দেশে বেসরকারি খাতে উচ্চশিক্ষার যাত্রা ১৯৯২ সালে। তিন দশকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০৮-এ। সংখ্যার এ উল্লম্ফনের সঙ্গে বেসরকারি খাতে উচ্চশিক্ষার গুণগত মানের বিস্তর ফারাক দেখা যাচ্ছে। গবেষণা ও গ্রন্থাগার উন্নয়নের মতো উচ্চশিক্ষার মৌলিক বিষয়গুলো থাকছে একদমই অবহেলিত। ন্যূনতম অবকাঠামো ও শিক্ষক নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে সিংহভাগ বিশ্ববিদ্যালয়। দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ধারাবাহিকের আজ চতুর্থ পর্ব 

আইন অনুযায়ী প্রত্যেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েরই শিক্ষার্থীদের ফি-বেতন নির্ধারণের এখতিয়ার রয়েছে। তবে এক্ষেত্রে অবশ্যই আর্থসামাজিক মানদণ্ড বিবেচনায় নেয়ার আইনি নির্দেশনা রয়েছে। যদিও কেন্দ্রীয়ভাবে কোনো নীতিমালা না থাকায় শিক্ষার্থীদের ওপর নিজেদের ইচ্ছামতো মোটা অংকের ফি আরোপ করছে বড় ও স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। যেটিকে অযৌক্তিক হিসেবে দেখছে খোদ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)।

দেশে অনুমোদিত প্রথম বেসরকারি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়টির উত্থানই হয়েছে মূলত ব্যাচেলর অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (বিবিএ) প্রোগ্রামে ভর করে। ২০০০ সালের দিকে নর্থ সাউথে বিবিএ পড়তে একজন শিক্ষার্থীর ক্রেডিটপ্রতি ব্যয় ছিল ৩ হাজার ৫৭৫ টাকা। ওই সময় রেজিস্ট্রেশন বা ভর্তি ফি ছিল ১০ হাজার টাকা। যদিও এখন বিশ্ববিদ্যালয়টিতে পড়তে শিক্ষার্থীদের ক্রেডিটপ্রতি টিউশন ফি দিতে হয় সাড়ে ৬ হাজার টাকা। আর ভর্তি ফি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫ হাজার টাকা। টিউশন ও ভর্তি ফির বাইরে গ্রন্থাগার, ল্যাব ও অ্যাক্টিভিটির মতো বিভিন্ন ফিও বহুগুণ বাড়ানো হয়েছে। এর সঙ্গে মাঝেমধ্যেই যুক্ত করা হচ্ছে নতুন ফি।

শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের অভিযোগ, সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের নীতিমালা না থাকার সুযোগে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিজেদের ইচ্ছামতো নানা নামে মোটা অংকের ফি আদায় করছে। বিশ্ববিদ্যালয়টির একজন শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, একদিকে মোটা অংকের টিউশন ফি, অন্যদিকে নানা নামে নতুন ফি আরোপ করা হয়। এখানে সবকিছুকে বাণিজ্যিকভাবে দেখা হয়। একটা পরিচয়পত্র বাবদ ১ হাজার টাকা ফি নেয়া হচ্ছে। পরিচয়পত্র বানানোর খরচ কত? এখান থেকেও লাভ করতে হবে? আগে নন-ক্রেডিট ল্যাবের জন্য কোনো ফি দিতে হতো না। এখন বলা হচ্ছে, সেখানেও সাড়ে ৬ হাজার টাকা করে ফি দিতে হবে।

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে মোটা অংকের ফি আরোপের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অবাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হওয়া সত্ত্বেও প্রতি বছর আয়কৃত অর্থের কয়েকশ কোটি টাকা উদ্বৃত্ত থাকে বিশ্ববিদ্যালয়টির। মোটা অংকের ফি বিষয়ে জানতে চাইলে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আতিকুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, আমি দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে গত কয়েক বছর একবারও টিউশন ফি বাড়ানো হয়নি। বরং করোনাকালে আমরা টিউশন ফির ওপর ২০ শতাংশ করে ছাড় দিয়েছি। আর নন-ক্রেডিট কোর্সে একসময় ফি নেয়া হতো না—এটা ঠিক, তবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এখন ফি নেয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

শিক্ষার্থী সংখ্যার বিবেচনায় আরেক বড় বিশ্ববিদ্যালয় ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি। ২০১০-১১ সালের দিকে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে একজন শিক্ষার্থীর সাংবাদিকতা বিষয়ে স্নাতক পড়তে সব মিলিয়ে খরচ হতো ২ লাখ ৩৭ হাজার টাকা। এক দশকের ব্যবধানে এখন সেটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৯৯ হাজার টাকা। অন্যান্য প্রোগ্রামের ক্ষেত্রেও প্রায় একই হারে টিউশনসহ অন্যান্য ফি বেড়েছে। বিবিএ ও বিএসসি প্রোগ্রামের ক্ষেত্রে ফির পরিমাণ বেড়েছে আরো বেশি হারে।

নর্থ সাউথ ও ড্যাফোডিলের মতোই গত এক দশকে দফায় দফায় ফি বাড়িয়েছে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস ও আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির মতো বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।

সংশ্লিষ্টদের মতে, আইনে দেয়া এখতিয়ারের সুযোগ নিয়েই শিক্ষার্থীদের ওপর মোটা অংকের ফির খড়্গ চাপিয়ে দিচ্ছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০-এ ফি নির্ধারণ বিষয়ে বলা হয়েছে, ‘প্রত্যেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় উহার প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহের নিমিত্ত শিক্ষার্থীদের জন্য দেশের আর্থসামাজিক অবস্থার মানদণ্ডে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি শিক্ষার্থী ফি কাঠামো প্রস্তুত করিয়া বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনকে অবহিত করিবে। কমিশন অবহিত হওয়ার পর প্রয়োজনে পরামর্শ প্রদান করবে।’

যদিও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অধিকাংশই শিক্ষার্থী ফি কাঠামোর বিষয়ে কমিশনকে নিয়মিত অবহিত করছে না। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মোটা অংকের ফি বিষয়ে জানতে চাইলে ইউজিসি সদস্য অধ্যাপক ড. বিশ্বজিৎ চন্দ বণিক বার্তাকে বলেন, বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়েই টিউশন ফি যৌক্তিক পর্যায়ে রয়েছে। তবে যেসব বিশ্ববিদ্যালয় এরই মধ্যে একটি অবস্থানে চলে এসেছে, তারা শিক্ষার্থীদের ওপর মোটা অংকের ফি আরোপ করছে। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে এত বেশি ফি নিচ্ছে যে প্রতি বছর তাদের তহবিলে কোটি কোটি টাকা উদ্বৃত্ত থাকছে। তাই এরই মধ্যে আমরা মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত করে এ-সংক্রান্ত কিছু সুপারিশও করেছি।

ইউজিসির সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনেও টিউশনসহ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ধরনের শিক্ষার্থী ফি যৌক্তিক পর্যায়ে আনতে সুপারিশ করা হয়। শিক্ষার্থী ফি বিষয়ে কমিশনের ৪৭তম বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ভর্তি ও টিউশন ফি এবং শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বিষয়ে ভিন্নতা ও অসামঞ্জস্যতা রয়েছে। এছাড়া শিক্ষার্থীদের ট্রান্সক্রিপ্ট, সার্টিফিকেট ও প্রশংসাপত্র ইত্যাদি সরবরাহ করার ক্ষেত্রেও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো উচ্চহারে ফি নিয়ে থাকে। এমনকি কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই প্রতি বছর টিউশন ও ভর্তিসহ অন্যান্য ফি বাড়ানোর অভিযোগও পাওয়া যায়। যেহেতু দেশের সব অঞ্চলের আর্থসামাজিক অবস্থা সমান নয়, সেহেতু শিক্ষার্থীদের প্রদেয় বিভিন্ন ফি ও চার্জ একটি যৌক্তিক পর্যায়ে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণে সরকার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নির্দেশনা দিতে পারে।