দেশের অন্যতম সমুদ্রবন্দর খুলনার মোংলা। নাব্যতা সংকটে দীর্ঘদিন অকেজো হয়ে আছে সমুদ্রবন্দরের পশুর চ্যানেলটি। বিদ্যমান সমস্যা কাটাতে পশুর নদীর ইনারবার (অভ্যন্তরীণ) ড্রেজিং কার্যক্রম শুরু হয় গত বছরের মার্চে। নদী খননের মাটিকে পলি মাটি আখ্যা দিয়ে দাকোপ উপজেলার বানিশান্তা ইউনিয়নের ৩০০ একর জমিতে ফেলতে চাইছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া এভাবে কৃষিজমিতে নদীর তলদেশের মাটি ফেললে উর্বরতা নষ্ট হয়ে যাবে।
জানা গিয়েছে, নাব্যতা সংকট কাটাতে বন্দরের জেটিতে স্বাভাবিক জোয়ারে ৯ দশমিক ৫০ মিটারের অধিক ড্রাফটের জাহাজ আনার জন্য জয়মনির ঘোল থেকে বন্দর জেটি পর্যন্ত প্রায় ২৩ কিলোমিটারব্যাপী ইনারবারে ২১৬ দশমিক ৯ লাখ ঘনমিটার ড্রেজিংয়ের কাজ শুরু হয়েছে। বন্দর সূত্র জানিয়েছে, ড্রেজিং প্রকল্পের মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৭৯৩ কোটি ৭২ লাখ ৮০ হাজার টাকা। চলতি বছরের জুনে এ প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও করোনার কারণে তা হয়নি। চলতি আগস্টে ড্রেজিং করতে গেলে স্থানীয় কৃষকরা বাধা দেন। এতে কাজ আবার বন্ধ হয়ে যায়।
স্থানীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গিয়েছে, বন্দর কর্তৃপক্ষ ড্রেজিংয়ের নামে তিন ফসলি জমিতে মাটি ভরাট করতে জমি হুকুম দখলে নেয়। এতে ফসলি জমি পতিত হওয়ার পাশাপাশি কৃষিনির্ভরশীল অন্তত পাঁচ হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বন্দর কর্তৃপক্ষের এ সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের জন্য অধিবাসী দীর্ঘ প্রায় দেড় বছর ধরে আন্দোলন-সংগ্রাম করে গেলেও এখনো এ সমস্যার সমাধান হয়নি।
কৃষকদের দাবির সঙ্গে সংহতি জানিয়ে নিজেরা করির সমন্বয়কারী খুশী কবির নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি দেন। চিঠিতে তিনি বলেন, বানিশান্তার কৃষিজমির হুকুম দখলের ক্ষেত্রে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ অসত্য তথ্য দিয়েছে। তারা বলেছে, এখানের মাটিতে কোনো ধরনের ফসল হয় না। আসলে এটি তিন ফসলি জমি। ড্রেজিংয়ের বালি এখানে ফেললে আর কখনো কৃষিকাজ করা যাবে না। এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে বালি ফেলার জন্য বিকল্প স্থান দেখানোর পরও মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ তাদের জায়গা থেকে সরে আসছে না।
বানিশান্তায় যে ৩০০ একর জমিতে বালি ফেলা হবে, তাতে জমির উর্বরতা বা কৃষিজমি নষ্ট হচ্ছে কিনা জানতে চাইলে মোংলা বন্দরের বোর্ড ও জনসংযোগ বিভাগের সচিব কালাচাঁদ সিংহ বণিক বার্তাকে বলেন, প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের জন্য ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) মাধ্যমে প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাই (ফিজিবিলিটি স্টাডি) করা হয়। কুয়েটের বিজ্ঞানীরা এখানের মাটি পরীক্ষা করে বলেছেন, এটা পলি মাটি। সে সিদ্ধান্তের আলোকেই আমরা মাটি কৃষিজমিতে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে জমির উর্বরতা আরো বাড়বে।
এ কথার সঙ্গে দ্বিমত করেন বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানী (পুষ্টি ও শস্য) মোহাম্মাদ আলী সিদ্দিকী। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, মাটির ঘনত্ব পরিমাপ করে মাটিকে পলি বলা হলো আর তা কৃষিজমিতে ফেলা শুরু করে দিলাম এটা কেমন কথা। নদী থেকে তোলা মাটির কার্বন ও নাইট্রোজেন কত শতাংশ সেটা পরীক্ষা করেছে? সেখানে ফসফরাস, পটাশিয়াম, সালফার, জিংক, বোরন, ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেশিয়াম পাওয়া যায় কিনা তাও পরীক্ষা করতে হবে। শুধু পলি মাটি হলেই তা কৃষির উপযোগী নয়।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, সংশ্লিষ্ট জমিটি উর্বর কৃষিজমি এতে কোনো সন্দেহ নেই। বিকল্প জায়গা থাকতেও কেন কৃষিজমি নষ্ট করে ড্রেজিংয়ের মাটি এখানে ফেলবে আমার বুঝে আসে না। বন্দর কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই এমন ধ্বংসাত্মক সিদ্ধান্ত থেকে ফিরে আসতে হবে।










