শয্যা সংকটে খোলা বারান্দায় মেঝেতে রেখেই সেবা দেয়া হচ্ছে দগ্ধ রোগীকে। প্রতিদিন গড়ে ৮০ জন রোগী ভর্তি থাকলেও চিকিৎসক আছেন মাত্র একজন। সংকট রয়েছে যন্ত্রপাতি ও প্রয়োজনীয় ওষুধের। এ চিত্র খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের। রোগীদের অভিযোগ, ৩৬ শয্যার এ ইউনিটে সেবা দেয়া হয় নামমাত্র। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, বার্ন ইউনিটের সংকটের বিষয়ে একাধিকবার চিঠি দিয়েও কোনো সুরাহা হয়নি। এ কারণেই রোগীদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

খুমেক হাসপাতাল সূত্র জানায়, ২০১৪ সালে হাসপাতালের ষষ্ঠ তলায় ২০টি শয্যা নিয়ে চালু হয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিট। পরে সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. তরিকুল ইসলামের প্রচেষ্টায় এ ইউনিটে শয্যা সংখ্যা ৩৬-এ উন্নীত হয়। তবে নিয়মিতই এ ইউনিটে দ্বিগুণের বেশি রোগী ভর্তি থাকে। কোনো কোনো সময় রোগীর সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়ে যায়। ধারণক্ষমতার বেশি রোগী থাকার কারণে বারান্দার মেঝেতে রোগীদের চিকিৎসা দিতে হয়। গতকাল এ ইউনিটে রোগী ভর্তি ছিল ৭৪ জন। তার আগের দিন ছিল ৮৮ জন। আর দুই সপ্তাহ আগে রোগী ছিল ১০৫ জন।

সূত্র জানায়, এ ইউনিটে চারটি মেডিকেল অফিসারের পদ থাকলেও সবগুলো শূন্য। সহকারী রেজিস্ট্রার পদমর্যাদার একজন চিকিৎসক থাকলেও সম্প্রতি তাকে হাসপাতালেরই সার্জারি ইউনিট-২-এ বদলি করা হয়েছে। ফলে বার্ন ইউনিট রেজিস্ট্রার পদ শূন্য রয়েছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের দুটি পদের মধ্যে কর্মরত আছেন কেবল একজন। তিনিই এ ইউনিটের একমাত্র চিকিৎসক। তিনি আবার প্রতি সোমবার আউট ডোরে রোগী দেখেন এবং রবি ও বুধবার সার্জারি নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। শিক্ষানবিশ চিকিৎসকরাও এ ইউনিটে আসেন না। বলতে গেলে দুপুর থেকে পরদিন সকাল পর্যন্ত কোনো চিকিৎসকের দেখা মিলে না। এতে দুপুরের পর ভর্তি হওয়া রোগীদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়।

প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে বার্ন ইউনিটে চিকিৎসা নিচ্ছেন বাগেরহাটের নসিমনচালক সোহাগ। তিনি জানান, নসিমনে আগুন ধরে তেলের ট্যাংক ফেটে সৃষ্ট আগুনে তার শরীরের নিচের অংশ ঝলসে যায়। এর পর থেকেই তিনি হাসপাতালে ভর্তি থাকলেও এখন পর্যন্ত অবস্থার তেমন উন্নতি হয়নি। হাসপাতালে ওষুধ সরবরাহ না থাকায় সমস্যা হচ্ছে। ড্রেসিংও ঠিকমতো করা যাচ্ছে না।

নয় বছর বয়সী ফারিয়া নামের এক রোগীর স্বজন রেখা বলেন, গত ২৮ জানুয়ারি বেলা ৩টার দিকে শীত নিবারণে আগুন পোহাচ্ছিল ফারিয়া। এ সময় কাপড়ে আগুন লেগে সে দগ্ধ হয়। পরে যশোরের খাজুরা থেকে তাকে এখানে নিয়ে আসা হয়। কিন্তু জরুরি প্রয়োজনে বিশেষ করে বিকাল ও রাতে কোনো চিকিৎসক পাওয়া যায় না। তখন নার্সরাই সেবা দেন। এক সপ্তাহ হতে চললেও ফারিয়ার কোনো উন্নতি দেখা যাচ্ছে না।

এ ইউনিটের ইনচার্জ সিনিয়র স্টাফ নার্স নওরিন সুলতানা বলেন, এখানে রোগীর প্রচণ্ড চাপ। আমরা ২০ শতাংশের বেশি পোড়া রোগী পেলে তাকে ঢাকায় রেফার্ড করি। অনেকেই আছে অসচ্ছলতার কারণে যেতে পারেন না। তাদেরকে এখানে সাধ্যমতো সেবা দেয়া হয়। কিন্তু দিনের ১৮ ঘণ্টায় চিকিৎসক থাকেন না। পুরো ইউনিট চলছে একজন চিকিৎসক দিয়ে। শিক্ষানবিশ চিকিৎসকরাও এখানে আসেন না। এক সপ্তাহের ওষুধে সর্বোচ্চ চার-পাঁচদিন চলে। সব মিলিয়ে সমস্যার শেষ নেই।

তিনি আরো বলেন, আগুনে পোড়া রোগীকে গরম স্থানে রাখতে হয়। কিন্তু প্রয়োজনীয় বেড না থাকায় এখানে মেঝেতে রাখতে হচ্ছে। এতে রোগীদের সুস্থ হতে সময় বেশি লাগছে।

খুমেকের সহকারী অধ্যাপক এবং বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের প্রধান ডা. মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, ২০টি বেড দিয়ে এ ইউনিটের কার্যক্রম শুরু করেছিলাম। সেই থেকে এখনো একজন চিকিৎসকই আছেন। এখন গড়ে ৮০ জনের বেশি রোগী থাকে। মাঝে মাঝে শতাধিক রোগী হয়। বেড দিতে না পারায় ফ্লোরে শুইয়ে সেবা দিতে হচ্ছে। তিনি বলেন, জরুরি ভিত্তিতে এখানে চিকিৎসক পদায়ন করা দরকার। আর শয্যা সংখ্যা কমপক্ষে ৫০-এ উন্নীত করা প্রয়োজন।

এসব সমস্যার কথা স্বীকার করে খুমেক হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. এটিএম মঞ্জুর মোর্শেদ বলেন, বার্ন ইউনিটের চিকিৎসকের সংকট খুব তীব্র। এ ইউনিটে সুষ্ঠু  চিকিৎসা দিতে কমপক্ষে সাতজন চিকিৎসক দরকার। কিন্তু আছে মাত্র একজন। সরবরাহ করা ওষুধ পর্যাপ্ত নয়। এসব ব্যাপারে মন্ত্রণালয়ে একাধিকবার চিঠি দিয়েও কোনো লাভ হয়নি। তবু আশায় আছি, শিগগিরই সমস্যার সমাধান হবে।