২০২০ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় ৩৮ হাজার পিস শার্ট ও প্যান্ট সরবরাহের ক্রয়াদেশ পায় বাংলাদেশের দেশওয়ান অ্যাপারেলস লিমিটেড। ইতালিভিত্তিক ক্রেতাপ্রতিষ্ঠান ফ্যাশন ইতালিয়ান স্টাইলের ১ লাখ ৫৪ হাজার ১৬০ ডলারের ওই ক্রয়াদেশের বিপরীতে শার্ট ও প্যান্ট রফতানি হয় একই বছরের অক্টোবরে। পণ্য রফতানি হলেও প্রাপ্য অর্থ নির্ধারিত সময়ে দেশে ফেরত আসেনি।

কভিডের প্রাদুর্ভাব শুরুর পর পরই দেশের অন্যতম রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান এনভয় গ্রুপ ইউরোপের একটি দেশে পোশাক রফতানি করে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট বন্দরে পৌঁছার পর ক্রেতা পণ্য গ্রহণে অপারগতা প্রকাশ করে। পরে সেই পণ্য ফেরত এনে মূল দামের চেয়ে অনেক কমে রফতানি করতে হয়েছে অন্য ক্রেতার কাছে। এ প্রক্রিয়ায় ঋণপত্রের বিপরীতে ১৫ লাখ ডলার অপ্রত্যাবাসিত থেকে গেছে বলে জানিয়েছে রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানটি।

দেশ থেকে রফতানি হওয়া পণ্যের বিপরীতে প্রাপ্ত অর্থের পরিসংখ্যানে নিয়মিতই তারতম্য থাকে। কভিডকালে এর পরিমাণ অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও ইপিবির পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, গত আড়াই বছরে রফতানি ও অর্থ প্রাপ্তির ব্যবধান ১ হাজার ২৯১ কোটি বা ১২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কভিডের প্রভাবে ক্রেতা ও রফতানিকারকের বাণিজ্য বিরোধের অনেক ঘটনা ঘটেছে। ফলে রফতানির বিপরীতে মূল্য হ্রাসের পরিস্থিতিও বেড়েছে। আবার ঋণপত্রের বিপরীতে অর্থ পরিশোধের সময়সীমাও বেড়ে গিয়েছে। সবকিছুর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে রফতানির বিপরীতে প্রত্যাবাসিত অর্থমূল্যে।

রফতানির বিপরীতে অর্থ না পাওয়ায় আদালতের দ্বারস্থও হয়েছে দেশের রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যভিত্তিক এডিনবার্গ উলেন মিল গ্রুপের কাছে ৫ কোটি ৯৮ লাখ টাকা পাওনা দাবি করে মামলা করেছে দেশের চার রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান। জাহাজীকৃত পণ্যের মূল্য পরিশোধ না করার অভিযোগে গত ১৪ মার্চ ঢাকার নিম্ন আদালতে এ মামলা করা হয়।

বাণিজ্যসংশ্লিষ্ট ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাণিজ্য বিরোধের প্রেক্ষাপটে মূল্য হ্রাসের ঘটনায় রফতানির বিপরীতে প্রত্যাবাসিত অর্থ কম হতে পারে। তবে তা কোনোভাবেই ১০ শতাংশের বেশি হওয়ার সুযোগ নেই। অর্থ পরিশোধের সময়সীমা বাড়তে পারে, তবে তা সমন্বয় হয়ে যায় নির্ধারিত সময়ে। সব মিলিয়ে রফতানির বিপরীতে অর্থ প্রাপ্তির পার্থক্য অনেক বেশি হওয়ার সুযোগ নেই। তবে পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অসাধু ক্রেতা ও রফতানিকারকদের যোগসাজশে অর্থ পাচারের ঘটনা ঘটতে পারে। সবকিছুর প্রভাবে পণ্য রফতানি ও প্রাপ্ত অর্থের পার্থক্য বেড়েই চলেছে। ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ অনুযায়ী আড়াই বছরে রফতানির বিপরীতে অপ্রত্যাবাসিত বা অপ্রাপ্ত অর্থের হার ১৩ শতাংশেরও বেশি।

রফতানিকারকদের সংগঠন এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ইএবি) সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী এমপি বণিক বার্তাকে বলেন, কভিড একটা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে ফেলে দিয়েছে। অর্ডার বাতিল যেমন হয়েছে, তেমনি ডিসকাউন্টের ঘটনাও ঘটেছে। এসব কারণে বাংলাদেশ ব্যাংকের ১০ শতাংশের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। রফতানিকারকদের উদ্যোক্তা গুণের কারণে বাংলাদেশ এখন পণ্য উৎপাদনের প্রধানতম আকর্ষণীয় ক্ষেত্র। ব্যবসায় দু-চারজন অসৎ থাকতে পারে, তবে সেজন্য গোটা ব্যবসায়ী সমাজকে অসাধু ভাবা ঠিক হবে না।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) সূত্র বলছে, রফতানির তথ্য প্রকাশ করা হয় শুল্ক কর্তৃপক্ষ পর্যায়ের পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে। রফতানি ও রফতানির বিপরীতে প্রাপ্ত অর্থের মধ্যে গরমিল থেকে যাওয়ার বেশকিছু কারণ আছে। এর মধ্যে প্রথমেই আছে সময়সীমা। ইপিবির পরিসংখ্যানগুলো বন্দরে পণ্য জাহাজীকরণ ও শিপমেন্টভিত্তিক। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানগুলো বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থ প্রাপ্তির হিসাব অনুযায়ী। অর্থাৎ রফতানি হওয়া পণ্য আমদানিকারকের নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছার পর যে অর্থ পরিশোধ হয়, সেই অর্থ বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকে প্রত্যাবাসন হলে সেটিকেই এক্সপোর্ট রিসিপ্ট হিসেবে বিবেচনায় নেয়া হয়। এক্ষেত্রে পণ্য শিপমেন্ট ও অর্থ প্রাপ্তির সময়ে পার্থক্যের প্রভাবে প্রাপ্ত অর্থ কম হওয়ার সুযোগ রয়েছে।

রফতানিতে ডিসকাউন্টের চর্চাও রফতানি ও প্রাপ্ত অর্থের গরমিলের বড় কারণ বলে জানিয়েছে ইপিবি। যা অনুসরণে ক্রেতা নির্ধারিত পণ্যের সঙ্গে রফতানি হওয়া পণ্যের মানে কোনো ব্যত্যয় ঘটলে ক্রেতারা ডিসকাউন্টেড মূল্যে পণ্য গ্রহণ করেন। এ প্রক্রিয়ায় জাহাজীকরণ হওয়া পণ্যের বিপরীতে প্রাপ্ত অর্থের পরিমাণ কম হওয়ার সুযোগ রয়েছে। ইপিবি যে পরিসংখ্যান প্রকাশ করে, সেখানে ডিসকাউন্টের কোনো হিসাব থাকে না। তবে প্রাপ্ত অর্থে ডিসকাউন্টের প্রতিফলন দেখা যায়। আবার অনেক সময় মূল ঋণপত্রের বিপরীতে আংশিক রফতানি হয় আমদানিকারকের অনুমতি নিয়ে। এক হাজার পিস পণ্যের ঋণপত্রের রফতানির বিপরীতে রফতানি হয়েছে ৬০০ পিস। কিন্তু বিল অব এন্ট্রির ঘোষণা অনুযায়ী রফতানি হয় এক হাজার পিস হিসেবে। কিন্তু যখন অর্থ পরিশোধ হয় ৬০০ পিসের, স্বাভাবিকভাবেই তা কম হয়।

ইপিবি জানিয়েছে, সময়ের পার্থক্যটা রফতানির বিপরীতে প্রাপ্ত অর্থের গরমিলের সবচেয়ে বড় কারণ। এর পরই আছে ইন্টারন্যাশনাল কমার্শিয়াল টার্মসের কারণে। দেখা গেল, রফতানির বিল অব এন্ট্রিতে ঘোষিত মোট মূল্যের একটি অংশ ক্রেতা চালানের বীমা বাবদ বা পরিবহন খরচ বাবদ কেটে রাখার কথা রয়েছে। এ কারণে যখন অর্থ প্রত্যাবাসন হয় তা একটি নির্ধারিত অংশ বাদ দিয়ে আসে। সব মিলিয়েই রফতানি ও প্রাপ্ত অর্থের মধ্যে পার্থক্য থেকে যাচ্ছে। এ পার্থক্য কমিয়ে আনার জন্য সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বয়ের প্রয়োজন আছে।

ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান এএইচএম আহসান বণিক বার্তাকে বলেন, অসাধু বাণিজ্যিক চর্চা থাকতে পারে, যেমন পণ্য রফতানি করা হলো কিন্তু অর্থ দেশে আনাই হলো না, এমন ঘটনা ঘটতে পারে। যেকোনো দেশ থেকে অর্থ পাচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য। এ ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে, কিন্তু তা বাংলাদেশ ব্যাংকের নজর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। তার পরও ফাঁক গলে অসাধু ঘটনা ঘটার সুযোগ রয়েছে। ব্যাংকের নজরদারি ব্যবস্থাকেও এক্ষেত্রে বিবেচনায় নিতে হবে। তবে সবকিছু ছাপিয়ে কভিডকালের প্রভাবে রফতানি ও প্রাপ্ত অর্থের পার্থক্য বেড়েছে। পরিসংখ্যানে গরমিলের কারণ যা-ই থাকুক না কেন পার্থক্যটা কম হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি। এ পার্থক্য সমন্বয়ের জন্য একটি কমিটি তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।

ইপিবি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে রফতানি হয়েছে ৩ হাজার ৩৬৭ কোটি ডলারের। যদিও অর্থ এসেছে ২ হাজার ৯৯৬ কোটি ডলার। এ হিসেবে রফতানি ও প্রত্যাবাসিত অর্থের পার্থক্য ১১ শতাংশের বেশি। ২০২০-২১ অর্থবছরে রফতানি হয়েছে ৩ হাজার ৮৭৫ কোটি ডলারের পণ্য। এর বিপরীতে এসেছে ৩ হাজার ৩৯৬ কোটি ডলার। এ হিসাবে রফতানি ও প্রত্যাবাসিত অর্থের পার্থক্য ১২ শতাংশের বেশি। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে রফতানি হয়েছে ২ হাজার ৪৬৯ কোটি ডলারের পণ্য। এর বিপরীতে এসেছে ২ হাজার ২৭ কোটি ডলার। এ হিসাবে রফতানি ও প্রত্যাবাসিত অর্থের পার্থক্য প্রায় ১৮ শতাংশ।

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও বর্তমান বোর্ড অব গভর্নরসের সদস্য সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, রফতানি যখনই হোক তার অর্থ প্রত্যাবাসনের সর্বোচ্চ সময়সীমা ১৮০ দিন। কভিডকালে এ সময়সীমায় তারতম্য ঘটেছে, যার প্রভাবে শিপমেন্ট ও প্রাপ্ত অর্থের পার্থক্য হতে পারে। আবার অনৈতিক কর্মকাণ্ডেও পার্থক্য হতে পারে, তবে তা কোনোভাবেই ১২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার কথা নয়। ব্যাংকাররা অনেক সময় অর্থ প্রত্যাবাসনে কঠোর ভূমিকা রাখতে পারেন না উদ্যোক্তাদের স্বার্থে। সব মিলিয়ে বর্তমানে যে পার্থক্য দেখা যাচ্ছে, সেখানে কভিডের কারণে অর্থ পরিশোধে বিলম্বের প্রভাব থাকতে পারে বলে মনে করছি। অসাধু বা অনৈতিক বাণিজ্যচর্চার সুযোগ খুব বেশি নয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, রফতানির পর ডিসকাউন্টের ঘটনা ঘটছে। ক্রয়াদেশ বাতিলের ঘটনা ঘটে। কভিডকালে এ ধরনের ঘটনা বেশি ঘটেছে। বিধান আছে, ১০ শতাংশের বেশি ডিসকাউন্ট করা যাবে না। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, রফতানিকারকদের দরকষাকষির সক্ষমতায় ঘাটতির কারণে ডিসকাউন্টের হার অনেক বেড়ে যায়। এ বিষয়ে রফতানিকারকের স্বার্থে ব্যাংকারদের কঠোর ভূমিকাও অনেক সময় পালন করা কঠিন হয়ে পড়ে। অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে বলতে হয়, যদি কোনো অর্থ পরিশোধ না হয়, পরবর্তী সময়ে ঋণপত্র খুলতে পারার কথা নয়, কাজেই অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ আছে বলে আমি মনে করি না।

ইপিবি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০১৯-২০ অর্থবছর থেকে চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশ থেকে রফতানি হয়েছে ৯ হাজার ৭১৩ কোটি ডলারের পণ্য। এর বিপরীতে প্রাপ্ত অর্থের পরিমাণ ৮ হাজার ৪২১ কোটি ডলার। এ হিসাবেই রফতানি ও প্রাপ্ত বা প্রত্যাবাসিত অর্থের গরমিল ১ হাজার ২৯১ কোটি বা ১২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) অধ্যাপক শাহ মো. আহসান হাবীব বণিক বার্তাকে বলেন, এ পার্থক্যের একটা কারণ হতে পারে পরিসংখ্যানগুলো রেকর্ড হচ্ছে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে। ডিসকাউন্টের কারণেও পার্থক্য হতে পারে, তবে তাতে এত বড় পার্থক্য তৈরি হওয়ার কারণ নেই। রফতানি বাবদ প্রাপ্য অর্থের একটি অংশ সবসময়ই স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে দেরিতে আসে। কভিডের সময়ে অর্থ পরিশোধের সময়সীমা অনেক ক্ষেত্রে বাড়ানো হয়েছে। যার প্রতিফলন দেখা যেতে পারে প্রাপ্ত অর্থে। প্রত্যাবাসন সক্ষমতা বাড়াতে রফতানিকারকদের চুক্তিগুলোর আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি করা জরুরি। সেজন্য দ্রুত এ-সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সনদ বা ভিয়েনা কনভেনশনে সই করা প্রয়োজন।