চলতি অর্থবছরের শেষ তিন মাসে আগের যেকোনো প্রান্তিকের তুলনায় বেশি রাজস্ব আদায় করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি বলেন, আমাদের সামনে তিন মাস সময় আছে। আশা করছি, এ সময়ের মধ্যে চতুর্থ প্রান্তিকে অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি রাজস্ব আদায় করতে পারব। এছাড়া গত বছরের তুলনায়ও বেশি রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য রয়েছে।

রোববার রাজস্ব আহরণবিষয়ক টাস্কফোর্সের সঙ্গে মতবিনিময় সভা শেষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। রাজধানীর আগারগাঁওয়ের জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সম্মেলন কক্ষে এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এসময় উপস্থিত ছিলেন সংস্থাটির চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান।

সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, অর্থনীতি কার্যত স্থবির—এ নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। আমরা উত্তরাধিকার সূত্রে একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতি পেয়েছি। একই সঙ্গে বিশ্বের অন্যতম নিম্ন কর-জিডিপি অনুপাত আমাদের হাতে এসেছে, যা ৭ শতাংশেরও নিচে। এ পরিস্থিতির মধ্যে পশ্চিম এশিয়া ও ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান সংঘাত অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে; যা একপ্রকার ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের পথ খুঁজে বের করাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ। অনেকেই প্রশ্ন করেন, বর্তমান সরকার একের পর এক সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি নিচ্ছে। এসবের অর্থায়ন কীভাবে হবে? এর সরল উত্তর হলো, কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো হবে। সমালোচনা বা বিরোধিতা থাকতে পারে, কিন্তু বাস্তবতা রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধির বিকল্প নেই।

রাশেদ আল মাহমুদ বলেন, অতীতে শুধু লুটপাটই হয়নি, কাগজে-কলমে রাজস্ব আয়ের হিসাবেও বড় ধরনের গরমিল করা হয়েছে। সরকারের দেখানো রাজস্ব আয়ের সঙ্গে প্রকৃত আহরণের মিল নেই। একদিকে গোষ্ঠীতান্ত্রিক সুবিধা দিয়ে কর-জিডিপি হার নিচে নামিয়ে রাখা হয়েছে, অন্যদিকে যে আয় দেখানো হয়েছে, তারও বাস্তব ভিত্তি ছিল না। বর্তমান বাস্তবতায় দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। দরিদ্র বাড়লে সরকারের দায়িত্বও বাড়ে। সে লক্ষ্যে আমরা বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছি। ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করা হয়েছে, নারীদের সহায়তা বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি ইমাম-মুয়াজ্জিন, পুরোহিত, বৌদ্ধ ধর্মীয় নেতাসহ বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি নেয়া হয়েছে।

কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে নেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, আমাদের বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। দেশীয় ঋণের ওপর নির্ভরতা কমাতে করের হার না বাড়িয়ে অর্থনীতির আকার বৃদ্ধি ও বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বিনিয়োগ বাড়লে উৎপাদন বাড়বে, উৎপাদন বাড়লে কর্মসংস্থান বাড়বে, আর কর্মসংস্থান বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই কর হার না বাড়িয়েই কর আদায় বাড়বে। এর মাধ্যমে কর-জিডিপি অনুপাত ধাপে ধাপে বাড়িয়ে প্রথমে ১০ শতাংশ, এবং পরে ১৫ শতাংশে নেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে আমরা একটি ভঙ্গুর শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতা নিয়ে এগোচ্ছি। সড়কের অবস্থা খারাপ, ব্যয় বাড়ছে কিন্তু গুণগত উন্নতি হচ্ছে না। এসব ঠিক করতে হলে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো ছাড়া উপায় নেই।

এনবিআরকে পৃথকীকরণের সিদ্ধান্ত যৌক্তিক জানিয়ে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আলোচনা করে পরের পদক্ষেপগুলো নেয়া হবে। অতীতে কর ফাঁকি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে যে তদন্ত শুরু হয়েছে, তা অব্যাহত থাকবে। এনবিআর চেয়ারম্যান নিয়মিতভাবে রাজস্ব আদায়ের অগ্রগতি তুলে ধরবেন।

রাজস্ব আয় বাড়াতে হলে কিছু কাঠামোগত পরিবর্তন জরুরি বলে মনে করেন রাশেদ আল মাহমুদ। তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একটি বড় সমস্যা হলো পরিচালন ব্যয় ক্রমাগত বাড়ছে, কিন্তু মূলধনী ব্যয় বা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় হচ্ছে না। অপচয় ও অপ্রয়োজনীয় সুবিধা দেয়ার সংস্কৃতি আমাদের রাজস্ব ব্যবস্থাকে দুর্বল করেছে। পারফরম্যান্সভিত্তিক প্রণোদনা না থাকায় দক্ষতা বাড়েনি। এছাড়া ব্যাপক হারে কর ফাঁকি ও জালিয়াতি ছিল। এ জায়গাগুলোয় আমরা পরিবর্তন আনছি। কর অবকাশ বাদ দিয়ে পারফরম্যান্সভিত্তিক প্রণোদনা দেব আমরা। সার্বিকভাবে সরকার দুটি বড় ধরনের সংস্কারে জোর দিচ্ছে—কাঠামোগত সংস্কার (স্ট্রাকচারাল রিফর্ম) এবং নীতিগত সংস্কার (পলিসি রিফর্ম)। এই দুই ধরনের সংস্কার বাস্তবায়ন করা গেলে রাজস্ব বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন সম্ভব হবে।