ঋণের আবেদন করা দূরের কথা, হিসাব খোলার পর গ্রাহক কখনো ব্যাংকেই যাননি। অথচ সে গ্রাহকের নামেই ৯০ লাখ টাকা ঋণ অনুমোদন দিয়েছে ব্যাংক। একাধিক পে-অর্ডার সমন্বয়ের মাধ্যমে ঋণের বড় অংশ পরিশোধও করা হয়েছে। গোটা বিষয়টিই ঘটেছে গ্রাহকের অজ্ঞাতে। ভুতুড়ে এ ঋণ জালিয়াতির ঘটনা সংঘটিত হয়েছে এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের সাতক্ষীরা কলারোয়া শাখায়।
এ ঘটনায় শাখা ব্যবস্থাপকসহ চার আসামির নাম উল্লেখ করে খুলনার দৌলতপুর থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন ভুক্তভোগী গ্রাহক শেখ অহিদুল ইসলাম। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) খুলনা কার্যালয়ও এখন বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করছে। অভিযোগকারী অহিদুল ইসলাম খুলনায় রাজিব মটরস নামে একটি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী। খুলনা জেলা ট্রাক মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে নিয়োজিত এ ব্যবসায়ী সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের ঠিকাদারির সঙ্গেও যুক্ত।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শেখ অহিদুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, কোনো দিন ব্যাংকে গেলাম না, অথচ আমার নামে ঋণ হয়ে গেল। এ কেমন কথা? বিষয়টি জানার পর এনআরবিসি ব্যাংকের কলারোয়া শাখার ব্যবস্থাপকের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলাম। তিনি নিজে থেকেই ক্ষমা প্রার্থনা করে ঋণটি সমন্বয় করে দিয়েছেন। অনেক ধরনের প্রতারণার কথা শুনেছি, কিন্তু এভাবেও ঋণ দেয়া ও সমন্বয় করা যায়, সেটি জানা ছিল না।
তবে ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীর তোলা এ প্রতারণার অভিযোগ স্বীকার করতে নারাজ এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের কলারোয়া শাখার ব্যবস্থাপক কাজী মোশারফ হোসেন। গতকাল সন্ধ্যায় বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, রাজিব মটরসের স্বত্বাধিকারী অহিদুল ইসলামের সঙ্গে কিছুক্ষণ আগেও আমার কথা হয়েছে। তিনি থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন বলে আমাকে বলেননি। তার সঙ্গে কিছুটা ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। বিষয়টি মীমাংসাও হয়ে গেছে। নথিপত্র যাচাই-বাছাই করেই ঋণটি অনুমোদন দেয়া হয়েছিল। পে-অর্ডারের মাধ্যমে গ্রাহকের ঋণ পরিশোধ হয়েছে।
দেশের ব্যাংক খাতে অনিয়ম-দুর্নীতি ও প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ লুণ্ঠনের ঘটনা এখন সাধারণ বিষয়। তবে গ্রাহকের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের আবেদন না পেলেও ঋণের অনুমোদন করে তা ব্যবহারের ঘটনা খুব বেশি শোনা যায়নি। এর আগে রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংকে এ ধরনের জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছিল। তত্কালীন চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চুর নেতৃত্বে লুণ্ঠিত হওয়ার সময় বেসিক ব্যাংকেও এমন আবেদন ছাড়াই ঋণ বিতরণের ঘটনা ঘটেছিল। বিষয়টি কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ বিভিন্ন সংস্থার তদন্তে উঠেও এসেছে। এবার অনেকটা একই ধরনের ঘটনার অভিযোগ শোনা গেল ২০১৩ সালে অনুমোদন পাওয়া এনআরবিসি ব্যাংকে।
ব্যাংকটিতে এর আগেও বড় ধরনের আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছে। ২০১৭ সালের শেষের দিকে এনআরবিসি ব্যাংকের তত্কালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেওয়ান মুজিবুর রহমানকে অপসারণ করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। ঋণ কেলেঙ্কারির সঙ্গে যুক্ত থাকায় ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদও পরবর্তী সময়ে ভেঙে দেয়া হয়েছিল।
আবেদন ছাড়াই ঋণ দেয়ার বিষয়টি নিয়ে ভুক্তভোগী গ্রাহক শেখ অহিদুল ইসলাম খুলনার দৌলতপুর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি নং-৮৭) করেন গত ২ ডিসেম্বর। এনআরবিসি ব্যাংকের সাতক্ষীরার কলারোয়া শাখার ব্যবস্থাপক কাজী মোশারফ হোসেন, কর্মকর্তা সাহেদ শরীফ ও বদিয়ার রহমানের নাম উল্লেখ করে জিডিতে তিনি বলেন, এক বছর আগে আব্দুল হালিম শেখ নামের পূর্ব পরিচিত ব্যবসায়ীর সঙ্গে এনআরবিসি ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা আমার অফিসে আসেন। তারা আমাকে ব্যাংকটিতে একটি হিসাব খোলার অনুরোধ করেন। তাদের অনুরোধ রক্ষায় আমি ব্যাংক হিসাবের ফরমে স্বাক্ষর দেয়ার পাশাপাশি ছবি ও জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি দিই। এরপর থেকে ব্যাংকটির কোনো কর্মকর্তার সঙ্গে আমার দেখা বা যোগাযোগ হয়নি। হিসাবটি চালু হয়েছে কিনা, সে সম্পর্কেও আমি জ্ঞাত ছিলাম না। গত মাসে ব্র্যাক ও ইস্টার্ন ব্যাংকে আমি দুটি ক্রেডিট কার্ডের জন্য আবেদন করি। তখন আমাকে এনআরবিসি ব্যাংক থেকে নেয়া ৯০ লাখ টাকার ঋণের নথিপত্র জমা দিতে বলা হয়। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোয় (সিআইবি) খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, এনআরবিসি ব্যাংকের সাতক্ষীরার কলারোয়া শাখা থেকে আমার নামে ৯০ লাখ টাকার ঋণ নেয়া হয়েছে। এরই মধ্যে বেশির ভাগ ঋণ পরিশোধ করায় হিসাব স্থিতি ৯ লাখ ৩২ হাজারে নেমে এসেছে। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট শাখার ব্যবস্থাপক কাজী মোশারফ হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনিসহ অন্য কর্মকর্তারা ভুল স্বীকার করে ঋণটি সমন্বয় করে দেয়ার প্রস্তাব দেন।
এ বিষয়ে শেখ অহিদুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, এনআরবিসি ব্যাংক এরই মধ্যে ঋণটি সমন্বয় করে আমাকে ছাড়পত্র দিয়েছে। যে প্রক্রিয়ায় আমার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ অনুমোদন ও সমন্বয় করা হয়েছে, সেটি সুস্পষ্টভাবে জালিয়াতি ও প্রতারণা। ভবিষ্যতের কথা বিবেচনায় রেখে আমি থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছি। এভাবে যে কারো নামে ব্যাংক থেকে ঋণ অনুমোদন হয়ে গেলে দেশের ব্যাংক খাতের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থাই নষ্ট হয়ে যাবে।










