ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে গত এক দশকে মোটা দাগে বিনিয়োগ হয়েছে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার। এ টাকা খরচ করে ২০১৭ সালে মহাসড়কটি দুই থেকে চার লেনে উন্নীত করা হয়। কিন্তু দেশের প্রধান অর্থনৈতিক ও পর্যটন করিডোরে বর্তমানে যে পরিমাণ যানবাহন চলছে, তা মহাসড়কটির সক্ষমতার চেয়ে বেশি।
প্রাক্কলন বলছে, ভবিষ্যতে যানবাহন চলাচলের সংখ্যা আরো বাড়বে। প্রয়োজনের তুলনায় বিনিয়োগ না হওয়ায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে পণ্য পরিবহনে সময় ও অর্থ লাগছে বেশি। যানজটের কারণে হচ্ছে যাত্রী দুর্ভোগও। যদিও গত এক দশকে ঢাকা-খুলনা, ঢাকা-রংপুর, ঢাকা-সিলেটের মতো তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ করিডোরগুলোয় এর চেয়ে কয়েক গুণ বেশি বিনিয়োগ করেছে সরকার।
দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের ৯০ শতাংশ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ওপর নির্ভরশীল। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার আর তিন পার্বত্য জেলার কারণে মহাসড়কটি একই সঙ্গে দেশের প্রধান পর্যটন করিডোরও। স্বভাবতই প্রতি বছর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বাড়ছে চলাচলরত যানবাহনের সংখ্যা। এ বৃদ্ধির হার বিভিন্ন সংস্থার প্রাক্কলনের চেয়েও বেশি। ভবিষ্যতে মহাসড়কটি এশিয়ান হাইওয়ে ও সাসেক করিডোরে সংযুক্ত হলে চলাচলরত যানবাহনের সংখ্যা হবে আরো বেশি।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে প্রাক্কলনের চেয়ে বেশি হারে বাড়ছে যানবাহন চলাচলের সংখ্যা। ২০১৬ সালে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) করা এক সমীক্ষায় বলা হয়েছিল, ২০২৬ সাল নাগাদ মহাসড়কটিতে প্রতিদিন গড়ে ২২ হাজার ৭৫টি যানবাহন চলতে পারে। অন্যদিকে ২০১৯ সালে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) করা আরেক জরিপে বলা হয়, ২০২২ সালেই মহাসড়কটিতে প্রতিদিন চলতে পারে ২৬ হাজার যানবাহন। কিন্তু পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) পর্যায়ের জরিপ বলছে, ২০২০ সালের মধ্যেই মহাসড়কটিতে প্রতিদিন চলাচলরত যানবাহনের সংখ্যা ৩০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে।
সক্ষমতার চেয়ে বেশি যানবাহন চলাচল করায় এরই মধ্যে অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল শেষ করে ফেলেছে ২০১৭ সালে চালু হওয়া ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন মহাসড়ক। ক্রমবর্ধমান যানবাহনের চাপ সামাল দিতে দ্রুত মহাসড়কটি সম্প্রসারণ ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রয়োজন হলেও এখনো দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই সড়ক-মহাসড়ক উন্নয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি সংস্থা সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের। মহাসড়কে সম্প্রসারণের জন্য এখন কেবল একটি সম্ভাব্যতা সমীক্ষার কাজ শুরু করতে যাচ্ছে সংস্থাটি, যার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল এখনো নিযুক্ত করা হয়নি।
যদিও গত এক দশকে ঢাকা-চট্টগ্রামের চেয়ে তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ করিডোরগুলোয় কয়েক গুণ বেশি বিনিয়োগ করেছে সরকার। এর মধ্যে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের যাত্রাবাড়ী-মাওয়া-ভাঙ্গা অংশে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা খরচ করে গড়ে তোলা হয়েছে ৫৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এক্সপ্রেসওয়ে।
৬ হাজার ১৬৮ কোটি টাকা খরচ করে চার লেনে উন্নীত করা হয়েছে ঢাকা-টাঙ্গাইলের ৭০ কিলোমিটার মহাসড়ক। ১৬ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা ব্যয়ে টাঙ্গাইল থেকে রংপুর পর্যন্ত আরো ১৯২ কিলোমিটার মহাসড়ক চার লেনে উন্নয়নের কাজ চলমান রয়েছে। অন্যদিকে প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা খরচ করে ২০৯ কিলোমিটার দীর্ঘ ঢাকা-সিলেট মহাসড়কটি চার লেনে উন্নীত করার কাজ সম্প্রতি শুরু হয়েছে।
বিপরীতে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকায় চার লেনে উন্নীত করা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কটি অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও অবকাঠামোগতভাবে এখনো পিছিয়ে রয়েছে। এক দশকের মধ্যে চার লেনে উন্নীত হওয়া অন্যান্য মহাসড়কে ধীরগতির ও স্থানীয় যানবাহন চলাচলের জন্য পৃথক লেন থাকলেও ঢাকা-চট্টগ্রামে তা নেই। হাটবাজার ও গুরুত্বপূর্ণ মোড় বা ইন্টারসেকশনগুলোয়ও রাখা হয়নি পর্যাপ্ত ফ্লাইওভার-ওভারপাস-আন্ডারপাস। অবকাঠামোগত এসব দুর্বলতা আরো প্রকট করেছে মহাসড়কটি নির্মাণে দুর্বল পরিকল্পনা আর নিম্নমানের নির্মাণকাজ।
সওজে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মহাসড়কটির এসব দুর্বলতা ঢাকতে বর্তমানে দুটি প্রকল্প চলমান আছে। এর একটির মাধ্যমে মহাসড়কটি রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছে, যাতে খরচ হচ্ছে ৭৯৩ কোটি টাকা। আরেকটি প্রকল্পের মাধ্যমে বিভিন্ন স্থানে ওভারপাস ও আন্ডারপাস তৈরি করা হচ্ছে। কিন্তু এ বিনিয়োগ প্রয়োজনের তুলনায় মহাসড়কটির সক্ষমতা বাড়াতে পারবে না বলে মন্তব্য করেছেন খোদ সওজের কর্মকর্তারাই।
বিষয়টি সম্পর্কে দৃষ্টি আকর্ষণ করে জানতে চাইলে সংস্থাটির প্রধান প্রকৌশলী মো. ইসহাক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এ রাস্তা এখন যে অবস্থায় আছে তা যানবাহনের বিদ্যমান ট্রাফিকের জন্য উপযোগী না। রাস্তাটি আরো প্রশ্বস্ত করা দরকার। তাছাড়া রাস্তার ধারে প্রচুর বাড়িঘর আছে, হাটবাজার আছে। ধীরগতির যানবাহনের জন্য বা অযান্ত্রিক যানবাহনের জন্য কোনো লেন নেই। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কটি চাহিদার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ করে এখনো আমরা নির্মাণ করতে পারিনি।’
মহাসড়কটি সম্প্রসারণের একটি উদ্যোগ হাতে নেয়া হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা একটি ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) করছি। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক যত লেন প্রয়োজন বা যে ধরনের সার্ভিস লেন ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা প্রয়োজন, সেগুলো এ স্টাডির মাধ্যমে নিরূপণ করা হবে। এ জন্য পরামর্শক নিয়োগের কাজ চলমান আছে। পরামর্শকরা প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও নকশা করে দেবেন। এডিবির (এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক) ঋণসহায়তায় কাজটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।’
সমীক্ষা ও নকশার কাজ শেষ করা এবং বৈদেশিক ঋণ সংগ্রহ করে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কটি সম্প্রসারণ ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে সক্ষমতা বৃদ্ধির কাজটি সম্পন্ন করতে কয়েক বছর লেগে যাবে। যদিও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০০৬-২০১৭ মেয়াদে চার লেনে উন্নীত করার সময়ই মহাসড়কটি যুগোপযোগী করে নির্মাণ করা সম্ভব ছিল। কিন্তু পরিকল্পনা পর্যায়ে এবং সওজ প্রকৌশলীদের অদূরদর্শিতার কারণে এ দুর্দশা তৈরি হয়েছে।
এ সম্পর্কে পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. সামছুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সড়ক নির্মাণের প্রথম ধাপ হলো পরিকল্পনা। সাধারণত একটি সড়ক ২০ বছরের পরিকল্পনা করে নির্মাণ করা হয়। চালুর পর থেকে ২০ বছর পর্যন্ত কী পরিমাণ যানবাহন চলবে, এ হিসাব আগেই করে সে অনুযায়ী নকশা করতে হয়। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কটি শুরুতেই এক্সপ্রেসওয়ে মানে নির্মাণের সুযোগ ছিল। এজন্য দুই পাশে সার্ভিস লেন ও যানজটপ্রবণ মোড় বা হাটবাজার এলাকাগুলোয় ফ্লাইওভার, ইন্টারচেঞ্জের মতো অবকাঠামো তৈরি করলেই হতো। খরচও খুব বেশি হতো না। কিন্তু অদূরদর্শী পরিকল্পনার কারণে সেটা আমরা করতে পারিনি।’
বর্তমান পরিস্থিতিতে মহাসড়কটি সম্প্রসারণের সুযোগ কমে এসেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘চার লেন হয়ে যাওয়ার পর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দুই পাশে অনেক অবকাঠামো নির্মিত হয়েছে। এসব অবকাঠামো উচ্ছেদ করা এখন অনেক কঠিন ও ব্যয়বহুল হবে।’










