এগিয়ে আসছে পদ্মা সেতু উদ্বোধনের মুহূর্ত। আটদিন পর স্থলপথে রাজধানীর সঙ্গে নিরবচ্ছিন্নভাবে যুক্ত হচ্ছে দক্ষিণাঞ্চল। বেশকিছু মানুষ পর্দার আড়ালে থেকে প্রকল্পটির সফল বাস্তবায়নে ভূমিকা রেখেছেন। তাদের নিয়ে ধারাবাহিক আয়োজনের দ্বিতীয় পর্ব পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণ প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী (সড়ক) সৈয়দ রজব আলীকে নিয়ে 

২০০১ সাল। পদ্মা সেতুর সম্ভাব্যতা সমীক্ষার কাজ চলছে। সমীক্ষার জন্য প্রকল্পের সম্ভাব্য এলাকাগুলোয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করছেন তরুণ এক প্রকৌশলী। তার বারবার মনে হচ্ছে প্রমত্তা নদীটির ওপর এ সেতু নির্মাণ করা অসম্ভব। এর ঠিক ২১ বছর পর যখন সেতুটির উদ্বোধন হচ্ছে, তখন সেই তরুণ প্রকৌশলী সৈয়দ রজব আলী সেতুটির নির্মাণ প্রকল্পে যুক্ত রয়েছেন নির্বাহী প্রকৌশলী (সড়ক) হিসেবে।

সেতু কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আছেন ২৬ বছর ধরে। এ সময় সেতু কর্তৃপক্ষের নির্মিত বড় তিন অবকাঠামো প্রকল্পের সবগুলোয়ই কাজ করেছেন তিনি। বিভাগটিতে যোগ দিয়েই সম্পৃক্ত হয়ে যান বঙ্গবন্ধু সেতুর নির্মাণকাজে। পরে কাজ করেছেন মুক্তারপুর সেতু নির্মাণ প্রকল্পেও। তবে প্রকৌশলী হিসেবে তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় সফলতা পদ্মা সেতু প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করা। সেতুটির পরিকল্পনার সময় থেকে শেষ পর্যন্ত গোটা প্রক্রিয়ার পুরোটায়ই জড়িত ব্যক্তিদের মধ্যে তিনিও অন্যতম।

কর্মজীবন শুরু প্রকৌশলী হিসেবে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে (এলজিইডি)। পরে প্রেষণে এবং স্থায়ী কর্মকর্তা হিসেবে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষে যোগ দেন। সৈয়দ রজব আলীর বঙ্গবন্ধু ও মুক্তারপুর সেতু নির্মাণ প্রকল্পের অভিজ্ঞতা পূর্ণতা পেয়েছে পদ্মায় এসে। পদ্মা সেতুর সম্ভাব্যতা সমীক্ষার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি। তবে প্রকল্পটিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হয়েছেন ২০০৭ সালে। ২০১৩ সালে তিনি প্রকল্পটির নির্বাহী প্রকৌশলীর দায়িত্ব পান।

পদ্মা সেতুর মূল কাজগুলো করা হয়েছে আটটি অঙ্গে ভাগ করে। এর মধ্যে সেতুর দুই পাড়ের সংযোগ সড়ক ও সার্ভিস এরিয়ার বাস্তবায়ন কাজ করা হয়েছে সৈয়দ রজব আলীর তত্ত্বাবধানে। তিনি এ অঙ্গের নির্বাহী প্রকৌশলী। পাশাপাশি অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে সেতু এলাকায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন ও পরিবেশ উন্নয়ন এবং নদীশাসন কাজে দায়িত্ব পালন করছেন।

পদ্মা সেতুর সংযোগের জন্য মাওয়া প্রান্তে ১ দশমিক ৬২ কিলোমিটার ও জাজিরা প্রান্তে ১০ দশমিক ৫ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে জাজিরা প্রান্তের সংযোগ সড়কটির জন্য পাঁচটি সেতু, ২০টি বক্স কালভার্ট, আটটি আন্ডারপাসসহ বিভিন্ন ধরনের অবকাঠামো তৈরি হয়েছে।

পদ্মা অববাহিকায় এসব অবকাঠামো তৈরি ভীষণ চ্যালেঞ্জিং ছিল উল্লেখ করে সৈয়দ রজব আলী বণিক বার্তাকে বলেন, সংযোগ সড়ক তৈরির কাজে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে ছিল মাটির গুণগত মান। সব জায়গায় সড়কের ভার বহন করার মতো মাটির সক্ষমতা ছিল না। এ কারণে ‘স্যান্ড কম্পেকশন পাইল/প্রি লোড’ দিয়ে বাড়ানো হয় মাটির ভার বহন ক্ষমতা। এরপর তৈরি করা হয় সড়ক অবকাঠামো।

২৫ জুন পদ্মা সেতু উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী। তবে পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পের সুফল ২০১৭ সাল থেকেই দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ পেতে শুরু করেছেন বলে উল্লেখ করেন এ প্রকৌশলী। তিনি বলেন, ২০১৭ সালের ৮ জানুয়ারি পদ্মা সেতুর জাজিরা প্রান্তের সংযোগ সড়ক চালু করা হয় ফেরি স্থানান্তরের কারণে। ফলে কাওড়াকান্দি ফেরিঘাটটি কাঁঠালবাড়ীতে নেয়া হয়। এতে মাওয়া-জাজিরা নৌপথের দূরত্ব কমে যায় প্রায় পাঁচ কিলোমিটার। পদ্মা পারাপারের ক্ষেত্রে সাশ্রয় হয় যানবাহনের জ্বালানি। সময় সাশ্রয় হয় কম-বেশি ১ ঘণ্টা। আগে যেখানে পদ্মা পাড়ি দেয়ার জন্য যানবাহনগুলোকে ফেরির জন্য অপেক্ষা করতে হতো, ঘাটটি কাঁঠালবাড়ীতে স্থানান্তরের পর ক্ষেত্রবিশেষে অনেক ফেরিকেই যানবাহনের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে। পদ্মা সেতুর সংযোগ সড়ক ছাড়া এটি সম্ভব হতো না।

সৈয়দ রজব আলীর জন্ম ঢাকায়। ১৯৭২ সালের ২৫ নভেম্বর। ১৯৮৭ সালে মতিঝিল আইডিয়াল হাইস্কুল থেকে এসএসসি ও ১৯৮৯ সালে নটর ডেম কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করার পর ভর্তি হন খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৯৪ সালে পুরকৌশলে বিএসসি সম্পন্ন করে মাস্টার্স করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। বিষয় ছিল জিওটেকনিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং।

সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষে যোগ দেন সৈয়দ রজব আলী। প্রথম পদায়ন হয় বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মাণ প্রকল্পে। প্রকল্পের পরিবেশ, নদীশাসন এবং সেতুর কাজ দেখভালের দায়িত্ব পড়ে তার ওপর। ১৯৯৮ সালে বঙ্গবন্ধু সেতু চালু হয়ে যায়। এরপর তার পদায়ন হয় ঢাকায় সেতু কর্তৃপক্ষের প্রধান কার্যালয়ে। ২০০৫ সালে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে পদায়ন হয় মুক্তারপুর সেতু নির্মাণ প্রকল্পে। আর পদ্মা সেতু প্রকল্পে নির্বাহী প্রকৌশলী (সড়ক) হিসেবে দায়িত্ব পান ২০১৩ সালে।

আনুষ্ঠানিকভাবে পদ্মা সেতু প্রকল্পে প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনের আগে থেকেই এ প্রকল্পের বিভিন্ন কাজে সম্পৃক্ত ছিলেন তিনি। ২০০১ সালের দিকে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) পদ্মা সেতু তৈরির জন্য সম্ভাব্যতা সমীক্ষার কাজ করে। এ কাজে সেতু কর্তৃপক্ষের হয়ে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহে সহযোগিতা করেন। ২০০১ সালের ৪ জুলাই তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাওয়া প্রান্তে পদ্মা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এ অনুষ্ঠানেও উপস্থিত ছিলেন সৈয়দ রজব আলী। তিনি বলেন, তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের জন্য আমি যখন প্রথম পদ্মা সেতুর সম্ভাব্য প্রকল্প এলাকায় যাওয়া শুরু করি, সত্যি কথা বলতে আমার কাছে এ নদীতে সেতু নির্মাণ করা কিছুটা অসম্ভবই মনে হয়েছিল। শুধু আমি নিজে নই, একই ধরনের শঙ্কা ছিল বিদেশী পরামর্শক-প্রকৌশলীদেরও। স্বপ্নের সেই সেতু আজ বাস্তব।

সেতুর একেবারে পরিকল্পনা পর্যায় থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত নির্মাণকাজ বাস্তবায়নকারী দলে থাকতে পেরে নিজের গর্বের কথাও জানান তিনি। পদ্মা সেতু বাস্তবায়নে অনেক প্রতিকূলতা, অনেক জটিলতা ছিল উল্লেখ করে এ প্রকৌশলী বলেন, আমরা সবাই ‘টিম’ হিসেবে কাজ করেছি। প্রয়াত অধ্যাপক ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী স্যারের মতো মানুষের কাছ থেকে আমাদের টিমের সদস্যরা অনেক খুঁটিনাটি বিষয় শেখার সুযোগ পেয়েছি। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলামসহ প্রকল্পের প্যানেল অব এক্সপার্ট টিম, দেশী-বিদেশী প্রকৌশলী পরামর্শকদের কাছ থেকে প্রতিনিয়ত হাতেকলমে কাজ শেখার সুযোগ আমরা পেয়েছি। এ সেতু নির্মাণের অভিজ্ঞতা প্রকৌশলী হিসেবে আমাদের পরিপূর্ণ করে তুলেছে।

নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশে সফলভাবে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে দুটি পরামর্শ দিয়েছেন সৈয়দ রজব আলী। প্রথমটি হলো বাস্তবায়নকারী প্রকৌশলী কর্মকর্তাদের সততা ও কর্মনিষ্ঠা। দ্বিতীয়টি হলো প্রকল্প পরিচালক হিসেবে একজন প্রকৌশলী বা কর্মকর্তাকেই বহাল রাখা। তিনি বলেন, বারবার পরিচালক বদল হলে প্রকল্পের স্বাভাবিক গতি বিনষ্ট হয়। একজন প্রকল্প পরিচালক দিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পদ্মা সেতুর উদাহরণ উল্লেখ করেন তিনি। পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তি সম্পর্কে সম্যক ধারণা এবং সবসময় নতুন নতুন জ্ঞান অর্জনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।