দেশের বিদ্যুতের উৎপাদন ঘাটতির মধ্যে ভারতের আদানি পাওয়ারের একটি ইউনিটের উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে আদানির কেন্দ্র থেকে সাড়ে ৭০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ হচ্ছে, যা গতকাল মঙ্গলবার ছিল দেড় হাজার মেগাওয়াটের ওপরে। এদিকে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে যাওয়ায় দেশে লোডশেডিং বেড়ে গেছে।
বিপিডিবি সূত্রে জানা গেছে, গতকাল মধ্যরাতের পর ভারতে আদানির বিদ্যুৎ কেন্দ্রের একটি ইউনিটের বিয়ারিং থেকে সতর্কসংকেত পাওয়া যায়। এরপরই তাৎক্ষণিকভাবে ইউনিটটির উৎপাদন বন্ধ করে দেয়া হয়।
বিপিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, আদানির ৭০০ মেগাওয়াটের একটি ইউনিট (মেশিন) বন্ধ হয়ে গেছে। এটি পুনরায় চালু হতে তিন থেকে চার দিন সময় লাগতে পারে। এতে বিদ্যুৎ সরবরাহে কিছুটা ঘাটতি বেড়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিকল্প হিসেবে জ্বালানি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানোর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। বিশেষ করে সিরাজগঞ্জ ও খুলনার বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালু রেখে ঘাটতি কিছুটা পূরণ করার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে চলমান তাপদাহের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় চাপ আরো বেড়েছে।
বিদ্যুৎ সঞ্চালনের নিয়োজিত রাষ্ট্রীয় সংস্থা পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির (পিজিসিবি) তথ্য বলছে, বুধবার দিনের বেলায় (ডে পিক) দেশে ১৫ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা ছিল। এর বিপরীতে সরবরাহ করা হয় ১৩ হাজার ৪০ মেগাওয়াট। চাহিদা ও সরবরাহে ঘাটতি ছিল প্রায় আড়াই হাজার মেগাওয়াট। যা চলতি বছরের মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ ঘাটতি বলে বিদ্যুৎ বিভাগ সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এদিন রাতে বিদ্যুতের চাহিদার প্রাক্কলন করা হয়েছে ১৬ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট।
পিজিসিবির তথ্য বলছেন, গত বছরের এপ্রিলে সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ৩৫৩ মেগাওয়াট। যা এ বছর লোডশেডিং প্রায় আড়াই হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি পৌঁছেছে। বর্তমানে দেশে গ্রিডভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু সেখানে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে ১৫ হাজার মেগাওয়াটের কিছু বেশি। বিদ্যুতের চাহিদা বাড়লেও জ্বালানি সংকটের কারণে এর অর্ধেক সক্ষমতা বসিয়ে রাখতে হচ্ছে।
ভারতের ঝাড়খন্ড রাজ্যে নির্মিত আদানির কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার। ২০১৭ সালে আদানির সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি করে পিডিবি। ৮০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি ইউনিট আছে এখানে।
পিজিসিবির তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট বিদ্যুৎকেন্দ্র ১৩৬টি। এর মধ্যে গ্যাসস্বল্পতায় ১৩টি, জ্বালানি তেল না থাকায় ৯টি ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজের জন্য ৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদন তালিকার বাইরে আছে। বাকি কেন্দ্রের মধ্যে ১৭টি সৌর, যা থেকে রাতে বিদ্যুৎ পাওয়া যায় না।
এদিকে ভারতের আদানি পাওয়ারের সঙ্গে বকেয়া নিয়ে দীর্ঘদিনের টানাপোড়ন চলছে বিপিডিবির। সম্প্রতি ৬৮৮ মিলিয়ন ডলার বকেয়া বিল দ্রুত পরিশোধের তাগাদা দিয়ে সরকারের কাছে চিঠি দেয় ভারতীয় কোম্পানিটি। বকেয়া শোধ না হলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে চিঠিতে সতর্ক করা হয়। আরো বলা হয়, মোট বকেয়া বিল দাঁড়িয়েছে ৬৮৮ মিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে ৩৯৩ মিলিয়ন ডলার ‘বিতর্কহীন’—যা প্রায় চার থেকে পাঁচ মাসের বিদ্যুৎ সরবরাহের সমপরিমাণ।
২০১৭ সালে আদানি পাওয়ার লিমিটেডের সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি করে পিডিবি। চুক্তি অনুসারে আদানির কেন্দ্র থেকে ২৫ বছর ধরে বিদ্যুৎ কিনবে বাংলাদেশ। আদানি গ্রুপ জানায়, তারা ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির আওতায় ভারতের পূর্বাঞ্চলের গোড্ডা অবস্থিত ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ রফতানি করে আসছে।










