রংপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট, নীলফামারী জেলা নিয়ে রংপুর কৃষি অঞ্চল। সাধারণত নভেম্বর থেকে আলুবীজ বপন শুরু হয়। এজন্য ডিলারদের মাধ্যমে এসব জেলায় কৃষকদের কাছে বীজ পৌঁছে দেয় বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)। তার আগে দাম নির্ধারণ করে দেয় সংস্থাটি। এর পরই বীজ সংগ্রহের জন্য ডিলারদের কাছ থেকে আগাম বুকিং নেয়া হয়। এক টন বীজের জন্য ডিলারকে অগ্রিম বুকিং দিতে হয় ১০ হাজার টাকা। গত বছর প্রতি কেজি বীজের দাম ছিল প্রকারভেদে ৫৫-৬০ টাকা। তবে এ বছরই প্রথম দাম নির্ধারণ না করেই আগাম বুকিং নিচ্ছে বিএডিসি।

ডিলাররা বলছেন, চলতি মৌসুমে এমনিতেই আলুর দাম কম। হিমাগার গেটে এখনো প্রতি কেজি আলু ১২ টাকা বিক্রি হচ্ছে। এবার আলুর দাম না বাড়ায় এমনিতে অধিকাংশ কৃষক লোকসানের মুখে পড়েছেন। এ অবস্থায় যদি বিএডিসি বীজের দাম নির্ধারণ না করে, তাহলে ডিলাররা বীজ বিক্রি করা তো দূরের কথা আর্থিকভাবেও লোকসানের মুখে পড়বেন। কারণ বিএডিসি যদি গত বছরের মতো দাম নির্ধারণ করে তাহলে কৃষক বীজ কিনবে না। নিজেদের কাছে থাকা আলুই বীজ হিসেবে ব্যবহার করবে। সেক্ষেত্রে আবাদও কমিয়ে দিতে পারেন কৃষক।

বিএডিসির তালিকাভুক্ত ডিলার কুড়িগ্রামের মো. আবুল কালাম আজাদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাজারে আলুর দাম একেবারেই কম। এজন্য অবশ্যই বীজের দাম নির্ধারণের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে। যদি বীজের দাম বেশি করা হয় তাহলে অধিকাংশ বীজ অবিক্রীত থাকবে। এতে শুধু ডিলাররা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না, বিএডিসিরও সুনাম ক্ষুণ্ন হবে।’

তিনি বলেন, ‘ডিলাররা বাধ্য নন বেশি দামে বীজ কিনতে। তবে ডিলারশিপ চালানোর জন্য চার-পাঁচ টন বীজ নেয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। লোকসান করে হলেও অনেকে এ পরিমাণ বীজ কিনবেন। আমরা তৃণমূল কৃষকদের কাছাকাছি থাকি, প্রতিনিয়ত দেখছি উৎপাদিত আলু বিক্রি করতে কেমন হিমশিম খাচ্ছেন তারা।’

রংপুর কৃষি অঞ্চলের পাঁচ জেলায় বিএডিসির তালিকাভুক্ত ডিলার রয়েছেন ৮১৫ জন। প্রতি কেজি বীজের দাম ২৫-৩০ টাকার মধ্যে নির্ধারণ করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

বিএডিসি (বীজ বিপণন) রংপুর অঞ্চলের উপপরিচালকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বীজের জন্য ডিলারদের প্রথম পর্যায়ে অগ্রিম বুকিং ৮ জুলাই শুরু হয়ে শেষ হয়েছে ১০ আগস্ট। ৪০০ টন বীজের জন্য ৫২ জন ডিলার অগ্রিম বুকিং দিয়েছেন। তবে ৩৫০ টন বীজের জন্য অগ্রিম টাকা জমা দিয়েছেন ৪৪ জন ডিলার। দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয়েছিল ২১ আগস্ট। শেষ হয়েছে ৭ সেপ্টেম্বর। ৬৫৫ দশমিক ৫০০ টন বীজের জন্য আবেদন করেছেন ৮৩ জন। যদিও তা অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। অনুমোদন পেলে টাকা জমা দেয়ার বিষয়টি আসবে।

বিএডিসি বীজ ও সার ডিলার অ্যাসোসিয়েশন রংপুর জেলার সভাপতি মো. জাহাঙ্গীর আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বীজের ব্যবসা সম্প্রসারণ করার জন্য বিএডিসি এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে আমার কাছে মনে হচ্ছে। তবে আলুর যে বাজারদর, বিষয়টি লক্ষ্য রেখে যদি দাম নির্ধারণ করা না হয় তাহলে বীজ অবিক্রীত থেকে যাবে। গত বছর বিএডিসি কর্তৃপক্ষ ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকার বীজ ক্রয় করার যে বাধ্যবাধকতা দিয়েছিল সেটি ডিলারদের ওপর এক ধরনের চাপ তৈরি করেছিল।’

বীজের চাহিদা গত বছরের চেয়ে এবার কিছুটা কম নির্ধারণ করা হয়েছে। আসন্ন মৌসুমে (২০২৫-২৬) রংপুর অঞ্চলের জন্য বীজের চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছে ২ হাজার ৭৬৫ টন। গত মৌসুমে (২০২৪-২৫) চাহিদা ছিল ২ হাজার ৮২৭ টন।

রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার আলমবিদিতর ইউনিয়নের খামার মোহনা গ্রামের কৃষক সামিউল ইসলাম বলেন, ‘গত বছর তিন বিঘা জমিতে আলু আবাদ করেছিলাম। দাম ভালো না পাওয়ায় লোকসান হয়েছে। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি আসন্ন মৌসুমে শুধু নিজেদের খাবারের জন্য কিছু আলু আবাদ করব।’

রংপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪-২৫ মৌসুমে রংপুর কৃষি অঞ্চলে আলু আবাদ হয়েছিল ১ লাখ ১৯ হাজার ৭৩৯ হেক্টর জমিতে। উৎপাদন হয়েছিল ৩২ লাখ ৩০ হাজার ৬৮২ টন। ২০২৩-২৪ মৌসুমে আবাদ হয়েছিল ১ লাখ ৬০২ হেক্টর জমিতে। আর উৎপাদন হয় ২৬ লাখ ২৯ হাজার ৮৯৩ টন।

রংপুর বিভাগীয় কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, রংপুর বিভাগের আট জেলায় হিমাগার রয়েছে ১১৬টি। যার ধারণ ক্ষমতা ১১ লাখ ৯ হাজার ৬৯২ টন। সবচেয়ে বেশি হিমাগার রয়েছে রংপুর জেলায়। ৪০টি হিমাগারে ধারণক্ষমতা রয়েছে ৪ লাখ ৬১ হাজার ৭৪৭ টন। অথচ আলু উৎপাদন হয়েছে হিমাগারের ধারণ ক্ষমতার চেয়ে প্রায় তিন গুণের কাছাকাছি। ফলে সরকার আলুর সর্বনিম্ন দাম প্রতি কেজি ২২ টাকা নির্ধারণ করলেও এখনো হিমাগার গেটে বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ১২ টাকা।

সার্বিক বিষয়ে বিএডিসি (বীজ বিপণন) রংপুর অঞ্চলের উপপরিচালক মো. মাসুদ সুলতান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এবারই প্রথম বীজের দাম নির্ধারণ না করে ডিলারদের কাছে বুকিং নেয়া হচ্ছে।’

কবে নাগাদ বীজের দাম নির্ধারণ করা হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই ঢাকায় আমাদের মিটিং আছে। সেখান থেকেই শুধু আলুবীজ নয়, রবি মৌসুমের সব শস্যবীজের দাম নির্ধারণ করা হবে। যারা অগ্রিম বুকিং করছেন তাদের হিমাগার (চয়েজ) পছন্দের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেয়া হবে। কাছে যেকোনো হিমাগার থেকে বীজ চাইলে তাকে অবশ্যই দেয়া হবে।’

বীজের দাম নির্ধারণের সময় মূল্য বিপর্যয় আমলে নেয়া হবে কিনা জানতে চাইলে মাসুদ সুলতান বলেন, ‘অবশ্যই বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে। প্রতি হেক্টরে প্রকারভেদে গড়ে ১৯ কেজি বীজ প্রয়োজন হয়। জাতভেদে ২৫-৪০ টন পর্যন্ত আলু উৎপাদন হয়।’