ঢাকা থেকে বরগুনা যাওয়ার পথে গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর রাতে ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে এমভি অভিযান-১০ লঞ্চে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে প্রাণ হারায় অর্ধশতাধিক মানুষ। ওই দুর্ঘটনার পেছনের কারণ জানতে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় সাত সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্ত প্রতিবেদনে দুর্ঘটনার জন্য লঞ্চের ইঞ্জিনের ত্রুটিকে দায়ী করা হয়। ইঞ্জিনটি ঢাকা কেরানীগঞ্জের মীরেরবাগের একটি অবৈধ ডক থেকে সংযোজন করা হয়েছিল। তদন্তে উঠে আসা ওই ডকটি বন্ধ করে দিলেও মীরেরবাগে আরো ৩১টি অবৈধ ডক সচল রয়েছে। নদীগর্ভ দখল করে গড়া ওঠা ডকগুলো বন্ধ না করার ফলে পরিবেশের যেমন ক্ষতি হচ্ছে, নষ্ট হচ্ছে বুড়িগঙ্গার জীবপ্রকৃতিও।
জানা যায়, দুর্ঘটনার মাসখানেক আগে এমভি অভিযান-১০ লঞ্চটির ইঞ্জিন সংযোজন করা হয় ঢাকার কেরানীগঞ্জের মেসার্স মাদারীপুর ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কসে। দুর্ঘটনার পর নড়েচড়ে বসে নৌ-পরিবহন অধিদপ্তর। আগে থেকেই মেয়াদোত্তীর্ণ ডকইয়ার্ডটির লাইসেন্স বাতিল করে দেয় কর্তৃপক্ষ। তবে কেরানীগঞ্জে এখনো মেয়াদোত্তীর্ণ আরো ৩১টি ডকইয়ার্ডের বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না সংস্থাটি।
১৯৬০ সাল থেকে রাজধানীর কেরানীগঞ্জে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অন্তত দুই কিলোমিটার এলাকাজুড়ে গড়ে উঠেছে এসব ডকইয়ার্ড। পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি এসব ডকইয়ার্ডের কারণে দেশের প্রধান নদীবন্দর সদরঘাটের নৌপথ সংকুচিত হচ্ছে। বৃহস্পতিবার সরেজমিন দেখা গিয়েছে, কেরানীগঞ্জের মীরেরবাগে মাদারীপুর ডকের কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও লাইসেন্সহীন আরো ৩১টি ডকইয়ার্ড সচল রয়েছে। প্রতিটি ডকেই চলছে নতুন জাহাজ ও লঞ্চ নির্মাণ কর্মযজ্ঞ। পাশাপাশি নদীতে নোঙর করে চলছে পুরনো জাহাজ মেরামতের কাজও। বিভিন্ন ইয়ার্ড থেকে জাহাজ তৈরি ও ভাঙার বিভিন্ন অংশও নদীতেই ফেলা হচ্ছে। কারখানাগুলোতে কাজ করছে শিশুসহ নানা বয়সী মানুষ, তাদের কারোরই নেই সুরক্ষা সরঞ্জাম। এছাড়া মেরামতের সময় পুরনো জাহাজে থাকা ডিজেল, লুব্রিক্যান্টসহ তলদেশে থাকা বিভিন্ন বর্জ্য বুড়িগঙ্গার পানিতে মিশে যাচ্ছে।
জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে কেরানীগঞ্জের মীরেরবাগে নদীগর্ভ দখল করে এসব ডকইয়ার্ড গড়ে উঠেছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ নৌ-পরিবহন কর্তৃৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) এবং নৌ-পরিবহন অধিদপ্তরের সহযোগিতা রয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, নদী রক্ষা কমিশনের প্রতিবেদন অনুসারে, নদীগর্ভের অভ্যন্তরে গড়ে তোলা ডকইয়ার্ডের জমিগুলো আরএস রেকর্ডের ভিত্তিতে নামজারি করা হয়েছে, যা নদীর ক্ষেত্রে আইনসংগত হয়নি।
একাধিক ডক মালিকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ডকইয়ার্ডের লাইসেন্স নবায়নের জন্য কাগজপত্র জমা দেয়া হয়েছে। বিভিন্ন জটিলতায় লাইসেন্স পেতে দেরি হচ্ছে। মাদারীপুর ডকের মালিক মো. সহিদুল ইসলাম ভূইয়া বণিক বার্তাকে বলেন, এখানকার কোনো ডকেরই লাইসেন্স নেই। কিন্তু শুধু আমার ডকটিই বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ঢাকা ডকইয়ার্ডের মালিক হাজী মো. ইকবাল হোসেন বলেন, এখান থেকে ডক সরিয়ে ফেলার ব্যাপারে সরকারের সঙ্গে আমাদের কথাবার্তা হচ্ছে। বেশকিছু প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেই আমরা এখান থেকে সরে যাব।
নদীগর্ভ ভরাট করে ডক পরিচালনার বিষয়ে জানতে চাইলে ডক মালিকরা বলেন, সরকার আমাদের সুযোগ দিচ্ছে, তাই আমরা ব্যবসা করছি। আমরা প্রতি বছর ট্যাক্স দিচ্ছি। এত বছর আমাদের লাইসেন্স দিয়েছে। হঠাৎ করে লাইসেন্স দিতে গড়িমসি করছে। যদি কোনো অনিয়ম থেকে থাকে সেটি বিআইডব্লিউটিএ এবং নৌ-পরিবহন অধিদপ্তরের, ব্যবসায়ীদের নয়।
জানা গিয়েছে, ২০১৯ সালে বিআইডব্লিউটিএর উদ্যোগে বুড়িগঙ্গা ও ঢাকার পার্শ্ববর্তী নদীগুলোতে ব্যাপক উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। তখন নদী-তীরবর্তী অনেক বড় স্থাপনাও গুঁড়িয়ে দেয়া হয়। কিন্তু এ ৩২টি ডকইয়ার্ড ভাঙা হয়নি। এ বিষয়ে জানার জন্য তত্কালীন উচ্ছেদ কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত একজন কর্মকর্তা বলেন, আমরা অঙ্গীকার নিয়েই মাঠে নেমেছিলাম। সফলও হয়েছি অনেক। কিন্তু এ ডকইয়ার্ডগুলো উচ্ছেদ করতে পারিনি। যেদিন ডকইয়ার্ডে অভিযানের তারিখ ছিল তার আগের দিন রাতে ওপর মহল থেকে অভিযান পরিচালনা করতে নিষেধ করা হয়। ফলে উচ্ছেদ কার্যক্রম আটকে যায়। তখনই বুঝতে পেরেছি নদীর ওপর অবৈধভাবে টিকে থাকা এ ডকইয়ার্ডগুলো সরানো খুব কঠিন ব্যাপার।
একটি ডকের লাইসেন্স বাতিল করে অন্যদের কার্যক্রম চলমান থাকার ব্যাপারে নৌ-পরিবহন অধিদপ্তরের চেয়ারম্যান কমডোর মো. নিজামুল হক সেলফোনে বণিক বার্তাকে বলেন, এসব বিষয় জানতে হলে অফিসে আসেন। এভাবে বলতে পারব না।
সার্বিক বিষয়ে নৌ-পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, কভিডের আগে আমরা ডক মালিকদের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। তারাও নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে এখান থেকে ব্যবসা অন্য কোথাও সরিয়ে নেবে। তবে কোথায় সরিয়ে নেবে এ বিষয়গুলো এখনো চূড়ান্ত হয়নি। যেহেতু এখানে ব্যবসায়ীদের বিপুল বিনিয়োগ রয়েছে, হুট করেই তো তাদের ফেলে দেয়া বা সরিয়ে দেয়া সম্ভব নয়। পর্যায়ক্রমে এগোচ্ছি আমরা। আমাদের সময় দিতে হবে।










