চলতি বছরই দেশের সবচেয়ে বড় শ্রমঘন শিল্প পোশাক খাতের রফতানি ৫০ বিলিয়ন ডলার ছাড়াবে বলে প্রক্ষেপণ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রতিযোগী দেশের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে শিল্পের ভবিষ্যেক আরো সুসংহত ও টেকসই করতে সার্বিক দক্ষতা উন্নয়ন প্রয়োজনও মনে করছেন তারা। এ পর্যায়ে পোশাক শিল্পের অপচয়, পুনর্ব্যবহারযোগ্য শিল্প উন্নয়ন ও জ্বালানি দক্ষতা নিয়ে বণিক বার্তার ধারাবাহিক প্রতিবেদন পর্ব ২  

তৈরি পোশাক ও বস্ত্র শিল্প খাতের পণ্য উৎপাদন প্রক্রিয়ায় স্বাভাবিকভাবেই কিছু বর্জ্য তৈরি হয়। একটি পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশের এ খাত থেকে উৎপাদিত বর্জ্যের পরিমাণ বছরে সাড়ে পাঁচ লাখ টনের বেশি, যার অর্ধেকই কটন ওয়েস্ট বা তুলা ও তুলাজাত পণ্যের বর্জ্য। বিশ্বের অনেক দেশই এ বর্জ্য রিসাইক্লিং বা পুনর্ব্যবহার করে। তবে এক্ষেত্রে এখনো অনেক পিছিয়ে বাংলাদেশ। অথচ এ বর্জ্যের পুনর্ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের তুলা আমদানি অন্তত ১৫ শতাংশ কমানো সম্ভব হবে, যার মাধ্যমে সাশ্রয় হতে পারে ৫০ কোটি ডলারের বিদেশী মুদ্রা।

তবে কেবল বিদেশী মুদ্রা সাশ্রয়ের জন্য নয়, তৈরি পোশাক ও বস্ত্র শিল্প-সৃষ্ট বর্জ্যের পুনর্ব্যবহার নিশ্চিত করার প্রয়াস বাস্তবায়নের মাধ্যমেও গড়ে উঠতে পারত পুনর্ব্যবহারযোগ্য শিল্প। যেখানে বিপুল পরিমাণ মানুষের কর্মসংস্থানও সম্ভব হতো। তিন দশকের বেশি সময় ধরে গড়ে ওঠা পোশাক খাতে সক্রিয় কারখানা সাড়ে তিন হাজার। এ খাতের কাঁচামাল সরবরাহকারী সুতা-কাপড়ের কারখানা আছে ১ হাজার ২০০-এরও বেশি। কিন্তু এসব কারখানা ঘিরে পুনর্ব্যবহারযোগ্য বা রিসাইক্লিং শিল্প ইউনিটের সংখ্যা মাত্র গোটা পঞ্চাশেক।

নিজস্ব কারখানার বর্জ্য পুনর্ব্যবহার করছে, দেশের পোশাক শিল্পের এমন একটি বৃহৎ গ্রুপ মাইক্রো ফাইবার। এ প্রতিষ্ঠানের পরিচালক (অর্থ) ড. কামরুজ্জামান কায়সার বণিক বার্তাকে বলেন, আমাদের সরকারি সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে রিসাইক্লিং শিল্প গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অনেক ধরনের বাধ্যবাধকতা আছে। সম্প্রতি এমন ঘটনাও ঘটেছে, যেখানে রিসাইক্লিং শিল্প গড়ে তুলতে গিয়ে পরিবেশগত চাপে পিছিয়ে আসতে হয়েছে এক উদ্যোক্তাকে। কারণ রিসাইক্লিং শিল্পগুলোর কার্বন নিঃসরণের হার বেশি। কিন্তু পরিবেশগত ঝুঁকি কমিয়েও রিসাইক্লিং শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব। তবে সেক্ষেত্রে ব্যয়ও বেশি। আবার সামাজিক, রাজনৈতিক থেকে শুরু করে পারিপার্শ্বিক নানা চাপ মোকাবেলা করতে হয়। ফলে রিসাইক্লিং শিল্প গড়তে আগ্রহী উদ্যোক্তারা নিরুৎসাহিত হন।

এখন বড় কম্পোজিট শিল্পগুলোর বেশির ভাগই রিসাইক্লিংয়ের দিকে মনোযোগী হচ্ছে বলে জানান ড. কামরুজ্জামান কায়সার। তিনি বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সব উদ্যোক্তাকেই এ বিষয়ে মনোযোগী হতে হবে। কারণ ভবিষ্যতে শুধু সেলাই করা পোশাক রফতানি করে টিকে থাকা মুশকিল হবে। রিসাইক্লিংয়ের বিষয়টি এখন প্রতিষ্ঠানের সঞ্চয়ের বড় ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এতদিন হয়নি, কারণ বর্জ্য পুনর্ব্যবহারের বিষয়গুলো আমলেই নেয়া হয়নি। বর্জ্য বিক্রি করে নগদ অর্থেই খুশি ছিলেন উদ্যোক্তারা। অন্যদিকে বর্জ্য পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে যে প্রাপ্তি সেটিতে নগদ সুবিধা নেই, কিন্তু যে সুবিধাগুলো আছে তা খালি চোখে দেখা যায় না। শুরুর দিকে উদ্যোক্তারা নগদ প্রাপ্তিতেই আগ্রহী ছিলেন বেশি। তবে এখন এ দৃশ্যপট বদলাচ্ছে। পরিমাণে কম হলেও রিসাইক্লিং ইউনিট গড়ে উঠছে।

দেশের পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিরা বলছেন, রফতানিমুখী বস্ত্র ও পোশাক শিল্প মূলত ক্রেতার চাহিদানির্ভর। সেই চাহিদা মেটাতেই শিল্পোদ্যোক্তারা মনোযোগী ছিলেন বেশি। ক্রেতার পক্ষ থেকে বর্জ্য পুনর্ব্যবহার নিশ্চিতের তাগিদও সেভাবে ছিল না। ফলে রিসাইক্লিং শিল্প গড়ে তুলতে আগ্রহীও হননি কারখানা মালিকরা। তবে এখন পরিবেশগত বিষয়গুলোয় ভোক্তাসচেতনতা বাড়ায় বৈশ্বিকভাবেই বর্জ্য পুনর্ব্যবহারের তত্পরতা শুরু রয়েছে। ফলে ক্রেতার পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে চাহিদা আসছে, যার কারণে গড়ে উঠতে শুরু করেছে বর্জ্য পুনর্ব্যবহারযোগ্য শিল্প।

নিট পণ্য প্রস্তুত ও রফতানিকারক মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বণিক বার্তাকে বলেন, বস্ত্র ও পোশাক খাতকেন্দ্রিক রিসাইক্লিং শিল্প গড়ে না ওঠার প্রথম কারণ হলো ক্রেতাদের পক্ষ থেকে বর্জ্য পুনর্ব্যবহারের চাহিদা না থাকা। এখন ক্রেতারা চাইছেন বলে শিল্প মালিকরা রিসাইক্লিংয়ে নজর দিচ্ছেন। তাই পরিমাণে কম হলেও ধীরে ধীরে শিল্পটি গড়ে উঠছে।

তিনি জানান, তার নিজের কারখানায়ই এখন বর্জ্য পুনর্ব্যবহার করে উৎপাদিত পলি-কটন সুতা দিয়ে পোশাক তৈরি হচ্ছে উল্লেখ করে মোহাম্মদ হাতেম বলেন, এ সুতা স্থানীয় একটি কারখানা থেকেই কেনা হয়েছে। অর্থাৎ, চাহিদা যখন এসেছে তখন স্থানীয় শিল্পে উৎপাদনও শুরু হয়েছে। শিল্পপণ্যের বাজার যদি না থাকে, ক্রেতা যদি না থাকে তাহলে পণ্য উৎপাদন হয় না। এখন যেহেতু ক্রেতারা চাচ্ছেন, দামও বেশি দিচ্ছেন; ফলে শিল্প গড়ে উঠছে। তিন বছর আগেও দৃশপট এমন ছিল না।

পোশাকের কাঁচামাল সুতা-কাপড় উৎপাদনকারী বস্ত্র শিল্প মালিক প্রতিনিধিরা বলছেন, বস্ত্র শিল্পকে ঘিরে পুনর্ব্যবহারযোগ্য শিল্প গড়ে না ওঠার মূল কারণ শুল্ক জটিলতা ও বর্জ্য রফতানি অনুমোদন সুবিধা। যেহেতু আমাদের দেশে পোশাক শিল্পের বর্জ্য রফতানির সুযোগ রয়েছে, তাই এটি পুনর্ব্যবহারের বদলে বেশির ভাগই রফতানি করতে আগ্রহী। আবার যদি পুরনো কাপড় কিনে এনে তা থেকে সুতা উৎপাদনের কথা ভাবা হয়, তাহলে সেই আমদানির ওপরও বড় অংকের শুল্ক দিতে হয়, যা উদ্যোক্তার জন্য লাভজনক হয় না। এ বিষয়গুলো সমাধান না করলে এ খাতে শতভাগ সাফল্য পাওয়া সম্ভব নয়।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সহসভাপতি ফজলুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, এতদিন বর্জ্য পুনর্ব্যবহারের প্রয়োজনয়ীতা ক্রেতা ও বিক্রেতা কেউই অনুভব করেননি। এখন বৈশ্বিকভাবেই পরিবেশসচেতনতার কারণে বিষয়টি আলোচনায় এসেছে, যার ধারাবাহিকতায় রফতানি করা পোশাকও বর্জ্যে পরিণত হয়ে সুতা উৎপাদন হবে। বাংলাদেশও নিশ্চয়ই একদিন এ চর্চার অংশ হবে। এখন ক্রেতারা রিসাইকেল পণ্যের ক্রয়াদেশও বাড়াচ্ছে, যার প্রতিফলন হিসেবে বস্ত্র ও পোশাক শিল্পকে ঘিরে এখন ৫০টির কিছু বেশি রিসাইক্লিং প্লান্ট গড়ে উঠেছে।

খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পোশাক শিল্পের শুরুতে উদ্যোক্তারা মূলত মনোযোগী ছিলেন সস্তা শ্রম ব্যবহার করে কম খরচে পণ্য সরবরাহের বিষয়ে। এরপর একটা পর্যায়ে সামাজিক সচেতনতার অংশ হিসেবে শিশুশ্রম ব্যবহার থেকে সরে আসতে হয়। এরপর বাংলাদেশের জন্য আসে নিরাপদ কর্মস্থল গড়ে তোলার বিষয়টি। বর্তমানে বৈশ্বিকভাবে পরিবেশগত বিষয়ে সচেতন হওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। এভাবে ধাপে ধাপে এগিয়ে বর্জ্য পুনর্ব্যবহারযোগ্য শিল্পটি গড়ে উঠতে শুরু করেছে। তবে সবকিছু ছাপিয়ে বর্জ্য পুনর্ব্যবহারযোগ্য শিল্প গড়ে না ওঠার পেছনে শিল্পোদ্যোক্তাদের দূরদর্শিতার ঘাটতিকেও অন্যতম কারণ হিসেবে মনে করা হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক ব্যবসায় বিভাগের চেয়ারম্যান ও টেকসই সাপ্লাই চেইন বিশেষজ্ঞ ড. সুবোধ দেবনাথ বণিক বার্তাকে বলেন, বর্জ্যও যে সম্পদ হতে পারে, সেটা আগে মালিকরা ভাবতেই পারেননি। অর্থাৎ, এক্ষেত্রে তাদের দূরদর্শিতার ঘাটতি ছিল। আবার এটাও ঠিক যে সব বর্জ্য যে পুনর্ব্যবহারযোগ্য তা নয়, এর পরিবেশগত নেতিবাচক প্রভাবও রয়েছে। বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের রূপান্তর ঘটছে ধাপে ধাপে। শুরুতে নজর ছিল অদক্ষ শ্রমিক দিয়ে সঠিক পণ্যটি কম খরচে সরবরাহের দিকে। এখন সেক্ষেত্রে দারুণ উন্নতি হয়েছে। বর্তমান বৈশ্বিক সচেতনতার প্রেক্ষাপটে বর্জ্য পুনর্ব্যবহারের বিষয়টি প্রাধান্য পেতে শুরু করেছে। এর ব্যাপ্তি ক্রমেই আরো বাড়বে। তখন সুবিধা-অসুবিধা বিবেচনা করে খাতটিকে আরো এগিয়ে নেয়া যাবে, খাতটি আরো সুসংহত হবে।