তিন দফা বন্যা সুনামগঞ্জের সড়ক-মহাসড়ক লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে। জেলার সবকটি সড়ক ভেঙেচুরে পুকুরের মতো গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া বিধ্বস্ত হয়েছে অসংখ্য সেতু ও কালভার্ট। জেলার গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো ভেঙে ভোগান্তির চরমে হাওরবাসী। এখনো জেলা সদরের সঙ্গে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে ছাতক, দোয়ারাবাজার উপজেলার। পানির নিচে রয়েছে অনেক সড়ক।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বন্যায় জেলার স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) এবং সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের দুই হাজার কিলোমিটার সড়কের ক্ষতি হয়েছে। বিধ্বস্ত এসব সড়ক সংস্কারে দ্রুত উদ্যোগ নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এরই মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো মেরামত শুরু করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।
জানা গেছে, গত ১৫ জুন থেকে সুনামগঞ্জে দফায় দফায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় হাওরবাসী। রাস্তাঘাট, পুকুর ও বাড়ি-ঘরসহ সবকিছু বানের জলে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। জেলায় পা ফেলার মতো এক টুকরো শুকনো জায়গা ছিল না। বন্যার পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে দৃশ্যমান হয় রাস্তাঘাট ভাঙনের ক্ষত। সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার আব্দুজ জহুর সেতুর সংযোগ সড়ক থেকে বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার চালবন্দ পয়েন্ট এলাকা পর্যন্ত স্থানে স্থানে ভেঙে গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। কার্পেটিং ভেঙে উঠে গিয়েছে। শুধু এ একটি সড়ক নয়, বন্যা সব উপজেলার প্রধান সড়কগুলোকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অসংখ্য সেতু ও কালভার্ট।
এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, তাদের অধীনে সড়ক আছে ৪ হাজার ৫৭১ কিলোমিটার। এখন পর্যন্ত জেলার ১২টি উপজেলায় প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার সড়কের ক্ষতি হয়েছে। সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১৩০টি। এ হিসাব পূর্ণাঙ্গ নয়। পানি পুরোপুরি নামার সঙ্গে সঙ্গে আরো বাড়বে ক্ষতির পরিমাণ। এদিকে সড়ক ও জনপথ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, জেলার আটটি সড়কের প্রায় ১৮৪ কিলোমিটার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া ৩০-৩৫টি সেতু ও কালভার্টের অ্যাপ্রোচ ধসে গেছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ৩০০ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। জেলার জগন্নাথপুর, তাহিরপুর, শান্তিগঞ্জ ও জামালগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন স্থানে অনেক সড়ক এখনো পানির নিচে তলিয়ে আছে।
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার বাসিন্দা দ্বীন ইসলাম বলেন, আব্দুজ জহুর সেতু থেকে চালবন পর্যন্ত যেতে যে কষ্ট হয়েছে, তা বলে শেষ করা যাবে না। সড়কজুড়ে বড় বড় গর্ত। গাড়ি নিয়ে যাওয়া যাচ্ছে না।
গৌরারংয়ের মুনসুর মিয়া বলেন, সড়কগুলো যেন পুকুরে পরিণত হয়েছে। খুব কষ্টে হচ্ছে হেঁটে যেতে। গাড়ি যাওয়া তো দূরের কথা, বন্যায় রাস্তাঘাট ভেঙে জনজীবন বিপন্ন করেছে। আমরা ভোগান্তিতে আছি। দ্রুত রাস্তাঘাট মেরামতের দাবি জানাই সরকারের কাছে।
তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান করুণা সিন্ধু চৌধুরী বাবুল বলেন, রাস্তাঘাটের বেহাল দশা। ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। অনেক জায়গায় বড় বড় গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। আমরা মানুষের ভোগান্তি দূর করতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। আশা করি, দ্রুত আমাদের দুর্ভোগ দূর হবে।
সুনামগঞ্জ এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান বলেন, বন্যায় গ্রামীণ রাস্তাঘাটের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। অনেক জায়গায় পানির স্রোতে রাস্তাঘাট, ব্রিজ ভেঙে ভেসে গিয়েছে। জেলার ১২ উপজেলায় প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার সড়কের ক্ষতি হয়েছে। এ নিয়ে মোট ১২০টি সেতু ও কালভার্ট ভেঙে গিয়েছে। সব মিলিয়ে জেলার সড়কের প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। ভোগান্তি দূর করতে আমরা রাস্তাঘাট দ্রুত মেরামত করছি।
সুনামগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আশরাফুল ইসলাম প্রমাণিক বলেন, সুনামগঞ্জের আটটি সড়কের প্রায় ১৮৪ কিলোমিটার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ৩০-৩৫টি ব্রিজ-কালভার্টের অ্যাপ্রোচ ধসে গেছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ৩০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এখনো অনেক জায়গায় পানি নামেনি। পানি নামার পরে ক্ষতির পরিমাণ আরো বাড়বে। বন্যায় ভেঙে যাওয়া রাস্তাঘাটে যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল করতে দ্রুত মেরামত করার চেষ্টা করছি। অনেক জায়গায় যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল রাখতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জিওব্যাগ ও বাঁশ দিয়ে রাস্তা মেরামত করছে।










