কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে নির্মিতব্য ‘বঙ্গবন্ধু টানেল’ প্রকল্পের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ৪০০-এর বেশি ভূমি মালিকের ভাগ্য আটকে আছে আদালতে চলমান মামলায়। মামলা নিষ্পত্তি নিয়ে স্থানীয় প্রশাসন, ভূমিমন্ত্রী কিংবা টানেল কর্তৃপক্ষ একাধিক কমিটি গঠন করলেও সমাঝোতার অভাবে এখনো ক্ষতিপূরণ বুঝে পাননি প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা। ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের অর্থ পাওয়া নিয়ে মামলা চালাতে গিয়েও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন অনেকে।

অন্যদিকে ৩১ অক্টোবরের পর নতুন করে আর কোনো ক্ষতিপূরণ-সংক্রান্ত ফাইল জমা নেয়া হবে না বলে গত আগস্টে প্রজ্ঞাপন জারি হয়। এতে নতুন করে ক্ষতিপূরণ পাওয়া নিয়ে সংশয় তৈরি হয়, যার পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের আবেদনের পর নতুন করে ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত বৈধ কাগজপত্র জমা দেয়া যাবে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।

ক্ষতিগ্রস্তদের দাবি, টানেল কর্তৃপক্ষ তাদের জমি বুঝে নিলেও মামলা থাকা জমির মালিকদের কোনো ক্ষতিপূরণ এখনো বুঝিয়ে দেয়নি। অন্যদিকে টানেল নির্মাণের কারণে একটি পক্ষ মামলার মাধ্যমে টাকা হাতিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা করেছে।

আনোয়ারা উপজেলার বৈরাগী ইউনিয়নের ইউপি সদস্য মো. মুছা তালুকদার বণিক বার্তাকে বলেন, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের এলএ শাখা এবং আদালতের মামলা নং ৩০, ৩৫ ও ১১-তে ২৮৫ কোটি টাকা এখনো পাননি ক্ষতির শিকার ভূমি মালিকরা। মূলত পারিবারিক মামলা, দখলদারত্ব, অংশীদারত্ব নিয়ে ভাগাভাগি এবং ক্ষতিপূরণ নিয়ে মামলা চলছে দীর্ঘদিন। পারিবারিক মামলাগুলোর কিছু নিষ্পত্তি হয়েছে। কিন্তু অন্যান্য মামলা নিয়ে কোনো সমাধান না হওয়ায় বিপুল পরিমাণ অর্থ এখনো বণ্টন করা যায়নি, যার কারণে জমি হারিয়ে ক্ষতিপূরণ না পেয়ে খুবই মানবেতর অবস্থায় জীবনযাপন করছেন অনেকে। অন্যদিকে মামলা টানতে গিয়েও বড় অংকের অর্থেরও লোকসান গুনছেন তারা। বিষয়টি সমাধানে ভূমিমন্ত্রী, জেলা প্রশাসন ও টানেল কর্তৃপক্ষের কাছে সহায়তা চাচ্ছি।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, বঙ্গবন্ধু টানেলের জন্য সরকারি খাস জমি বাদে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে দুই ধাপে। ২০১৫-১৬ সালে আনোয়ারায় খতিয়ান নং ৩৫ দাগে ৬২ দশমিক ২ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। ২০১৭ সালের সরকারি প্রস্তাব অনুযায়ী আনোয়ারা উপজেলায় নতুন করে খতিয়ান নং ৩০ দাগে ২০ একর জমি অধিগ্রহণ করে সরকার। মূলত প্রথম যে ভূমি অধিগ্রহণ করা হয় তার ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করা হয়। ভূমি ও পুরনো স্থাবর আইন ১৯৮২ অনুযায়ী মৌজা রেটের দেড় গুণ। ২০১৭ সালে নতুন আইন পাস হলে সে অনুযায়ী নতুন অধিগ্রহণ করা ২০ একর জমির ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করা হয় মৌজার জমির দামের তিন গুণ হিসেবে। এছাড়া পুনর্বাসন খাতে আরো টাকা বরাদ্দ করা হয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জমির ক্ষতিপূরণ না পাওয়ার বেশকিছু কারণ আছে। তবে প্রধান বাধা হলো আদালতে চলমান ৬১টি মামলা।

টানেলের ক্ষতিপূরণ নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করছেন মুক্তিযোদ্ধা লিয়াকত আলী চৌধুরী। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, পারিবারিক মামলা নিয়ে ওয়ারিশদের মধ্যে জটিলতার কারণে মামলাগুলো সমাধান হচ্ছে না। আপসে এলে মামলা দ্রুত সমাধান করা সম্ভব, কিন্তু তারা সেটা করছেন না। এর মধ্যে অনেকে আবার টাকার লোভে ভুয়া মামলা করেও হয়রানি করছেন। অন্যদিকে কাজ শেষ হলে সেতু কর্তৃপক্ষ টানেলের অফিস গুটিয়ে নেবে। তখন ক্ষতিপূরণের টাকা কীভাবে সমাধান করা হবে সে বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

বঙ্গবন্ধু টানেলের প্রকল্প পরিচালক মো. হারুনুর রশিদ বলেন, এরই মধ্যে ৯২ শতাংশের বেশি কাজ সম্পন্ন হয়েছে। প্রকল্পের কাজ নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে শেষ হবে বলে আশা করছি।  অধিগ্রহণ করা জমির অনেক মালিক ক্ষতিপূরণ পাননি। ক্ষতিপূরণের টাকা জেলা প্রশাসন এবং সেতু কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে জমা দেয়া হয়। আশা করি মামলার জটিলতা সমাধান হলে ক্ষতিপূরণ পাওয়া নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না।