্যান্য সিলিন্ডার আমদানি করা হয়েছে ৩ লাখ ১ হাজার ১৯০টি। পাশাপাশি দেশে সিলিন্ডার নির্মাণের জন্য তিনটি প্রতিষ্ঠানকে অনুমতি দেয়া হয়েছে। অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান বাজারজাত করেছে দেশে নির্মিত ৩৫ লাখ ৮২৯টি এলপিজি সিলিন্ডার। কিন্তু এসব সিলিন্ডারের মান পরীক্ষার জন্য অনুমোদিত কোনো পরীক্ষণ কেন্দ্র গড়ে ওঠেনি।
গত বছরের বেশ কয়েকটি গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা অনুসন্ধান করেছে বিস্ফোরক পরিদপ্তর। তার মধ্যে রয়েছে গত বছরের ২০ জুন গাজীপুরের এনসি বাজারে সংঘটিত সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা, যেখানে তিনজন নিহত হন। দুর্ঘটনাটি অনুসন্ধান শেষে বিস্ফোরক পরিদপ্তর জানায়, সিলিন্ডারের রেগুলেটর অথবা চুলার চাবির ত্রুটির কারণে এলপি গ্যাস লিকেজ হয়ে আবদ্ধ ঘরে জমা হয়। ঘটনার দিন চুলা জ্বালানোর পর ইলেকট্রিক স্পার্কের মাধ্যমে সিলিন্ডারটি বিস্ফোরিত হয়। ওই বছরেরই ১৬ মে খুলনার ইকবালনগরে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের আরেকটি ঘটনা ঘটে। ওই দুর্ঘটনা তদন্ত করে বলা হয়েছে, রেগুলেটর সঠিকভাবে সিলিন্ডারের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল না। ফলে সেখান থেকে গ্যাস বের হতে থাকে। একপর্যায়ে চুলা জ্বালানোর সঙ্গে সঙ্গে সিলিন্ডারের মুখে আগুন ধরে যায়। ওই দুর্ঘটনায় একজনের মৃত্যু হয়।
গ্যাস সিলিন্ডারের এত গ্রাহক থাকার পরও কেন অনুমোদিত সিলিন্ডার পরীক্ষণ কেন্দ্র নেই তা জানতে যোগাযোগ করা হয় বিস্ফোরক পরিদপ্তরে। কয়েক দফা ফোন ও সেলফোনে মেসেজ পাঠানোর পরও প্রধান বিস্ফোরক পরিদর্শক নায়েব আলীর সাড়া পাওয়া যায়নি।










