২০০৯ সালের ২৫ মে উপকূলে টানা প্রায় ১০ ঘণ্টা তাণ্ডব চালিয়েছিলে ঘূর্ণিঝড় আইলা। ঠিক তার বছর দুয়েক আগে ২০০৭ সালের নভেম্বরে আরেকটি ক্ষত দেগেছিলো অতি মারাত্মক ঘূর্ণিঝড় সিডর। সরকারি হিসেবে সেসময় প্রায় দুই হাজার ২১৭ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। ক্ষয়ক্ষতির হিসাবে সিডরকে জাতীয় দুর্যোগও ঘোষণা করে সরকার।

সিডরের পরে আইলার হানায় বিপযস্ত উপকূলীয় অঞ্চল এখনো সেড়ে ওঠেনি পুরোপুরি। এখনো উপকূলীয় বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষিজমি আবাদযো আবাদযোগ্য হয়ে ওঠেনি। রয়েছে খাবার পানিরও তীব্র সংকট। আইলা আঘাত হানার ১১ বছর পর সেই মে মাসেই ফের ধেয়ে আসছে ঘূর্ণিঝড় আম্পান। আজ সন্ধ্যা নাগাদ উপকূলে ঘূর্ণিঝড়টি সুপার সাইক্লোনের রূপ নিয়ে আছড়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন আবহাওয়াবিদরা।
 
ঘূর্ণিঝড় আইলায় উপকূলীয় জেলা পটুয়াখালী, বরগুনা, ভোলা, বরিশাল, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, খুলনা ও সাতক্ষীরা জেলায় জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করেছিল। খুলনা ও সাতক্ষীরায় ৭১১ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ বিধ্বস্থ হয়েছে। ফলে তলিয়ে যায় খুলনার দাকোপ ও কয়রা এবং সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও আশাশুনি উপজেলার ১৩টি ইউনিয়ন লোনা পানিতে তলিয়ে যায়। ৭৬ কিলোমিটার বাঁধ পুরোপুরি এবং ৩৬২ কিলোমিটার বাঁধ আংশিকভাবে ধসে পড়ে।

এবারো আম্পানের প্রভাবে উপকূলীয় উপজেলা কয়রা, দাকোপসহ খুলনা শহরে বৈরী আবহাওয়া বিরাজ করেছে। গতকাল মঙ্গলবার দুপুর থেকে থেমে থেমে মাঝারি ধরনের বৃষ্টিপাত শুরু হয়। এর প্রভাবে স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে নদীর পানি কিছুটা বৃদ্ধি পায়। এর ফলে ঝুঁকিপুর্ণ বেড়ীবাঁধ নিয়ে আতংকে পড়েন উপজেলার বাসিন্দারা।

আবহাওয়া অফিসের তথ্য মতে, ঘূর্ণিঝড় আম্পানের কারণে বৃষ্টি অব্যাহত থাকবে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাতাসের গতিবেগও বাড়বে।
কয়রার হরিণখোলার মানুষের সাথে কথা বলে জানা গেছে, গ্রামটির মানুষ উৎকণ্ঠায় রয়েছেন। তারা আশঙ্কা করছেন, ঘূর্ণিঝড় আম্পান আঘাত হানলে গ্রামের সামনের ছোট্ট বেড়িবাঁধটি ভেঙে যেতে পারে। তাহলে লোনা পানিতে পুরো এলাকা ভেসে যাবে। তারা দড়ি দিয়ে শক্ত করে ঘর-বাড়ি বেঁধে রাখার চেষ্টা করছেন। অনেকে গরু-ছাগল নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যাচ্ছেন।

হরিণখোলার বাসিন্দা আব্দুল হাকিম শেখ বলেন, ‘চরম আতঙ্কের মধ্যে আছি। সত্যি সত্যি যদি ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে, তবে পুরো এলাকা ভেসে যাবে।

হরিণখোলা এলাকাটি পানি উন্নয়ন বোর্ডে ১৩-১৪/২ পোল্ডারের আওতায়। ১১ বছর আগে ঘূর্ণিঝড় আইলায় এখানে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল। সে স্মৃতি এখনো মানুষের মনে গেঁথে আছে। তাই প্রতিটি মানুষ আতঙ্কের মধ্য আছেন। এছাড়া ঘূর্ণিঝড়ে ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতির আশঙ্কায় রয়েছেন দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়নের আংটিহারা, খাসিটানা, জোড়শিং, মাটিয়াভাঙ্গ, উত্তর বেদকাশি ইউনিয়নের গাতিরঘেরি, গাববুনিয়া, গাজিপাড়া, কাটকাটা, কয়রা সদর ইউনিয়নের ৬নং কয়রা, ৪নং কয়রার পুরাতন লঞ্চঘাট সংলগ্ন এলাকা, মদিনাবাদ লঞ্চ ঘাট, ঘাটাখালি, হরিণখোলা, মহারাজপুর ইউনিয়নের উত্তর মঠবাড়ি, দশালিয়া, লোকা, মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের কালিবাড়ি, নয়ানি, শেখেরটেকের বেড়ীবাঁধ এলাকা।

কয়রার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণ কক্ষের দায়িত্বরত কর্মকর্তা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসার মো. জাফর রানা বলেন, ‘অতীতে আমরা দেখেছি, যারা দুর্যোগের আশঙ্কার মধ্যে থাকেন, তাদের একটি অংশ নানা কারণে সাইক্লোন সেন্টারে যেতে চান না বা যান না। এবার উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ এবং ভলান্টিয়ারদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

কয়রা উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শিমুল কুমার সাহা বলেন, আম্পানের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় সব ধরনের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। উপজেলা প্রশাসন ও সিপিপিসহ বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবকরা ঘূর্ণিঝড়ের বিষয়ে সতকর্তামূলত প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। ১২টি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। কয়রা উপজেলা জুড়ে ১১৬টি সাইক্লোন সেল্টারসহ বিভিন্ন বিদ্যালয়ভবনসহ পাকা ও নিরাপদ স্থাপনা প্রস্তুত রাখা হয়েছে আশ্রয়ের জন্য। পাশাপাশি ৭টি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও থানা পুলিশদের নিয়ে আলাদা টিম গঠন করা হয়েছে। নিরাপদ পানি ও খাদ্য মজুত করা হয়েছে।