সিলেটের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র ভোলাগঞ্জের সাদাপাথর লুটের ঘটনায় তদন্তে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গতকাল দুপুরে সংস্থাটির একটি দল সাদাপাথর পর্যটন কেন্দ্রটি পরিদর্শন করেছে। সিলেটের জেলা প্রশাসনও ঘটনা তদন্তে একটি কমিটি করেছে। গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে পাথর লুট চলতে থাকলেও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর তৎপরতা না থাকায় সমালোচনা করেছেন স্থানীয়রা ও পরিবেশবাদী সংগঠনের নেতারা।

দুদক কর্মকর্তারা জানান, কারা এ লুটপাটের সঙ্গে জড়িত তা অনুসন্ধান করতেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন তারা। প্রাথমিকভাবে স্থানীয় পাথর ব্যবসায়ীদের যোগসাজশে এমন লুটপাট হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসনের ব্যর্থতার কারণও তারা অনুসন্ধান করছেন।

দুদক সিলেট জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক আশরাফ উদ্দিন বলেন, ‘ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে পাথর লুটের সত্যতা পাওয়া গেছে। এ ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত, প্রশাসন কেন নীরব ছিল, প্রশাসনের যোগসাজশ আছে কিনা এবং লুট করা পাথর কোথায় নেয়া হয়েছে তা অনুসন্ধান করা হচ্ছে। পরিদর্শনকালে স্থানীয় ব্যক্তি ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। সবকিছু নিয়ে একটি তদন্ত প্রতিবেদন দেয়া হবে। যাদের বিরুদ্ধে অনিয়ম পাওয়া যাবে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

অন্যদিকে পাথর লুটের ঘটনায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। একজন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে প্রধান করে এ কমিটি গঠন করা হয়।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শের মাহবুব মুরাদ বলেন, ‘সাদাপাথরে কী হচ্ছে, কেন হচ্ছে এটি তদন্তের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে কমিটিকে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।’

পরিবেশকর্মী ও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর এক বছরে প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট পাথর লুট হয়েছে। যার মূল্য ২০০ কোটি টাকার বেশি। এ ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর কিংবা পুলিশ প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতারা কেউই দায় এড়াতে পারেন না।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘পাথর কোয়ারি থেকে পাথর উত্তোলন একটি জাতীয় ইস্যু। এক্ষেত্রে সরকারের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। পাথর লুটপাট কখনো কাম্য নয়। আবার লুটপাট হয়ে যাওয়ার পর সরকারের দপ্তরের নানা তৎপরতাও হাসির খোরাক হয়। প্রশ্ন থেকে যায় এর আগে কেন আরো কঠোর হওয়া গেল না।’

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) সিলেটের সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট শাহ সাহেদা আখতার বলেন, ‘বিগত সময়ে প্রশাসন কঠোর হওয়ার কারণে জাফলং তার হারানো সৌন্দর্য ফিরে পেতে যাচ্ছিল। গত বছরের ৫ আগস্টের পর সব বদলে গেল। মানুষ হিংস্র হয়ে উঠল। সেই থেকে পাথর লুট থেমে নেই।’

যখন থেকে পরিবহন শ্রমিকদের আন্দোলনে রাজনীতিবিদরা যুক্ত হলেন, এরপর পাথর লুটের সুযোগ সৃষ্টি হলো। আমরা মনে করি যা হয়ে গেছে এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হোক। আর যাতে পরিবেশের ওপর অত্যাচার না হয়, তার নিশ্চয়তা দেয়া হোক।’

সিলেট প্রেস ক্লাবের সভাপতি ইকরামুল কবির বলেন, ‘সাদাপাথর কিংবা জাফলং একদিনে ধ্বংস হয়নি। এর দায় আমাদের সমাজের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদেরও নিতে হবে। পরিবেশ রক্ষায় বরাবরই গণমাধ্যমগুলো সোচ্চার ছিল, এখনো আছে। লোক দেখানো নয়, সাদাপাথর ও জাফলং রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।’

কয়েকদিন ধরে ভোলাগঞ্জের সাদা পাথর অবাধে লুটপাট হয়। কয়েক হাজার কোটি টাকার পাথর লুটপাট করা হয়েছে বলে স্থানীয়রা দাবি করছেন। অনেকটা বিরাণ ভূমিতে পরিণত হয়েছে পর্যটন কেন্দ্রটি। হুমকির মধ্যে পড়েছে পরিবেশও। পর্যটন কেন্দ্রও হারিয়েছে তার আসল রূপ।

পরিবেশবাদী সংগঠন ভূমি সন্তান বাংলাদেশের সংগঠক শুয়াইবুল ইসলাম বলেন, ‘এখন যা হচ্ছে তা নিছক লোক দেখানো। শুধু সাদাপাথর নয়, ধলাই নদের ওপর নির্মিত একটি সেতু ধ্বংস করে দেয়া হচ্ছে। জেলা প্রশাসন সেতুর আশপাশের এলাকায় বালি তোলার জন্য ইজারা দিয়েছে। এই সুযোগে সেতুর নিচ থেকে বালি উত্তোলন করা হচ্ছে। যেকোনো সময় সেতুটি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।’