বাংলাদেশে আমিষের মোট চাহিদার ৪৫ শতাংশের জোগান দিচ্ছে পোলট্রি খাত। একই সঙ্গে গ্রামীণ অর্থনীতিরও অন্যতম বড় একটি স্তম্ভ হয়ে উঠেছে খাতটি। আত্মকর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ৬০ লাখ মানুষের। শুধু এ খাতকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে দুই শতাধিক করপোরেট প্রতিষ্ঠান। পোলট্রি খাতের সংযোগ শিল্পেরও এখন সম্প্রসারণ ঘটছে।
পোলট্রি শিল্পের বিকাশে দেশের সরকারি ও ব্যক্তি উভয় খাতেরই অবদান রয়েছে। তবে অগ্রণী হিসেবে শুরুতেই নাম চলে আসে উদ্যোক্তা দম্পতি একরামুল আহসান ও তৌহিদা হোসেনের। ১৯৬৪ সালে তারা ৩০ একর জমির ওপর স্থাপন করেন ব্যক্তি খাতে দেশের প্রথম বাণিজ্যিক পোলট্রি ফার্ম এগস অ্যান্ড হেনস লিমিটেড। এ প্রতিষ্ঠানকেই বলা চলে দেশে বাণিজ্যিক খামারের অগ্রপথিক।
দুর্ঘটনায় একরামুল আহসানের মৃত্যু হলে প্রতিষ্ঠানটির হাল ধরেন তার স্ত্রী তৌহিদা হোসেন। সে হিসেবে তাকে দেশের পোলট্রি খাতের প্রথম নারী উদ্যোক্তাও বলা চলে। ১৯৭৯ সালে প্রতিষ্ঠানটি প্রথম একদিনের বাচ্চা আমদানির মাধ্যমে ব্রয়লার উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করে।
এ খাতের অগ্রণী হিসেবে নাম চলে আসে রাষ্ট্রায়ত্ত উড়োজাহাজ সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসেরও। স্বাধীনতার পর পিআইএর রেখে যাওয়া সম্পদ ও জনবল নিয়ে গঠন করা হয়েছিল সংস্থাটি। পিআইএর আমলেই যাত্রীদের খাদ্য সরবরাহের সুবিধার্থে নিজস্ব একটি খামার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। খামারে প্রধানত ব্রয়লার মুরগি উৎপাদন করা হতো। স্বাধীনতার পর বিমানও এ কার্যক্রম অব্যাহত রাখে। ওই সময় ক্রমবর্ধমান যাত্রীচাপের কারণে তাদের খাবারের জন্য মুরগির চাহিদাও বাড়তে থাকে। এর ধারাবাহিকতায় নিজস্ব খামারে মুরগির বাচ্চা উৎপাদনের মাধ্যমে এ চাহিদা পূরণের পথ বেছে নেয় বিমান। পোলট্রি উৎপাদন কার্যক্রমকে প্রাতিষ্ঠানিক ও বিশেষায়িত রূপ দেয়ার উদ্যোগ নেয় সংস্থাটি। ১৯৭৬ সালে সাভারের গণকবাড়িতে বিমানের সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে যাত্রা করে বিমান পোলট্রি কমপ্লেক্স।
বিমানের বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পোলট্রি উৎপাদন কার্যক্রমের সূত্রপাত ১৯৮০ সালের নভেম্বরে। শুরুতে প্যারেন্ট ব্রিডার হিসেবে কানাডার শেভার কোম্পানির খামার থেকে স্টার ব্রো জাতের ব্রয়লার মুরগি আমদানি করা হয়। ব্রয়লারের পাশাপাশি এক পর্যায়ে লেয়ার মুরগি (ডিমের জন্য) উৎপাদনেও ঝুঁকে পড়ে বিমান পোলট্রি কমপ্লেক্স। খামারের জন্য একদিনের বাচ্চা উৎপাদনের পাশাপাশি বর্তমানে দেশের স্থানীয় বাজারেও পোলট্রি পণ্য সরবরাহ করছে বিমান।
সে সময় দেশের মানুষের প্রাণিজ আমিষের পুষ্টি চাহিদা পূরণের বিষয়টি ছিল পুরোপুরি বিদেশনির্ভর। ডিম, মুরগি, একদিন বয়সী বাচ্চা ও ফিডের বাজার ছিল প্রায় শতভাগ আমদানিনির্ভর। বর্তমানে বাংলাদেশ মুরগির ডিম ও মাংসে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি প্রবেশ করেছে রফতানির বাজারেও।
ওই দশকেরই মাঝামাঝিতে ব্রয়লার ব্রিডিংয়ের কার্যক্রমে নাম লেখায় ইউনাইটেড পোলট্রি নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠান। এর ঠিক পর পরই ফিনিক্স ও ঊষা নামে আরো দুটি প্রতিষ্ঠান এ কার্যক্রমে যুক্ত হয়। এক পর্যায়ে বাচ্চা সহজলভ্য হয়ে এলে সারা দেশেই ছোট ছোট আকারে পোলট্রি খামার গড়ে উঠতে শুরু করে।
নব্বইয়ের দশকের শুরুতে ইসলাম গ্রুপের আফতাব বহুমুখী ফার্মস মুরগির ওপেন হাউজ ব্রিডিং শুরু করে। এরপর পোলট্রি খাতের ক্রমাগত সম্প্রসারণ দেশে মুরগির বাচ্চার চাহিদা আরো বাড়িয়ে দেয়। একই সঙ্গে বাড়ে মুরগির বাচ্চা উৎপাদনে উন্নত প্রযুক্তির চাহিদাও। এর ধারাবাহিকতায় দেশে প্রথম অটোমেশন কারখানা স্থাপন করে প্যারাগন।
মুরগির বাচ্চা উৎপাদন কার্যক্রমের আধুনিকায়নে রীতিমতো নতুন যুগের সুচনা করে কাজী ফার্মস। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি প্রথম হ্যাচিং ডিম এনে বাচ্চা উৎপাদন শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি।
দেশের পোলট্রি খাত বিকাশের স্বর্ণযুগ হিসেবে মূলত নব্বইয়ের দশকের কথাই বলেন সংশ্লিষ্টরা। সে সময় পোলট্রি খামার জনপ্রিয়করণ ও নীতিসহায়তা দেয়ার ক্ষেত্রে জাতীয় সংসদের প্রয়াত স্পিকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরিও ব্যক্তিগত অবদান রাখেন। নিজস্ব খামারের কারণে এ খাতের সমসাময়িক বিষয়গুলো তার বেশ ভালো জানা ছিল। এজন্য এ খাতের উদ্যোক্তাদের বাসায় ডেকে নীতি সুবিধা-বিষয়ক নানা পরামর্শও দিয়েছেন তিনি। বর্তমানে এ খাতের শীর্ষ উদ্যোক্তাদের পোলট্রি ব্যবসায় বিনিয়োগের পেছনে তার আগ্রহ ও উৎসাহও অনেক বড় ভূমিকা রেখেছে বলে তারা জানিয়েছেন। এছাড়া কর সুবিধাসহ আর্থিক সুবিধা দেয়ার মাধ্যমে খাতটিকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করেছেন সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানও।
এ বিষয়ে আফতাব বহুমুখী ফার্মস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু লুেফ ফজলে রহিম খান শাহরিয়ার বণিক বার্তাকে বলেন, সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর খাতটি পাঁচ দশকের মধ্যেই আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠেছে। পোলট্রি খাতে নিয়োজিত মানুষের প্রায় ৪০ শতাংশই নারী। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট মাংসের ৪৫ শতাংশই আসছে পোলট্রি থেকে। গ্রামীণ অর্থনীতির রূপান্তর, নারীর ক্ষমতায়নের পাশাপাশি গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের বিকাশেও বড় ভূমিকা রাখছে পোলট্রি খাত। সে রূপান্তরে কিছু মানুষের উদ্যোগ যেমন রয়েছে, তেমনি নীতিসহায়তা বড় ভূমিকা রেখেছে। পাশাপাশি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোরও বড় অবদান রয়েছে।
পোলট্রি খাতে এ মুহূর্তে দেশের সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান ধরা হয় কাজী ফার্মস গ্রুপকে। গ্রুপটির প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী জাহেদুল হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত খাতটি শূন্যতায় ছিল। বেসরকারিভাবে যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান নতুন চিন্তাভাবনা নিয়ে এ খাতে বিনিয়োগ করে, তার মধ্যে কাজী ফার্মস অন্যতম। আমাদের পাশাপাশি পরবর্তী সময়ে আরো বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান নতুন উদ্যোগে কার্যক্রম শুরু করে। সামগ্রিকভাবে বেসরকারি খাতের আগ্রহের মাধ্যমেই খাতটি বিকশিত হয়েছে। তবে শুরু থেকেই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ ও নতুন নতুন সুযোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের পোলট্রি খাতকে বিকশিত করতে পেরেছি জেনে এখন বেশ সন্তুষ্টি পাই।
এছাড়া পোলট্রি খাতের শিক্ষা, সম্প্রসারণ ও উদ্ভাবনেও কয়েকজন ব্যক্তির অবদান স্মরণ করেন খাতসংশ্লিষ্টরা। তাদের মধ্যে এমএম খান পোলট্রির বিভিন্ন ভ্যাকসিন ও ওষুধ আমদানি এবং গুরুত্বপূর্ণ রোগ নিরাময়ে অবদান রাখেন। প্যাথলজিস্ট হিসেবে রোগ নিয়ে গবেষণা, প্রতিকার নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. প্রিয় মোহন দাস। এছাড়া অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম, ড. আফজাল হোসেন ও এসডি চৌধুরীর অবদানকে কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করা হয়।
খাতটির বিকাশে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিএলআরআই) অবদানকেও অস্বীকারের সুযোগ নেই বলে অভিমত সংশ্লিষ্টদের। গবেষণা ও বিজ্ঞানভিত্তিক সম্প্রসারণ কার্যক্রমের মাধ্যমে পোলট্রি খাতের অগ্রযাত্রায় জ্বালানি সরবরাহ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এছাড়া মাংস ও ডিম উৎপাদনকারী মুরগির জাত নিয়েও প্রতিনিয়ত গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে সংস্থাটি।
পোলট্রি খাতে এখন পর্যন্ত গবেষণার সবচেয়ে বড় ফলাফল বলা হয় সোনালি মুরগির জাত উদ্ভাবনকে। মিসরের ফাহমির (পুরুষ জাত) সঙ্গে আমেরিকার রোড আইল্যান্ড রেড (স্ত্রী জাত) ক্রস করার মাধ্যমে জাতটি উদ্ভাবনে ভূমিকা রাখেন প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সাবেক উপপরিচালক শাহ জামান।
দেশে পোলট্রি শিল্পের বিকাশ নানা সময়ে নানাভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, মহামারী বা রোগের প্রাদুর্ভাবে একসময় প্রায় বন্ধেরও উপক্রম হয়েছিল খাতটির। এক্ষেত্রে ২০০৭-১১ সালের মধ্যে তিন দফায় এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জার আবির্ভাব খাতটিকে সবচেয়ে বেশি বিপন্ন করে তুলেছিল। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও মহামারীও অনেক ক্ষতি করেছে খাতটির। এর পরও ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের পাশাপাশি সরকারি নীতিসহায়তাকে কাজে লাগিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে পোলট্রি খাত। এ অগ্রযাত্রাকে টেকসই করতে কার্যকর নীতিমালা প্রণয়নের পাশাপাশি অবিলম্বে পোলট্রি বোর্ড গঠনের ওপর জোর দিচ্ছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিলের (বিপিআইসিসি) সভাপতি ও প্যারাগন গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মসিউর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, বর্তমান বাজারে যে পরিমাণ ডিম, মুরগি, বাচ্চা ও ফিডের প্রয়োজন তার শতভাগ এখন দেশীয়ভাবেই উৎপাদন হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে আমরা রফতানির দ্বার উন্মোচন করতে সক্ষম হয়েছি। এর পেছনে ব্যক্তি খাতের অবদান ও সরকারের নীতিসহায়তা সবচেয়ে বেশি কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। তবে সার্বিক কৃষি খাতের অংশ হিসেবে পোলট্রি খাতে যথাসময়ে স্বল্প সুদে ঋণ বিতরণ, বিপণন সুবিধা প্রদান, রোগ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সুবিধা প্রদান আরো বাড়ানো প্রয়োজন। বিরূপ পরিস্থিতিতে আমদানিকে উৎসাহ না দিয়ে বরং দেশে উৎপাদন বাড়ানোয় বেশি নজর দিতে হবে।










