বাংলাদেশে প্রতি বছর অসংখ্য মানুষ ক্যান্সার, কিডনি, লিভার সিরোসিস, জন্মগত হৃদরোগ, স্ট্রোকে প্যারালাইজড ও থ্যালাসেমিয়ার মতো জটিল ও দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে। প্রাণ সংহারী এসব রোগের চিকিৎসা ব্যয়ও বেশি। এসব রোগে আক্রান্ত দুস্থদের চিকিৎসায় আর্থিক সহায়তা কর্মসূচি চালু করে সরকার। কর্মসূচির আওতায় সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে আবেদনকারী রোগীকে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা সহায়তা দেয়া হয়। তবে গত তিন অর্থবছরে সিরাজগঞ্জে আবেদনকারী অনুপাতে বরাদ্দ কমেছে। আবেদন করেও সহায়তা পায়নি অনেকে। অনুদান পেতে বিলম্ব হওয়ায় চিকিৎসার অভাবে মৃত্যু হয়েছে এমন মানুষের সংখ্যাও কম নয়।

সমাজসেবা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সমাজসেবা অধিদপ্তর ‘হাসপাতাল সমাজসেবা কার্যক্রম’-এর মাধ্যমে দুস্থ রোগীদের আর্থিক সহায়তা দিয়ে আসছে। প্রথমদিকে শুধু ক্যান্সার, কিডনি ও লিভার সিরোসিসে আক্রান্তদের এককালীন ৫০ হাজার টাকা করে সহায়তা দেয়া হয়েছে। তিনটি থেকে বাড়িয়ে বর্তমানে দুরারোগ্য ছয়টি ব্যাধিতে আক্রান্ত রোগীদের আর্থিক সহায়তা দেয়া হচ্ছে। উপযুক্ত ব্যক্তিদের নির্ধারিত ফরমে আবেদন করতে হয়। প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের কপি সংযুক্ত করে পরিপূর্ণ আবেদন সংশ্লিষ্ট উপজেলা ও শহর সমাজসেবা কর্মকর্তার কার্যালয়ে জমা দিতে হবে। প্রাথমিক যাচাই-বাছাইয়ের পর আবেদনগুলো জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে পাঠানো হয়। পরে জেলা কমিটির মাধ্যমে দ্রুত উপকারভোগীদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে অনুদানের অর্থ দেয়া হয়।

তবে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, অনুদান চেয়ে সমাজসেবা অধিদপ্তরে আবেদন করেও যথাসময়ে আর্থিক সহায়তা পাননি অনেকে। আবার অনেকের নামে বরাদ্দকৃত অনুদানের টাকা এসেছে আবেদনকারী ব্যক্তির মৃত্যুর পর।

তাড়াশ উপজেলার তালম ইউনিয়নের ভেংড়ি বড়ইচড়া গ্রামের মোহসিন আলী ক্যান্সার আক্রান্ত ছিলেন। ২০২২ সালের প্রথমদিকে চিকিৎসার জন্য সরকারি অনুদান পেতে আবেদন করেন তিনি। ওই বছর আগস্টে মারা যান মোহসিন। ২০২৩ সালের এপ্রিলে ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ হয় তার নামে। আবেদনকারীর নমিনিরা সেই টাকা তুলে তার কুলখানিতে খরচ করেছেন।

এছাড়া আর্থিক সহায়তা পাওয়ার আগেই ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন তাড়াশ উপজেলার দেশীগ্রাম ইউনিয়নের নজরুল ইসলাম। স্ট্রোকে প্যারালাইজড হয়ে একই উপজেলার বারুহাঁস ইউনিয়নের বিনসাড়া গ্রামের হাশেম আলীও মারা গেছেন চিকিৎসা সহায়তা পাওয়ার আগেই।

সদর উপজেলার খোকশাবাড়ী গ্রামের আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘সরকার দরিদ্র রোগীদের আর্থিক সহযোগিতা দিয়ে উপকার করছে। তবে টাকা সময়মতো না পেলে রোগীকে সঠিক সময়ে চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হয় না।’

সিরাজগঞ্জ সমাজসেবা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২১-২২ অর্থবছরে এ কর্মসূচির আওতায় সিরাজগঞ্জে ২ কোটি ৪১ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। পাঁচ শতাধিক আবেদন করলেও প্রাপ্ত বরাদ্দ অনুয়ায়ী সহায়তা দেয়া হয় ৪৮২ রোগীকে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে বরাদ্দ কমিয়ে করা হয় ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এ সময়ে ৪০০ রোগী আবেদন করলেও ৩০০ জনকে দেয়া হয় অনুদান। বরাদ্দ কম থাকায় আবেদন করে সহায়তা পাননি ৫০ রোগী। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আবেদন পড়েছে ৯০০টি। এর বিপরীতে বরাদ্দ হয়েছে ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যথা সময়ে বরাদ্দ না পাওয়ায় আবেদনকারীকে সঠিক সময়ে টাকা দেয়া যাচ্ছে না। আবেদনকারীর সংখ্যা বাড়লেও কমেছে বরাদ্দের পরিমাণ। এ কারণে সরকারি সহায়তাবঞ্চিত হচ্ছেন অনেকে। গত ছয় মাসে জেলা কমিটির কোনো সভা হয়নি। এ কারণে সহযোগিতা পাওয়ার বিষয়টিও ঝুলে আছে।

এ বিষয়ে সিরাজগঞ্জ জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক ও কমিটির সদস্য সচিব মো. তৌহিদুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জটিল রোগীদের আর্থিক সহায়তা কর্মসূচির আওতায় প্রথম পর্যায়ে আবেদন পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট উপজেলা চেয়ারম্যান, নির্বাহী কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট সমাজসেবা কর্মকর্তা আবেদন যাচাই-বাছাই করেন। পরে তা জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে পাঠানো হয়। জেলায় যাচাই-বাছাইয়ের জন্য পাঁচ সদস্যের কমিটি আছে। যার সভাপতি জেলা প্রশাসক বা তার মনোনীত অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক। কমিটির সদস্যরা তিন মাস পরপর সভা করে আর্থিক আবেদন যাচাই-বাছাই করেন। পরে সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে বরাদ্দ এলে উপজেলা পর্যায়ে তা বণ্টন করা হয়। জেলায় মোট বরাদ্দকৃত অর্থ তিন মাস পরপর চার কিস্তিতে দেয়া হয়। আমরা প্রথম কিস্তি হিসেবে ৩৮ লাখ টাকা পেয়েছি। এ টাকা থেকে গত অর্থবছরে বাদ পড়া ৫০ জনকে সহায়তা দেয়া হবে। তারপর চলতি বছরের আবেদনকারীদের পর্যায়ক্রমে দেয়া হবে।’

জেলা প্রশাসক মীর মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকার চিকিৎসার জন্য অসহায় রোগীদের ৫০ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে। প্রতি বছরই বিপুল পরিমাণ মানুষ আবেদন করছে। কিন্তু আবেদনের তুলনায় বরাদ্দ কম পাওয়ায় সবাইকে একসঙ্গে সহযোগিতা করা সম্ভব হয় না। আবেদন পাওয়ার পর পর্যায়ক্রমে বরাদ্দ দেয়া হয়। অনেক সময় বরাদ্দ আসতে দেরি হয়। তখন কমিটির সভা করতেও দেরি হয়। সহায়তা পাওয়ার আগে অনেকের মৃত্যু হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়ার পর সহায়তার অর্থ দ্রুত পৌঁছে দেয়ার চেষ্টা করা হয়।’