পাকিস্তানের খাইবার-পাখতুনখোয়া প্রদেশের রাজধানী পেশোয়ার। কুষাণ সম্রাট কনিষ্কের রাজধানী পুরুষপুর তথা আজকের পেশোয়ার উপমহাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন নগরীগুলোর একটি। আফগান সীমান্তবর্তী প্রদেশটির রাজধানী পেশোয়ার এক সময় পুষ্পনগরী উপাধিও পেয়েছিল। পশতুন জাতিগোষ্ঠীর পুরনো ও সমৃদ্ধ সে সংস্কৃতির কোনো ছাপই এখন নগরীটিতে খুঁজে পাওয়া যায় না। সে জায়গা দখল করে নিয়েছে অস্ত্র ও বোমাবাজির নতুন এক সংস্কৃতি, স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম যাকে আখ্যা দিয়েছে ‘কালাশনিকভ সংস্কৃতি’ হিসেবে।
রুশ অস্ত্র ডিজাইনার মিখাইল কালাশনিকভের উদ্ভাবিত স্বয়ংক্রিয় অ্যাসল্ট রাইফেলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় মডেল একে-৪৭। উদ্ভাবকের নাম অনুযায়ী অস্ত্রটি কালাশনিকভ রাইফেল হিসেবেও পরিচিত। গত কয়েক দশকে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের পশতুনদের মধ্যে অস্ত্রটি বেশ সহজলভ্য হয়ে উঠেছে।
শুধু পেশোয়ার নয়, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের পশতুন অধ্যুষিত প্রায় প্রতিটি শহরেই ডালপালা ছড়িয়েছে কালাশনিকভ সংস্কৃতি। ঐতিহাসিক-পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এ সংস্কৃতির সূচনা ও বিকাশ ঘটেছিল পাকিস্তানের প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জেনারেল জিয়াউল হকের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে। রাজনৈতিক সুবিধা নেয়ার পাশাপাশি মার্কিন-সৌদি বন্ধুদের খুশি রাখতে গিয়ে রণদুর্মদ পশতুনদের মধ্যে উগ্রপন্থার বিকাশ ঘটিয়েছিলেন তিনি। সে উগ্রপন্থার মূল উপাদান এ কালাশনিকভ সংস্কৃতি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, পাকিস্তান নিজেই এখন এ কালাশনিকভ সংস্কৃতির ভুক্তভোগী। পেশোয়ার ও আশপাশের শহরগুলোয় সন্ত্রাসী হামলায় প্রাণহানির খবর এখন প্রতিনিয়তই সংবাদের শিরোনাম হচ্ছে। তবে এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাটি ঘটেছিল কয়েক বছর আগে। পেশোয়ারে সেনাবাহিনী পরিচালিত এক স্কুলে কালাশনিকভ রাইফেল হাতে হামলা চালায় ছয় বন্দুকধারী। তাদের গুলিতে মৃত্যু ঘটে ১১৪ শিশুর।
পশতুন জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংস্কৃতির এ আমূল রূপান্তরকে অনুসন্ধানী চোখে দেখেছেন পাকিস্তানি সাংবাদিক আকবর জায়েদি। এরই সূত্র ধরে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের আজকের পরিস্থিতির জন্য জেনারেল জিয়াউল হককেই দায়ী করেছেন তিনি। তার ভাষ্যমতে, ইসলামাবাদ আফগানিস্তানে যে পরিস্থিতি তৈরি করেছে, সেটিই এখন পাকিস্তানের জন্য বুমেরাং হয়ে ফিরে এসেছে।
একই বক্তব্য উঠে আসছে দেশটির স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক অন্যান্য সংবাদমাধ্যমেও। এসব মাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, জিয়াউল হকের আমলে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ও সামরিক বাহিনীর তত্ত্বাবধানে পাকিস্তানের রাজনীতি ও সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তন ঘটে যায়। এ পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের পশতুভাষী জনগণ। পশতুনসহ পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সাধারণ জনগণ এ পরিবর্তনের মূল্য এখনো পরিশোধ করে চলেছে।
জিয়াউল হক পাকিস্তানের ক্ষমতায় আসেন ১৯৭৭ সালে। এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জুলফিকার আলী ভুট্টোকে উত্খাত করে। ওই সময়ে তিন মাসের মধ্যে নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি। ১৯৮৮ সালে মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। এখন পর্যন্ত জিয়াউল হকই পাকিস্তানের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা প্রেসিডেন্ট।
জিয়াউল হকের প্রথম মন্ত্রিসভা গঠিত হয় ১৯৭৭ সালের জুলাইয়ে। কট্টর ভুট্টোবিরোধী হিসেবে পরিচিত জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানকে (জেআই) সঙ্গে নিয়ে এ মন্ত্রিসভা গঠন করেন তিনি। এর দুই বছরের মাথায় ১৯৭৯ সালে আফগানিস্তানে সামরিক হস্তক্ষেপ করে সোভিয়েত ইউনিয়ন।
ঐতিহাসিকরা বলছেন, ওই সময় আফগানিস্তান হয়ে উঠেছিল সোভিয়েত-মার্কিন স্নায়ুযুদ্ধের নতুন রণক্ষেত্র। সরাসরি রণক্ষেত্রে না নামলেও প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ নানা উপায়ে আফগানিস্তানে বিভিন্ন উগ্রপন্থী সংগঠনকে সক্রিয় করে তুলেছিল মার্কিনরা। অর্থসহায়তা নিয়ে এগিয়ে আসে ওয়াশিংটনের ঘনিষ্ঠ মিত্র সৌদি আরবও। অন্যদিকে মাঠ পর্যায়ে সক্রিয় হয়ে ওঠে জিয়াউল হকের শাসনাধীন পাকিস্তান। এক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর পাশাপাশি জিয়াউল হকের অন্যতম প্রধান সহযোগী হয়ে উঠেছিল জেআই ও এর ছাত্রসংগঠন ইসলামী জমিয়ত ই তালাবা (আইজেটি)। মার্কিন-সৌদি অর্থ সহযোগিতায় ও পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে প্রচুর অস্ত্র প্রবেশ করে আফগানিস্তানে, যার বড় একটি অংশ ছিল অস্ত্র চোরাচালানি ও কালোবাজার থেকে সংগ্রহ করা কালাশনিকভ রাইফেল। আফগানিস্তানে গড়ে ওঠে গোত্রভিত্তিক যুদ্ধবাজ অনেক সংগঠন। এসব সংগঠনের নেতাদের মধ্যে জিয়াউল হকের সবচেয়ে বেশি আশীর্বাদপুষ্ট ছিলেন খিলজি পশতুন খারোটি উপজাতির নেতা গুলবুদ্দিন হেকমতিয়ার। ইসলামাবাদের সঙ্গে গুলবুদ্দিন হেকমতিয়ারের যোগাযোগের প্রধান সূত্র ছিল জেআই ও আইজেটি।
আফগানিস্তানে যুদ্ধ ভয়াবহ রূপ ধারণ করলে দেশটি থেকে প্রচুর শরণার্থী এসে ভিড় জমায় পাকিস্তানে। তাদের সঙ্গে সঙ্গে একে-৪৭ ও হেরোইনের চালান ঢুকতে থাকে পাকিস্তানে। আফগান সীমান্ত ঘিরে গড়ে ওঠে অস্ত্রের কালোবাজার ও মাদক পাচারকারী নেটওয়ার্ক। এসব অস্ত্র ও মাদকের প্রধান ক্রেতা হয় পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তা, উপজাতীয় নেতা, জিয়াউল হকপন্থী রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা।
পাকিস্তানের স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানাচ্ছে, দেশটিতে আফগান যুদ্ধ শুরুর বছরেই প্রথম একে-৪৭ প্রকাশ্যে আসে। আর তা প্রকাশ্যে এনেছিল আইজেটি। সংগঠনটি সে সময় জিয়াউল হকের পৃষ্ঠপোষকতায় বেশ বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল। বিশেষ করে সংগঠনটির ‘থান্ডার স্কোয়াড’ স্থানীয় কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্রদের মধ্যে বেশ আতঙ্কের সঞ্চার করেছিল। রানা জাভেদের নেতৃত্বে করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ে একে-৪৭ নিয়ে মহড়া দেয় থান্ডার স্কোয়াড। বিশ্ববিদ্যালয়ে জিয়াউল হক বিরোধী ছাত্রসংগঠনগুলোর এক সমাবেশে তারা গুলি চালায়। তবে ওই সময় কোনো হতাহতের তথ্য পাওয়া যায় না। ঘটনাটি সে সময় ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে বেশ আতঙ্কের সঞ্চার করেছিল।
পরবর্তী সময়ে অনুসন্ধান চালিয়ে স্থানীয় সাংবাদিকরা জানতে পারেন, রানা জাভেদ ও তার দলের লোকেরা একে-৪৭-এর প্রথম চালান সংগ্রহ করেছিল পেশোয়ারভিত্তিক এক পশতুন অস্ত্র কালোবাজারির কাছ থেকে।
স্থানীয় বুদ্ধিজীবীরা বলছেন, ওই সময়েই প্রথম সামাজিক-রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে পাকিস্তানের আফগান যুদ্ধে জড়ানোর ফলাফল দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। সে সময় বাস্তুচ্যুত প্রায় ৪০ লাখ আফগান শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছে পাকিস্তানে। স্থানীয় গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইকে কাজে লাগিয়ে ওই সময় পাকিস্তান ও আফগানিস্তান দুই দেশেই পশতুনদের মধ্যে উগ্রপন্থার পালে হাওয়া দিয়েছে সিআইএ। জেনারেল জিয়াউল হক এতে সায় দেয়ার পাশাপাশি বিষয়টিকে কাজে লাগিয়ে নিজের ক্ষমতা আরো পাকাপোক্ত করেছেন। ক্ষমতায় আসার দুই বছরের মধ্যেই পাকিস্তানে তার একক কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থা কায়েম হয়। নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয় রাজনৈতিক কার্যক্রমের ওপর। কেড়ে নেয়া হয় সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা। উত্থান ঘটে সামরিক বাহিনীর ‘মিলিয়নেয়ার জেনারেলদের’। তাদের অনেকের বিরুদ্ধেই ওই সময় আফগানদের জন্য দেয়া সিআইএর অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছিল। কেউ কেউ জড়িয়ে পড়ে মাদক ব্যবসায়। রাষ্ট্রীয় ও সামরিক বাহিনীর পৃষ্ঠপোষকতায় আন্তর্জাতিক মাদক ব্যবসার সাপ্লাই চেইনের বড় একটি অংশ হয়ে ওঠে পাকিস্তান।
পাকিস্তানি বুদ্ধিজীবীরাও বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত নিবন্ধে দাবি করেছেন, ওই সময় সামরিক শক্তি, অর্থ, দুর্নীতি ও পৃষ্ঠপোষকতার সংস্কৃতির এক দুষ্টচক্র গড়ে উঠেছিল, যার পরিণাম এখনো ভুগতে হচ্ছে পাকিস্তানকে। এ দুষ্টচক্রের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হক। নিজের ও সামরিক বাহিনীর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্যই আফগান যুদ্ধকে কাজে লাগিয়ে পশতুনদের মধ্যে গোঁড়ামির সংস্কৃতির প্রচলন করেছিলেন তিনি।
পাকিস্তানে কালাশনিকভ সংস্কৃতির সূচনা পর্ব নিয়ে আলোচনা করতে গেলে করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ে আইজেটির মহড়ার ঘটনাটির কথাই উল্লেখ করা হয় বারবার। পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানে জলের স্রোতের মতো প্রবেশ করতে থাকে কালাশনিকভ। স্বয়ংক্রিয় রাইফেলটি হয়ে ওঠে আভিজাত্য ও ক্ষমতার প্রতীক। রাজনৈতিক বিরোধী ও প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করার পাশাপাশি সাধারণ অপরাধীদের হাতেও শোভা পেতে থাকে একে-৪৭। এক পর্যায়ে সরবরাহ বেড়ে যাওয়ার কারণে অস্ত্রটির দামও কমে যেতে থাকে। ওয়াশিংটন পোস্ট জানাচ্ছে, আশির দশকের শুরুর দিকেও পেশোয়ার ও আফগান সীমান্তবর্তী লান্ডি কোটাল বাজারে একেকটি কালাশনিকভ কিনতে ক্রেতাকে অর্থ ব্যয় করতে হতো ৩ হাজার ডলারের সমপরিমাণ। দেড় দশকের মাথায় তা নেমে এসেছিল ৩৭৫ থেকে ৫০০ ডলারের মধ্যে।










