রংপুর বিভাগের অন্যতম চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতাল। দুই কোটি মানুষের এ ভরসাস্থল যেন নিজেই আজ ‘গুরুতর অসুস্থ’। হাসপাতালটির শিশু বিভাগে থাকা যৎসামান্য জনবল দিয়ে বৃহৎ এ অঞ্চলের চাহিদামতো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। তাই দীর্ঘদিন থেকে পূর্ণাঙ্গ শিশু হাসপাতাল গড়ার দাবি জানিয়ে আসছিলেন বিশিষ্টজনেরা, যেন শিশুদের জটিল সার্জারিসহ সাধারণ সব রোগের চিকিৎসা স্বল্পমূল্যেই দেয়া সম্ভব হয় এবং ভোগান্তি কমে আসে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বিভাগীয় এ নগরীর সাবেক সদর হাসপাতালের জমিতে নির্মাণ করা হয় ১০০ শয্যাবিশিষ্ট শিশু হাসপাতাল ভবন। তবে হস্তান্তরের আড়াই বছরেও কার্যক্রম শুরু করা তো দূরের কথা, লোকবলই নিয়োগ দেয়া সম্ভব হয়নি।
রংপুরের স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, নগরীর সাবেক সদর হাসপাতালের ১ দশমিক ৭৮ একর জমির মধ্যে শিশু হাসপাতাল নির্মাণের কার্যাদেশ দেয়া হয় ২০১৭ সালের ২১ নভেম্বর। ৩১ কোটি ৪৮ লাখ ৯২ হাজার ৮০৯ টাকা মূল্যের সেই কাজ পায় ঢাকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স মল্লিক এন্টারপ্রাইজ ও মেসার্স অণিক ট্রেডিং করপোরেশন। ৩১ কোটি ৪৮ লাখ ৯২ হাজার ৮০৯ টাকা ব্যয়ে তারা দুই বছরেই অর্থাৎ ২০১৯ সালের ১৯ নভেম্বর কাজ শেষ করে।
তিনতলা মূল হাসপাতাল ভবনের প্রতি তলার আয়তন ২০ হাজার ৮৮২ দশমিক ৯৭ বর্গফুট। এছাড়া নির্মাণ করা হয়েছে চারতলা ভিত্তির তিনতলা সুপারিনটেনডেন্ট কোয়ার্টার। সিঁড়ি বাদে প্রতি তলার আয়তন দেড় হাজার বর্গফুট। ছয়তলা ডক্টরস কোয়ার্টারের নিচতলায় গাড়ি পার্কিং, দ্বিতীয় তলা থেকে ডাবল ইউনিট। আছে ছয়তলাবিশিষ্ট স্টাফ অ্যান্ড নার্স কোয়ার্টার। দুইতলাবিশিষ্ট গ্যারেজ কাম ড্রাইভার কোয়ার্টার। নিচে দুটি গাড়ি রাখার ব্যবস্থা রয়েছে সেখানে। বিদ্যুৎ সাবস্টেশন স্থাপনের জন্যও নির্মাণ করা হয়েছে একটি ভবন। সবকিছু হস্তান্তর হয়েছে ২০২০ সালের ৮ মার্চ। কিন্তু এর মধ্যেই করোনা প্রাদুর্ভাব বাড়ায় ভবনটিকে ডেডিকেটেড করোনা হাসপাতাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এখন অবশ্য সেই চাপ একদমই নেই। তাই শিশু হাসপাতালের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরুর দাবি জানিয়েছে রংপুরবাসী।
সমাজ পরিবর্তন ও উন্নয়ন ফোরাম রংপুরের সাধারণ সম্পাদক মো. সহিদুল ইসলাম বাবলু বণিক বার্তাকে বলেন, বর্তমানে করোনা আক্রান্তের হার অনেক কমে গিয়েছে। তাছাড়া এখন অনেক হাসপাতালেই এর চিকিৎসা হয়। কয়েকজন রোগীর জন্য পুরো শিশু হাসপাতালটি এভাবে ফেলে রাখলে তা পরিত্যক্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই অবিলম্বে লোকবল নিয়োগ দিয়ে পূর্ণাঙ্গ শিশু হাসপাতালের কার্যক্রম শুরু করা অতিজরুরি হয়ে পড়েছে। কেননা এ অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি দারিদ্র্যসীমায় বসবাসকারী মানুষ। সরকারি হাসপাতালে কম খরচে সুচিকিৎসা পেলে তাদের আর্থিক সাশ্রয় হবে।
রংপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সাবেক সহকারী পরিচালক ডা. শাহ্ মো. রফিকুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, রংপুর বিভাগে পূর্ণাঙ্গ শিশু হাসপাতাল খুবই জরুরি। তবে এ কথাও সত্য যে করোনা বেড়ে যাওয়ায় শুরুতে ভবনটিকে কভিড ডেডিকেটেড হাসপাতাল হিসেবে ব্যবহার করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। এখন অবশ্য করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা কমে এসেছে। তাই শিশু হাসপাতালের লোকবল নিয়োগের জন্য কার্যক্রম শুরু করা উচিত। কারণ লোকবল নিয়োগ জটিল ও সময়সাপেক্ষ বিষয়।
শিশু হাসপাতালটির কার্যক্রম শুরু করার জন্য একটি কমিটি রয়েছে। সেটির আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করছেন রংপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের পরিচালক এবং সদস্য সচিব হচ্ছেন জেলা সিভিল সার্জন। রংপুর বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. আবু মো. জাকিরুল ইসলাম কমিটির সদস্য। ডা. জাকিরুল ইসলাম অবশ্য জানান, শিশু হাসপাতালের বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সভা ডাকতে তিনি কমিটির আহ্বায়ক ও সদস্য সচিবকে অনুরোধ করবেন।
এ বিয়য়ে রংপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের পরিচালক ডা. মো. শরীফুল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, অল্পদিন হয়েছে আমি যোগদান করেছি। তাই একটু সময় প্রয়োজন। তবে শিশু হাসপাতাল চালুর আগে দরকার লোকবল সৃজন। কতজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও কোন কোন বিষয়ে পারদর্শী চিকিৎসক এবং কতজন নার্স ও কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রয়োজন, তা নির্ণয় করা কঠিন ও সময়সাপেক্ষ। তাই তিনি কমিটির সবাইকেসহ শিশু বিশেষজ্ঞদের নিয়ে আলোচনা করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে দ্রুত লোকবল চাইবেন বলে জানান।










