বিশ্বের পুঁজিবাদী অর্থনীতির ভরকেন্দ্র বিবেচনা করা হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে। আর দেশটির নিউইয়র্ক নগরীর ওয়াল স্ট্রিট পরিচিত আর্থিক সেবা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর তীর্থ হিসেবে, যেখানে বিশ্বের ডাকসাইটে নির্বাহীরা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন। সংখ্যায় কম হলেও ওয়াল স্ট্রিটের নির্বাহীদের মধ্যে আছেন বাংলাদেশীরাও। ওয়াল স্ট্রিট কাঁপানো এমনই দুজন বাংলাদেশী নির্বাহী হলেন বাংলাদেশ রেস ম্যানেজমেন্ট প্রাইভেট কোম্পানি লিমিটেডের (পিসিএল) প্রধান নির্বাহী ড. হাসান তাহের ইমাম ও এলআর গ্লোবাল বাংলাদেশ অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির প্রধান নির্বাহী রিয়াজ ইসলাম। যোগ্যতা, দক্ষতা ও পেশাগত অভিজ্ঞতার নিরিখে তারা দেশের মিউচুয়াল ফান্ড খাতের চিত্র পাল্টে দেবেন বলে বিনিয়োগকারীদের বিপুল প্রত্যাশা ছিল। যদিও গত এক যুগে তাদের পরিচালিত ফান্ডে পুঁজি খাটিয়ে উল্টো হতাশই হতে হয়েছে বিনিয়োগকারীদের।
রেস ফাইন্যান্সিয়াল গ্রুপের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান হাসান তাহের ইমাম। গ্রুপটির সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি বাংলাদেশ রেস ম্যানেজমেন্ট পিসিএলের প্রধান নির্বাহী ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বে রয়েছেন তিনি। ফিজিকস ও ফাইন্যান্সিয়াল ইকোনমিকসে দ্বৈত স্নাতক ড. হাসান তাহের ইমাম ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ ডিগ্রি অর্জন করেছেন। ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেছেন ফিজিকসে। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের জন অলিন ফেলো তিনি। একাডেমিক অর্জনের মতোই ওয়াল স্ট্রিটেও তার পেশাগত অভিজ্ঞতা বেশ উজ্জ্বল। তিনি ক্রেডিট সুইস অ্যান্ড ডোনাল্ড লাফকিন ও জেনেরেতের মতো ওয়াল স্ট্রিটের শীর্ষস্থানীয় বিনিয়োগ ব্যাংকে ভাইস প্রেসিডেন্ট ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন। প্রযুক্তি ও বায়োমেডিকেল খাতের কোম্পানিগুলোতে অর্থায়নকারী বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান থমাস ওয়েসেল পার্টনার্সের অংশীদার ছিলেন তিনি।
এক দশকের বেশি সময় ওয়াল স্ট্রিটে কাজ করার অভিজ্ঞতা নিয়ে ২০০৮ সালে দেশের মিউচুয়াল ফান্ড খাতে যুক্ত হন ড. হাসান তাহের ইমাম। দেশের মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ড খাতে সবচেয়ে বেশি ১০টি ফান্ড ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে রেস। ফান্ডগুলোর সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্যানুসারে রেসের ব্যবস্থাপনাধীন সম্পদের পরিমাণ ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকা। মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ড খাতের ৫১ শতাংশই তাদের দখলে। তবে সম্পদের আকারে শীর্ষে থাকলেও পারফরম্যান্সের দিক দিয়ে রেসের ফান্ড পিছিয়ে রয়েছে। লভ্যাংশ বাদে নিট সম্পদমূল্যের (এনএভি) ভিত্তিতে ৫ বছরের কম্পাউন্ড অ্যানুয়াল গ্রোথ রেট (সিএজিআর) বিবেচনায় রেসের রিটার্ন ঋণাত্মক ১ দশমিক ৩ শতাংশ। এক্ষেত্রে ২ দশমিক ৩ শতাংশ রিটার্নের ভিত্তিতে শীর্ষে রয়েছে সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান এইমস বাংলাদেশ। তাছাড়া বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ না থাকায় রেসের সবক’টি ফান্ডের ইউনিট বর্তমানে ডিসকাউন্টে (ফান্ড ইউনিটের বাজারদর সেগুলোর এনএভির তুলনায় কম) লেনদেন হচ্ছে।
রেসের মিউচুয়াল ফান্ডগুলো থেকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজের পাশাপাশি অতালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজ এবং মুদ্রাবাজারে বিনিয়োগ করা হয়েছে। এর মধ্যে কিছু অতালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজে বিনিয়োগের বিপরীতে রিটার্ন না আসার কারণে এর যথার্থতা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও প্রশ্ন রয়েছে। সব মিলিয়ে তালিকাবহির্ভূত সিকিউরিটিজে ৬০০ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ রয়েছে রেসের। পুঁজিবাজার মন্দা পরিস্থিতির কারণে ২০১৯-২০ হিসাব বছরে ফান্ডের বিনিয়োগকারীদের কোনো লভ্যাংশ দেয়নি রেস। যদিও সে বছর ব্যবস্থাপনা ফি বাবদ ফান্ড থেকে প্রায় ৪০ কোটি টাকা নিয়েছে সম্পদ ব্যবস্থাপক কোম্পানিটি।
২০০৮ সালে মিউচুয়াল ফান্ড নিয়ে রেসের প্রচারণামূলক কার্যক্রম নজর কেড়েছিল পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্টদের। সে সময় অনেকেই মনে করেছিলেন মিউচুয়াল ফান্ড ইন্ডাস্ট্রির চেহারাই বদলে দেবে প্রতিষ্ঠানটি। তবে গত এক যুগেও ফান্ডগুলো থেকে প্রত্যাশিত রিটার্ন না পাওয়ায় বিনিয়োগকারীরা প্রচণ্ড হতাশার মধ্যে রয়েছেন। এ খাতের প্রতি আস্থাও চলে গেছে তাদের।
দেশের পুঁজিবাজারে প্রবীণ ব্রোকার মোস্তাক আহমেদ সাদেক। ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট প্রমোশন সার্ভিসেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তিনি। এছাড়া তিনি ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ডিবিএ) প্রেসিডেন্ট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। মিউচুয়াল ফান্ডের বিষয়ে তিনি বলেন, দুই ফান্ডের পরিচালনার সঙ্গে ওয়াল স্ট্রিট ফেরত পেশাদাররা থাকায় আমরা মনে করেছিলাম দক্ষতা ও যোগ্যতার পরিচয় দিয়ে তারা এ খাতের চেহারা বদলে দেবেন। ফান্ড চালুর আগে তারা আমাদের যেসব আশা দেখিয়েছিলেন তার কিছুই পাইনি। গত এক যুগে তাদের পারফরম্যান্সের প্রতি বিনিয়োগকারীদের হতাশা বেড়েছে। প্রত্যাশিত রিটার্ন না পেয়ে মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা উঠে গেছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে তারা তাদের দক্ষতা ও যোগ্যতার প্রতিফলন বাংলাদেশে দেখাতে পারলেন না কেন? ফান্ডের অর্থে অতালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজে বিনিয়োগের বিষয়টি যথার্থ ছিল কি না বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে সেটি নিয়ন্ত্রক সংস্থার খতিয়ে দেখা উচিত।
১৮ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সিটি গ্রুপে কাজ করেছেন এলআর গ্লোবাল বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী রিয়াজ ইসলাম। এর মধ্যে ১২ বছরই তিনি সিটি ফিক্সড ইনকাম অলটারনেটিভসের বিভাগীয় প্রধান এবং প্রধান নির্বাহীর দায়িত্বে ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকোনমিকস অ্যান্ড স্ট্যাটিসটিকস থেকে স্নাতকের পর তিনি নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টার্ন স্কুল অব বিজনেস থেকে এমবিএ করেন। ১৯৯০ সালে তিনি সিটি গ্রুপে যোগ দেন। তার নেতৃত্বে থাকা ইনভেস্টমেন্ট টিম ৪ হাজার কোটি ডলারের বেশি তহবিল ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিল। অবশ্য সিটি গ্রুপের ফান্ডে বিনিয়োগে ঝুঁকির তথ্য গোপন করার মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের কাছে সেগুলোকে আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপনের মাধ্যমে ২০০২ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ৪ হাজার সম্পদশালী গ্রাহকের কাছে বিক্রি করা হয়। পরবর্তী সময়ে ফিক্সড ইনকাম হেজ ফান্ড ফ্যালকন স্ট্র্যাটেজিসে ৭৫ শতাংশ এবং এএসটিএ/এমএটি ফান্ডের ৭৭ শতাংশ মূল্য কমে যায় এবং বিনিয়োগকারীরা ক্ষতির মুখে পড়েন। এজন্য সিটি গ্রুপ ও রিয়াজ ইসলামকে যুক্তরাষ্ট্রের সিকিউরিটিজ এক্সচেঞ্জ কমিশনের তদন্তের মুখে পড়তে হয়েছে। সিকিউরিটিজ কমিশন থেকে সিটি গ্রুপকে ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের ১৮ কোটি ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে বলা হয়েছে। এছাড়া সিটি গ্রুপ তার গ্রাহকদের এজন্য ৭২ কোটি ৬০ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণ দিয়েছে। তার ব্যবস্থাপনা থাকা ফান্ডে পুুঁজি খাটিয়ে বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এজন্য কোনো ধরনের অনুশোচনা কিংবা দায় নিতে নারাজ রিয়াজ ইসলাম। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন গণমাধ্যমে সে সময় একাধিক সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।
সিটি গ্রুপ ছেড়ে দিয়ে ২০০৮ সালে রিয়াজ ইসলাম এলআর গ্লোবালের ম্যানেজিং পার্টনার ও ইনভেস্টমেন্ট টিমের সদস্য পদে যোগ দেন। একই বছর সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানির লাইসেন্স পায় এলআর গ্লোবাল বাংলাদেশ অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড। সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্যানুসারে এলআর গ্লোবালের ব্যবস্থাপনায় ছয়টি মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ড রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনায় থাকা সম্পদের পরিমাণ ১ হাজার কোটি টাকার বেশি। মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের ১৭ শতাংশ তাদের দখলে। তালিকাবহির্ভূত সিকিউরিটিজে ফান্ডটির প্রায় শত কোটি টাকা বিনিয়োগ রয়েছে। লভ্যাংশ বাদে এনএভির ভিত্তিতে ৫ বছরের সিএজিআর বিবেচনায় এলআর গ্লোবালের রিটার্ন ১ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০১৯-২০ হিসাব বছরে এল আর গ্লোবালের ৬টি ফান্ডের মধ্যে ৫টি থেকে এর বিনিয়োগকারীদের জন্য কোনো লভ্যাংশ ঘোষণা করা হয়নি। যদিও ফান্ড ব্যবস্থাপনার জন্য ব্যবস্থাপনা ফি ঠিকই নিয়েছে সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে এ ছয়টি ফান্ডের ইউনিট ডিসকাউন্টে লেনদেন হচ্ছে।
ধনাত্মক রিটার্নে থাকলেও তালিকাবহির্ভূত সিকিউরিটিজে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বরাবরই বিতর্কিত হয়েছে এলআর গ্লোবাল ও এর প্রধান নির্বাহী রিয়াজ ইসলাম। ২০১৫ সালে তালিকাবহির্ভূত সিকিউরিটিজে আইনবহির্ভূত বিনিয়োগের কারণে এলআর গ্লোবালকে ৫০ লাখ টাকা জরিমানা করেছিল পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। সে সময় সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানটিকে অতালিকাভুক্ত কোম্পানিতে করা বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নিতে নির্দেশ দিয়েছিল কমিশন। যদিও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সে নির্দেশনা পরিপালন করেনি প্রতিষ্ঠানটি। সর্বশেষ ২০১৯ সালে একটি অনলাইন গণমাধ্যমে বিনিয়োগ করে প্রশ্নের মুখে পড়ে এলআর গ্লোবাল। অতি উচ্চমূল্যে প্রতিষ্ঠানটির শেয়ার কেনার মাধ্যমে ইউনিট হোল্ডারদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করার অভিযোগ ওঠে এলআর গ্লোবালের বিরুদ্ধে। এ বিষয়ে বিএসইসির পক্ষ থেকে সম্প্রতি বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে ফান্ডে ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তাছাড়া গত বছর করা কমিশনের এক তদন্ত প্রতিবেদনে এলআর গ্লোবালের করা বিভিন্ন অতালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজে বিনিয়োগকে আইনবহির্ভূত উল্লেখ এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা হয়েছে। তাছাড়া ফান্ডের বিনিয়োগকারীদের অর্থ প্রতিষ্ঠানটির কাছে থাকা নিরাপদ নয় উল্লেখ করে প্রতিবেদনে সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন করার সুপারিশ করা হয়েছে।
জানতে চাইলে বিএসইসির মিউচুয়াল ফান্ড ও এসপিভি বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কমিশনার অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, সার্বিকভাবে মিউচুয়াল ফান্ড খাতের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনাই আমাদের লক্ষ্য। এক্ষেত্রে সুশাসন ও স্বচ্ছতার কোনো বিকল্প নেই। যারাই আইন ও বিধিবিধান ভঙ্গ করবে তাদের বিরুদ্ধেই কমিশন ব্যবস্থা নেবে। সম্পদ ব্যবস্থাপক এলআর গ্লোবালের বিরুদ্ধে মন্দ বিনিয়োগ, সম্পদের ভ্যালুয়েশন অতিরঞ্জিত করার মতো বেশকিছু অনিয়ম আমাদের তদন্তে উদঘাটিত হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির বিদেশী শেয়ারহোল্ডাররাও তাদের বিরুদ্ধে সম্প্রতি আমাদের কাছে লভ্যাংশ পরিশোধ না করা, অবৈধ খরচ নির্বাহ করাসহ আরো বেশকিছু অভিযোগ করেছেন। এগুলো আমরা খতিয়ে দেখছি।
নয়টি সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানির অধীনে বর্তমানে দেশে ৩৭টি মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের কার্যক্রম রয়েছে। এ ফান্ডগুলোর সবক’টি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত। মেয়াদি এই মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর সম্পদ ব্যবস্থাপকদের ব্যবস্থাপনায় থাকা সম্পদের পরিমাণ ৬ হাজার ২৫০ কোটি টাকা। আর ফান্ডগুলোর বর্তমান বাজার মূলধন দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকায়। প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) পূর্ববর্তী প্রাইভেট প্লেসমেন্টের মাধ্যমে মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর ইউনিট উচ্চ প্রিমিয়ামে বিক্রি করা হয়ে থাকে বলে প্রায়ই অভিযোগ করে থাকেন বাজার-সংশ্লিষ্টরা।
কমিশনের নেয়া বেশকিছু পদক্ষেপের কারণে সামনের দিনগুলোতে দেশের মিউচুয়াল ফান্ড খাত ঘুরে দাঁড়াবে বলে প্রত্যাশা বিএসইসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামের। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, সম্পদ ব্যবস্থাপকেরা সবাই চেষ্টা করছেন। মাঝে তাদের সম্পদের মূল্য কমে গিয়েছিল। তবে আমরা তাদের সবার সঙ্গে কথা বলেছি। যারা ইউনিট হোল্ডারদের লভ্যাংশ দিতে পারেননি তারা সামনে লভ্যাংশ দেবেন বলে আমাদের জানিয়েছেন। এ বছরের দ্বিতীয়ার্ধে ফান্ডগুলোর অবস্থার উন্নতি হবে বলে আশা করছি। পাশাপাশি দেশের মিউচুয়াল ফান্ডে বিদেশী বিনিয়োগও আসবে।
বাংলাদেশ রেস ম্যানেজমেন্ট পিসিএলের প্রধান নির্বাহী ড. হাসান তাহের ইমাম অ্যাসোসিয়েশন অব অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিজ অ্যান্ড মিউচুয়াল ফান্ডসের (এএএমসিএমএফ) প্রেসিডেন্ট। তার মতামত জানতে অ্যাসোসিয়েশনের যোগাযোগ বিভাগের প্রধান ইসতিয়াক আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। প্রথমে এ বিষয়ে তিনি বক্তব্য দেবেন বলা হলেও পরে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে এলআর গ্লোবাল বাংলাদেশ অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির প্রধান নির্বাহী রিয়াজ ইসলাম এবং প্রতিষ্ঠানটির হেড অব লিগ্যাল অ্যান্ড কমপ্লায়েন্স মনোয়ার হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা সাড়া দেননি।
দেশের পুঁজিবাজারের সঙ্গে অনেক দিন ধরে সংশ্লিষ্টতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অনারারি অধ্যাপক ড. আবু আহমেদের। দেশের মিউচুয়াল ফান্ড ইন্ডাস্ট্রি বিশেষ করে মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের দুরবস্থার পেছনে নিয়ন্ত্রক সংস্থারও দায় রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, সম্পদ ব্যবস্থাপকদের দক্ষতা ও যোগ্যতার বিষয়টি তাদের ব্যবস্থানাধীন ফান্ডের পারফরম্যান্সের মাধ্যমেই প্রতিফলিত হওয়ার কথা। কিন্তু সেটি হচ্ছে না। তাহলে এক্ষেত্রে তাদের দক্ষতা ও যোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। পুনর্বিনিয়োগ বা রিইনভেস্টমেন্ট ইউনিট (আরআইইউ) দেয়ার মাধ্যমে সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানিগুলো বছর বছর তাদের ব্যবস্থাপনা ফির পরিমাণ বাড়িয়ে নিজেরা লাভবান হয়েছে। এর বিপরীতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ফান্ডগুলোর বিনিয়োগকারীরা। সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানিগুলোকে আরআইইউ প্রদানের অবারিত সুযোগ দেয়ার কারণে বিগত কমিশনের দায় রয়েছে।
এছাড়া তালিকাবহির্ভূত সিকিউরিটিজে মিউচুয়াল ফান্ডের বিনিয়োগ বরাবরই প্রশ্নবিদ্ধ হলেও এ বিষয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা অনেক ক্ষেত্রেই নীরব ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয়ের সুপারিশে বিনিয়োগকারীদের কোনো ধরনের অনুমোদন ছাড়াই মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর মেয়াদ আরো ১০ বছর বাড়ানো হয়। এ সিদ্ধান্তের কারণে এ খাতের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা আরো বেড়েছে।










