চট্টগ্রামের
জলাবদ্ধতা নিরসনে সাড়ে ৫ হাজার কোটি
টাকার বেশি ব্যয়ে একটি প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হয় ২০১৭ সালে।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) এর বাস্তবায়নকারী সংস্থা
হলেও নির্মাণকাজ করছে সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন
ব্রিগেড। তবে এর মধ্যে জটিলতা
দেখা দেয় ভূমি অধিগ্রহণ নিয়ে। সমস্যার সমাধান না হওয়ায় দুই
দফা সময় বাড়িয়েও শেষ করা যায়নি প্রকল্পকাজ। তাই নতুন করে আবারো সময় বাড়ানো হয়েছে। প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা যদিও বলছেন, প্রায় ২০ একর জমি
অধিগ্রহণ নিয়ে সময়ক্ষেপণের কারণে বর্ধিত সময়সীমার মধ্যেও কাজটি শেষ করা প্রায় অসম্ভব।
নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার চারটি প্রকল্পের কাজ চলছে। বেশির ভাগ কাজ শেষের দিকে বলা হলেও এর কোনো সুফল দৃশ্যমান হয়নি। আদৌ জলাবদ্ধতামুক্ত চট্টগ্রাম নগরী দেখা যাবে কিনা সেটা নিয়ে সংশয় রয়েছে। উল্টো দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্পের কাজ চলমান থাকায় জলাবদ্ধতা বাড়ছে। গত কয়েকদিনের বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম নগরীর ২ নম্বর গেট, বহদ্দারহাট, আগ্রাবাদ, মুরাদপুর, ওয়াসা কিংবা হালিশহর ছাড়াও বেশকিছু জায়গায় হাঁটুসমান পানিতে ডুবে যেতে দেখা গেছে। অতিরিক্ত পানির কারণে বিকল্প সড়কে যানবাহন চলাচল করতে গিয়ে নগরীর ফ্লাইওভারগুলোয় সৃষ্টি হয় তীব্র যানজট।
প্রকল্প পরিচালক সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. শাহ আলী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘৫ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পটির মেয়াদ এক বছর বাড়ানো হয়েছে। বছরের মাত্র পাঁচ-ছয় মাস কাজ করা যায়। বর্ষা মৌসুমে কাজ বন্ধ থাকে। তাছাড়া প্রকল্পটির রিভাইস ডিপিপি (ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল) এখনো অনুমোদন হয়নি। এখন যদি ভূমি অধিগ্রহণ করা না হয় তাহলে এ সময়সীমার মধ্যে কাজ শেষ না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। এ নিয়ে অবশ্য জেলা প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করছে সিডিএ। যত দ্রুত ভূমি অধিগ্রহণ হবে সেখানে আমাদের কাজ শুরু হয়ে যাবে।’
প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন প্রকল্পের প্রথম মেয়াদ ধরা হয় ২০১৭ সালের জুন থেকে ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত। ব্যয় ধরা হয় ৫ হাজার ৬১৬ কোটি ৪৮ লাখ ৯০ হাজার টাকা। তবে এ মেয়াদে কাজ শেষ না হওয়ায় ব্যয় না বাড়িয়ে তিন বছর সময় বাড়িয়ে ২০২৩ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটি শেষ করার নির্দেশ দেয়া হয়। চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত যদিও মোট ভৌতকাজের ৭৭ শতাংশ শেষ হয়। বাকি দুই মাসের মধ্যে শতভাগ কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব নয় বলে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পটির মেয়াদ বাড়ানো হয়। প্রকল্পটির কাজ শেষ না হওয়ার কারণেই এবারের বর্ষায়ও জলাবদ্ধতার কারণে নগরবাসীকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, চট্টগ্রাম ওয়াসার ২০১৬ সালের মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী ৫৭টি খালের অস্তিত্ব থাকার কথা। যার মধ্যে ৩৬টি খাল নিয়ে জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পটির কাজ চলছে। বৃষ্টি ও জোয়ারের পানির প্রবাহ ঠিক রাখতে ৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে খালগুলোকে পুনঃখনন, সম্প্রসারণ ও সংস্কার করা হচ্ছে। এর মধ্যে ১৬টি খাল হস্তান্তর প্রক্রিয়ায় আছে। নয়টি খালের কাজ শেষ পর্যায়ে। বাকি নয়টি খালের কাজ কিছুদিনের মধ্যে শেষ হবে। প্রকল্পকাজের অগ্রগতির কারণে আগের মতো জলাবদ্ধতা সমস্যা এখন নেই। বৃষ্টির পানি দীর্ঘসময় আটকে থাকে না। প্রকল্পকাজ পুরোপুরি শেষ হলে জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পাবেন নগরবাসী। তবে জমি অধিগ্রহণ না হওয়ায় এ প্রকল্পের কাজে বেশ ধীরগতি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এর মধ্যে সাতটি খালের অধিগ্রহণ প্রস্তাব চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো হয়েছে। সাতটি এলএ (ভূমি অধিগ্রহণ) মামলা করার প্রস্তাবও দেয়া হয়েছে।
ভূমি অধিগ্রহণসংক্রান্ত এসব প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, হিজরা খালের অংশে ৩ দশমিক ৪০ একর জমি নিয়ে ২০২২ সালের ১৬ মে সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়। তবে কিছু সমস্যার কারণে ভূমি বরাদ্দের ফাইল এখনো দেয়া সম্ভব হয়নি। দ্বিতীয় প্রস্তাবে কলাবাগিচা ও মরিয়মবিবি খালের দশমিক ৫৮৯৭৬ একর জমির জন্য ভূমি বরাদ্দ কমিটি অনুমোদন দিলেও এখনো তা বুঝিয়ে দেয়া হয়নি। তৃতীয় প্রস্তাবে শীতলঝরণা ও ত্রিপুরাখালে প্রায় একর জমি অনুমোদন হলেও বুঝে পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়। রামপুর, রাজাখালীসহ মোট ছয়টি খালের প্রায় ৪ একর জমি অধিগ্রহণে প্রস্তাবনা জমা দেয়া আছে বলে চতুর্থ প্রস্তাবে বলা হয়েছে। পঞ্চম প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়, চাক্তাই খালের প্রায় সাড়ে ৩ একরের বেশি ভূমি অধিগ্রহণে প্রস্তাবনা দেয়া হলেও সংশোধিত প্রস্তাব পাওয়া যায়নি। এছাড়া ষষ্ঠ প্রস্তাবে বাকলিয়া বা গয়নাছড়া খালের ৩ দশমিক ২৯ একর এবং সপ্তম প্রস্তাবে মহেশখালীসহ চারটি খালের ৩ দশমিক ৭৯ একর জমির প্রস্তাবনা দেয়া হলেও সংশোধিত প্রস্তাব আজও পাননি প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা। সব মিলিয়ে সাত প্রস্তাবে ১৭টি খালের ১৯ দশমিক ৪৮ একর ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতায় প্রকল্পকাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয়। প্রকল্পের বাইরের খাল ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা সংস্কার করা না হলে এ প্রকল্পের সুবিধা থেকেও নগরবাসী বঞ্চিত হবেন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
এ প্রসঙ্গে প্রকল্প পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. শাহ আলী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা সমস্যা অনেক পুরনো। এ নগরীতে ৫৭টি খালের অস্তিত্বের কথা বলা হয়েছে। আমরা এ প্রকল্পে ৩৬টি খাল নিয়ে কাজ করছি। বাকি ২১টি খাল যদি উদ্ধার কিংবা পরিষ্কার করা না হয় তাহলে জলাবদ্ধতা প্রকল্পের সঠিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে নগরবাসী। খালগুলো নিয়ে সিডিএ ও চসিককে সমন্বয় করে কাজ করতে হবে। তাছাড়া নগরীতে ১ হাজার ৬০০ কিলোমিটার ড্রেনেজ সিস্টেমের মধ্যে মাত্র ৩০০ কিলোমিটার আমাদের জলাবদ্ধতা প্রকল্পের আওতায় আছে। বাকি ১ হাজার ৩০০ কিলোমিটির ড্রেনেজ ব্যবস্থা ঠিক না হলে আমাদের প্রকল্প দৃশ্যমান হবে না। ড্রেনেজ সিস্টেম আমাদের মতো না করলে খাল দিয়ে পানি নিঃসরণ হবে না।’
জানতে চাইলে সিডিএর প্রধান প্রকৌশলী হাসান বিন সামস বলেন, ‘জলাবদ্ধতা প্রকল্পটি আমাদের কাছে অগ্রাধিকার প্রকল্প। ভূমি অধিগ্রহণসহ অর্থ ছাড়ের বিষয়ে দ্রুত সমস্যা সমাধানে কাজ চলছে।’










