দরপত্র নিয়ে জটিলতা ও উচ্চ আদালতের দেয়া স্থগিতাদেশে থেমে আছে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) চলমান মেগা প্রকল্পের আওতায় ১০৬ কোটি টাকার দুটি আবাসিক হল নির্মাণকাজ। ফলে কাজের শুরুতেই এ ধরনের ধাক্কা খাওয়ায় শঙ্কা তৈরি হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য ৫৩৭ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প নিয়ে। অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলছে, একটি দরপত্র নিয়ে দেখা দেয়া জটিলতা পুরো প্রকল্পের কাজে বিঘ্ন সৃষ্টি করছে না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল দপ্তর এবং পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মামলার কারণে গত ২৫ মার্চ হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি খসরুজ্জামান ও বিচারপতি মাহমুদ হাসান তালুকদারের দ্বৈত বেঞ্চের এক আদেশে ছয় মাসের জন্য ওই দরপত্রের কার্যক্রম স্থগিত ঘোষণা করা হয়। তার আগে ২২ মার্চ ওই ১০৬ কোটি টাকার ইজিপি টেন্ডার উন্মুক্ত হয়। দরপত্র উন্মুক্ত হওয়ার দুই দিন আগে দরপত্রের তথ্য ফাঁসের অভিযোগ ওঠে। তথ্য ফাঁসের বিষয়টি আমলে না এনে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দরপত্র উন্মুক্ত করে।

হাইকোর্ট তার আদেশে একই সঙ্গে আগের উন্মুক্ত পদ্ধতিতে দেয়া দরপত্র ও দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী মামলাকারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কেন কার্যাদেশ দেয়া হবে না এ মর্মে ছয় সপ্তাহের মধ্যে কারণ দর্শানোর রুল জারি করেন।

২০১৮ সালে অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য ৫৩৭ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন পায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়। এর অধীনে আবাসিক হল ও একাডেমিক ভবনসহ মোট নয়টি ১০তলা ভবন এবং ১৯টি ভবনের ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ কাজের পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়। এর মধ্যে ২০২০ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি ছাত্র হল-২ এবং ৫ মার্চ ছাত্রী হল-২ নামে দুটি হল নির্মাণের দরপত্র আহ্বান করে কর্তৃপক্ষ। নভেল করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে ১৭ মার্চ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে গেলে ১০৬ কোটি টাকা মূল্যমানের টেন্ডার দুটির উন্মুক্তকরণের তারিখ পেছানো হয় দুই দফায়। পরে ওই বছরেরই ১৩ ও ১৪ মে টেন্ডার গ্রহণ করে প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে তা উন্মুক্ত করা হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রকৌশল দপ্তর জানায়, ওই ১০৬ কোটি টাকা মূল্যের পৃথক দুটি দরপত্রে ১০টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান টেন্ডার জমা দেয়। এর মধ্যে ছয়টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন কারণে তাদের টেন্ডার তুলে নেয়। পরে দুই কাজের জন্য মেসার্স রহমান ট্রেডার্স (এমআরটি) ও ম্যাক ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের টেন্ডার যাচাই-বাছাই করা হয়। তাদের মধ্যে রহমান ট্রেডার্স সর্বনিম্ন দরদাতা হলেও টেন্ডারে নির্ধারিত সব শর্ত যথাযথ পূরণ করেনি এ প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু ম্যাক দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা হলেও টেন্ডারের সব শর্ত যথাযথ পূরণ করেছিল। এ কাজের টেন্ডার নোটিস প্রকাশের সময় তিনটি শর্ত দেয় কর্তৃপক্ষ। এতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে টেন্ডার প্রকাশের তারিখ থেকে আগের পাঁচ বছরের মধ্যে অন্তত ৩০ কোটি টাকার এককভাবে আটতলা ভবন নির্মাণের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। কিন্তু রহমান ট্রেডার্সের তা ছিল না। ফলে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন (পিপিআর) অনুযায়ী কাজের নির্দেশ প্রদানে জটিলতার মুখে পড়ে কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে মেয়াদ শেষ হয়ে যায় তত্কালীন উপাচার্যের। নতুন উপাচার্য হিসেবে যোগদান করেন অধ্যাপক শেখ আব্দুস সালাম।

নতুন উপাচার্য গত ৩ ফেব্রুয়ারি টেন্ডার মূল্যায়ন কমিটির সপ্তম সভা করেন। এ কমিটি চূড়ান্ত প্রতিবেদন তৈরি করে তিনটি সুপারিশসহ উপাচার্যের কাছে পেশ করে। সুপারিশ তিনটি হলো সর্বনিম্ন দরদাতা মেসার্স রহমান ট্রেডার্সের পাঁচ মাস ২৯ দিনের সময় ব্যত্যয়কে ধর্তব্যে না নিয়ে কার্যাদেশ দেয়া অথবা দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা ম্যাকের কার্যাদেশ দেয়া অথবা বাজারমূল্য বৃদ্ধি, দরদাতার সংখ্যা কম হওয়া এবং সব প্রক্রিয়া শেষ করতে সময় স্বল্পতা প্রভৃতি বিবেচনা করে এ দরপত্র বাতিল করে নতুনভাবে দরপত্র আহ্বান করা।

এ অবস্থায় উপাচার্য শেষের সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত হয়ে পুনরায় দরপত্র আহ্বানের সিদ্ধান্ত দেন। তবে উপাচার্য সাধারণ দরপত্রের পরিবর্তে ই-দরপত্রের সিদ্ধান্ত দেন।

এদিকে ৯ ফেব্রুয়ারি ম্যাকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহেদ মুরাদ উচ্চ আদালতে রিট করেন। এতে উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষ, টেন্ডার মূল্যায়ন কমিটির সাবেক ও বর্তমান সদস্যসহ ১১ জনকে বিবাদী করা হয়।

এ বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক শেখ আবদুস সালাম বণিক বার্তাকে জানান, টেন্ডার মূল্যায়ন কমিটি সাতটি সভা করেও একমতে পৌঁছতে পারেনি। এছাড়া ২০১৮ সালের পিডব্লিউ রেট অনুযায়ী তখন দরপত্র এস্টিমেট করা হয়েছিল। কিন্তু ২০২১ সালের নতুন রেট চূড়ান্ত হয়েছে। অন্যদিকে সবকিছুর বাজারমূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া পিপিআরের নিয়ম অনুযায়ী এখানে কাজের প্রতিযোগিতা হয়নি। যেহেতু আমরা এখনো কাজ সম্পন্ন করার সময় পাব, তাই রি-টেন্ডারের সিদ্ধান্ত নিতে হয়।