করোনা
মহামারীর কারণে প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছিল চট্টগ্রামের বিহারি পল্লীর কারচুপি ও জারদৌসি শিল্প।
কাপড়ের ওপর বাহারি নকশার কারুকাজের সুনাম থাকলেও রেডিমেড কাপড় ও বিদেশী কাপড়ের
আগ্রাসনের কারণে অনেকটা জৌলুশ হারিয়ে ফেলেছে শিল্পটি। সারা বছর কাজ না থাকায় একের
পর এক বন্ধ হয়েছে
এ শিল্পের কারখানাগুলো। অন্যদিকে এ শিল্পের অভিজ্ঞ
কারিগররা অর্থ সংকটে পড়ে ঝুঁকেছেন বিকল্প পেশায়। তবে চলতি বছর ঈদকে কেন্দ্র করে দেশী কাপড়ের ওপর কারুকাজের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় পুরনো কাজে ফিরেছেন কারিগররা। রাতের বেলাও যেন বন্ধ নেই কারখানাগুলো।
কারখানার মালিকরা বলছেন, বছরের অন্যান্য সময়ে এ শিল্পে উৎপাদিত পণ্যের চাহিদা নেই বললেই চলে। তবে ঈদের আগে হঠাৎ চাহিদা বাড়ায় পুরনো কারিগরদের অতিরিক্ত টাকা দিয়ে কাজে ফিরিয়ে আনা হয়েছে এক থেকে দেড় মাসের জন্য। যে কারণে আমাদের কারুকাজের দাম বাড়াতে হয়েছে। তাছাড়া কাঁচামালের দামও বেড়েছে অনেক। চট্টগ্রামেই দুই দশক আগে প্রায় ২০ হাজার মানুষ এ পেশায় যুক্ত থাকলেও এখন সেটা শতাধিকে নেমেছে।
চট্টগ্রামের বিহারি পল্লীর চয়েস কারচুপি হাউজের মালিক মোহাম্মদ জালাল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কভিডের আগে থেকেই এ কারচুপি ও জারদৌসির কাজের চাহিদা কমে গিয়েছিল। কোনোভাবে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা গেলেও কভিডের কারণে ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছেন বেশির ভাগ মালিক। তবে বাজারে কিছু দেশীয় পোশাকের দোকানে চাহিদা থাকায় বেশকিছু অর্ডার পেয়েছি। যার কারণে এবারের ঈদে তুলনামূলক কাজ বেশি পাওয়ায় কিছু কারিগরকে অতিরিক্ত অর্থ দিয়ে কাজে ফিরিয়ে নিয়ে আনা হয়েছে। তবে ঈদ চলে গেলে কাজ তেমন থাকে না। ঈদের ডেলিভারি দেয়ার কারণে ১৫ রমজানের পর নতুন কোনো কাজের অর্ডার নিইনি। তবে কিছু পুরনো গ্রাহক আছেন তাদের কাজ নিতে হয়েছে। তাদের নিজস্ব নকশা অনুযায়ী কাজ করছি। এখন রাত জেগে কারিগররা কাজ করছেন। তবে সারা বছর কাজের অর্ডার থাকলে এ শিল্পটিকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হতো।’
স্বাধীনতা-পরবর্তী চট্টগ্রামের ওয়ারলেস এলাকার বিহারি পল্লীতে কাপড়ের ওপর কারচুপি ও জারদৌসি শিল্পের সূত্রপাত। আশির দশকের শেষের দিকে এ কারুকাজের এতটাই চাহিদা ছিল যে ভারত, পাকিস্তান কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের দেশ থেকে কারিগররা চট্টগ্রামে আসতেন কাজ শিখতে। কারচুপি ও জারদৌসি হলো একটি হস্তশিল্প। কাঠের ফ্রেমে নকশা আঁকা কাপড় রেখে পাথর ও বিভিন্ন সুতা দিয়ে কাজ করা হয়। সাধারণত মোগল স্থাপত্যরীতির একটা ছাপ ফুটিয়ে তোলা হয় এ কারুকাজে। মোগল আমলের মিনার, কলকি জারদৌসি কাজের মূল বৈশিষ্ট্য। পিওর সিল্ক, মসলিন, জর্জেট ও ভেলভেটের কাপড়ে জারদৌসি পূর্ণ রূপে ফুটে ওঠে। সাধারণত পাঞ্জাবি বা জামার ক্ষেত্রে একদিন থেকে এক সপ্তাহ, শাড়ির ক্ষেত্রে এক মাসও সময় লাগে। অনেক সময় কাজের ওপর নির্ভর করে একটি শাড়ি তৈরিতে দুই মাসের বেশি সময় লাগে।
সরজমিনে বিহারি পল্লীতে দেখা যায়, ঈদের আগে শেষ মুহূর্তেই কাজে ব্যস্ত কারিগররা। নতুন কোনো অর্ডার না নিলেও কাপড় ডেলিভারি দিতে ব্যস্ত কারখানার মালিকরা। সময়ের পরিবর্তনে কারচুপি ও জারদৌসির কাজের ব্যাপক পরিবর্তন দেখা গেছে কারখানাগুলোয়। বুটিকসের কাজ, পুঁথি বসানো ছাড়াও ছাপজাতীয় নকশা বসানোর কাজে কিছু মেশিনারি ব্যবহার করতে দেখা গেছে। তবে হাতের কাজের চাহিদাই বেশি।
কাপড়ভেদে দাম প্রসঙ্গে কারখানার মালিকরা জানান, সালোয়ারের নকশা অনুযায়ী কারচুপির কাজ হচ্ছে ৩-২০ হাজার টাকা, পাঞ্জাবিতে আড়াই হাজার থেকে ১০ হাজার, থ্রি-পিসে ২-১২ হাজার, লেহেঙ্গায় ৫-১৫ হাজার, বোরকায় সাড়ে ৩ থেকে ৭ হাজার, ওড়নায় দেড় থেকে ২ হাজার, শাড়িতে ১০-৫০ হাজার টাকায় কারচুপি ও জারদৌসের কাজ করা হয়েছে। এছাড়া উন্নতমানের ভালো ও সূক্ষ্ম ডিজাইনের জন্য শাড়িতে লাখ টাকা পর্যন্ত কাজ আগে করা হলেও এ ধরনের অর্ডার এখন নেই বললেই চলে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, কারচুপি ও জারদৌসির প্রধান কাঁচামাল যেমন জরি, সুতা, পুঁতি, চুমকি, পাথর, সিল্কের কাপড় ইত্যাদি ভারতের বিভিন্ন রাজ্য এবং পাকিস্তান থেকে আমদানি করা হতো। আমদানি খরচ বেড়ে যাওয়া, আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামাল সংকট, বাংলাদেশের স্থানীয় বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় গ্রাহকের আগ্রহ কমে গেছে।
কারিগররা বলেন, ‘চট্টগ্রামের ওয়ারলেস এলাকার বিহারি পল্লীর বাসিন্দাদের পারিবারিক ঐতিহ্য কারচুপি ও জারদৌসির কাজ। এক দশক আগেও কাজের এত চাহিদা ছিল যে সারা বছর কাজের চাপে ছিলাম আমরা। ভারত কিংবা পাকিস্তানে ডিজিটাল মেশিনে নিখুঁত কাজ করা হচ্ছে। কিন্তু আমরা এ হাতের কাজ ছাড়া অন্য বিষয়গুলোয় পরিবর্তন করতে পারিনি। কিন্তু আমাদের হাতের কাজের মান কোনো অংশে কম না। হাতের কাজের জনপ্রিয়তার কারণে অনেক গ্রাহক আমাদের কাছে কাজ নিয়ে আসেন। তবে সেই কাজের পরিমাণ অনেক কমে গেছে।’
পাপ্পু বুটিক হাউজের স্বত্বাধিকারী খালিদ জাফর পাপ্পু বণিক বার্তাকে বলেন, চলতি বছরে ঈদে বেশকিছু কাজ পেয়েছি। যার কারণে চারজন কারিগর নিয়োগ দিয়েছি এক মাসের জন্য। কভিডের কারণে ব্যবসা বন্ধ থাকলেও গত বছর থেকে কারচুপি ও জারদৌসির কাজ বেড়েছে। দেশীয় কাপড়ের দিকে মানুষ যত ঝুঁকবে ততটাই আমাদের শিল্পের কাজ বাড়বে।’










