বিশ্বের অনেক দেশেই খাদ্য সংকট চরমে। দুই বছর ধরে করোনা মহামারীর প্রভাব, তার মধ্যে বিশ্ব খাদ্য ব্যবস্থার ওপর যেন ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে এসেছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। প্রতিবেশী দেশ শ্রীলংকা এরই মধ্যে এক নজিরবিহীন সংকটে। এবার আরো এক প্রতিবেশী ভুটানেও খাদ্যদ্রব্যের ঘাটতি। পাকিস্তান ও নেপালের অবস্থা আগে থেকেই নড়বড়ে। গুঞ্জন উঠেছে বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিয়েও। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে প্রধান খাদ্যশস্য চালের সংকট দেখা দিয়েছে অনেকবার। সেই ঘাটতি মেটাতে হয়েছে আমদানি করে।
বছরে দেশে চালের চাহিদা রয়েছে প্রায় ৩ কোটি ৭০ লাখ টন। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে চাহিদার চেয়ে জোগানের লক্ষ্যমাত্রা বেশি থাকলেও প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে প্রতি বছর কয়েক লাখ টন চাল আমদানি করতে হয়। আগামী কয়েক দশক দেশের কৃষি উৎপাদন জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব, মৃত্তিকা অবক্ষয়, মাটিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, সেচের পানির স্বল্পতা, অনাবৃষ্টিসহ বিরূপ আবহাওয়ার সম্মুখীন হবে। ব্যাহত হবে ধান উৎপাদন। এমন পরিস্থিতিতে ২০৩০ সাল নাগাদ দেশে চালের ঘাটতি ৩৬ লাখ টন ছাড়াবে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের এক গবেষণায় এমন পূর্বাভাসই দেয়া হয়েছে।
গবেষণায় চালের ভবিষ্যৎ চাহিদা ও জোগান নির্ধারণের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক পরিস্থিতি, সমন্বিত পরিস্থিতি ও প্রতিকূল পরিস্থিতি বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে পরিসংখ্যান ব্যুরো ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের তথ্যের সমন্বয়কে সমন্বিত পরিস্থিতি বিবেচনা করা হয়েছে। আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনে সৃষ্ট দুর্যোগকে বিবেচনায় নিয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতিকূল পরিস্থিতি। উদাহারণ হিসেবে, ২০২১ সালে দেশে চালের চাহিদা ছিল ৩ কোটি ৫২ লাখ টন। স্বাভাবিক পরিস্থিতি অনুযায়ী জোগান ধরা হয় ৩ কোটি ৭৫ লাখ টন। ফসল কাটায় ফলনের পার্থক্য বিবেচনায় নিয়ে সমন্বিত পরিস্থিতিতে সেই জোগান নেমে আসে ৩ কোটি ৫৬ লাখ টনে। যদিও প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে সেই বছর চালের জোগান আসে ৩ কোটি ৪৬ লাখ টন। অর্থাৎ স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ওই বছর ২৩ লাখ টন চাল উদ্বৃত্ত থাকার কথা থাকলেও প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে উল্টো ছয় লাখ টন ঘাটতি হয়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য বলছে, পাঁচ বছর ধরে খাদ্য উৎপাদনে বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি। অথচ এ সময় দেশের জনসংখ্যা বেড়েছে ৫ দশমিক ২৯ শতাংশ। তাই বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশের প্রধান খাদ্যশস্য ধানের উৎপাদন বাড়াতে না পারলে ভবিষ্যতে খাদ্য ভঙ্গুরতা বাড়বে।
কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের গবেষণা অনুযায়ী, ২০৩০ সালে মানুষের খাদ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনে দেশে চালের মোট চাহিদা গিয়ে দাঁড়াবে ৩ কোটি ৯০ লাখ টন। আর উৎপাদনের ধারাবাহিকতায় স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে তখন জোগানের লক্ষ্যমাত্রা হবে ৪ কোটি ৩২ লাখ টন। সমন্বিত পরিস্থিতিতে জোগান দাঁড়াবে ৪ কোটি ১০ লাখ টন। আবার প্রতিকূল পরিস্থিতি বিবেচনায় মোট জোগান গিয়ে নামবে ৩ কোটি ৫৫ লাখ টনে। অর্থাৎ স্বাভাবিক অবস্থায় ২০৩০ সালে চাহিদার বিবেচনায় ৪১ লাখ টন চাল উদ্বৃত্ত থাকবে। কিন্তু প্রতিকূল পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে ৩৬ লাখ টন চালের ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
গবেষকরা বলছেন, ২০৩০ ও ২০৫০ সালের মধ্যে দেশের নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যশস্যের ঘাটতি মোকাবেলায় উন্নত বা হাইব্রিড জাত এবং জলবায়ুসহনশীল প্রযুক্তি উদ্ভাবনের মাধ্যমে ফসলের উৎপাদন বাড়াতে হবে। সেই সঙ্গে উদ্বৃত্ত উৎপাদন বা জোগানের বহুমুখী ব্যবহার এবং অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা সৃষ্টির মাধ্যমে সেই ফসলের ন্যায্যমূল্যও নিশ্চিত করা জরুরি। এছাড়া গবেষণা, সম্প্রসারণ ও বাজার ব্যবস্থা উন্নয়নে বাড়াতে হবে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ।
‘প্রজেকশন অব সাপ্লাই অ্যান্ড ডিমান্ড ফর সিলেক্টেড ফুড ক্রপস ইন বাংলাদেশ বাই ২০৩০ অ্যান্ড ২০৫০’ শীর্ষক গবেষণায় দেশের মোট ৩৫টি ফসলের চাহিদা ও জোগানের পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে তিনটি দানাদার, দুটি কন্দাল, ছয়টি ডাল, ছয়টি মসলা, দুটি তেলজাতীয়, ১০টি সবজি ফসল ও ছয়টি ফল। ২০৩০ ও ২০৫০ সালে ফসলের (খাদ্যশস্য) অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও জোগানের ঘাটতি বা উদ্বৃত্ত নির্ণয় করতেই এ গবেষণা করা হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. এসএম ফকরুল ইসলামের নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিজ্ঞানীদের সমন্বয়ে গবেষণাটি পরিচালিত হয়। মূলত এতে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার পরিসংখ্যান, ন্যাশনাল এগ্রিকালচার রিসার্চ সিস্টেম, ফুড প্ল্যানিং অ্যান্ড মনিটরিং এবং বিভিন্ন জার্নাল থেকে সেকেন্ডারি তথ্য নেয়া হয়েছে। এছাড়া ফসলের গুণমান যাচাইয়ের জন্য কৃষি অঞ্চলভিত্তিক রাজশাহী, বগুড়া, যশোর ও পটুয়াখালী জেলায় আঞ্চলিক পরামর্শক কর্মশালা ও ছয়টি ফোকাস গ্রুপ ডিসকাশনের (এফজিডি) মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয় প্রাথমিক তথ্য-উপাত্ত।
গবেষণায় চাহিদা ও জোগানের পূর্বাভাসের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে অ্যারিমা মডেল। আর সেটিকে যথার্থভাবে পরিচালনার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে আধুনিক এনসিএসএস সফটওয়্যার। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের বিকল্প পরিস্থিতিতে দেশে ভবিষ্যৎ খাদ্য জোগান ও চাহিদার মাঝে উদ্বৃত্ত বা ঘাটতির পরিবর্তনের প্রকৃত রূপ পরীক্ষার জন্য সংবেদনশীলতা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মানুষের খাদ্য গ্রহণের তালিকা ধীরে ধীরে বৈচিত্র্যময় হচ্ছে। দানাদার খাদ্য থেকে সিংহভাগ ক্যালরি গ্রহণ করলেও মোট ক্যালরি গ্রহণের হার অনেক কমে গিয়েছে। ১৯৯০ সালে দানাদার খাদ্য থেকে মোট ক্যালরি গ্রহণের হার ছিল ৮৯ দশমিক ৬ শতাংশ, যা ২০১০ সালে হ্রাস পেয়ে ৮৩ শতাংশ ও ২০২১ সালে ৮০ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে। বর্তমানে দৈনিক ক্যালরির ৭০ দশমিক ৫ শতাংশই চাল থেকে গ্রহণ করে এ দেশের মানুষ।
যেকোনো পরিস্থিতি সামাল দিতে অন্তত এক-দুই মিলিয়ন টন চাল মজুদ রাখা জরুরি জানিয়ে গবেষকদের দলনেতা অধ্যাপক ড. এসএম ফকরুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ভবিষ্যতে যেন খাদ্যনিরাপত্তা বিঘ্নিত না হয় সে কারণেই আমাদের এ গবেষণা করা। এর ওপর ভিত্তি করে সরকারকে দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা ঠিক করতে হবে। কারণ হুট করে ঘাটতি শুরু হলে কারো কাছেই খাদ্যপণ্য পাওয়া যায় না। তাছাড়া এ গবেষণার ফলে দেশের চাহিদা ও জোগান বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঠিক উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা সহজ হবে। পাশাপাশি আমদানি-রফতানিসংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ বা সংস্থাগুলোও কার্যকরী পরিকল্পনা নিতে পারবে।
উচ্চফলনশীল (উফশী) জাতের ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রবীণ এ অধ্যাপক বলেন, দেশে গত বছর চালের ঘাটতি ছিল ছয় লাখ টন। এ বছর বন্যা, সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হওয়া ও অনাবৃষ্টির কারণে সেই ঘাটতি আরো বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই কৃষিতে প্রযুক্তি ও গবেষণায় গুরুত্ব দিতে হবে। ২০৩০ ও ২০৪০ সালের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও কৃষির রূপান্তর করতে হবে।
খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০২১-২২ অর্থবছরে মোট ৯ লাখ ৮৭ হাজার টন চাল আমদানি করা হয়েছে। এর মধ্যে সরকারিভাবে ৬ লাখ ৮৩ হাজার টন এবং বাকি ৩ লাখ ৪ হাজার টন চাল আনা হয়েছে বেসরকারিভাবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সার ও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্তও কৃষির সার্বিক উৎপাদনে প্রভাব ফেলবে। এছাড়া লোডশেডিং ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ভবিষ্যতের খাদ্যনিরাপত্তা সংকটে পড়তে পারে। তাই আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের সক্ষমতার ওপর জোর দেয়ার তাগিদ দেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি সম্প্রসারণ শিক্ষা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আসাদুজ্জামান সরকার। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, আমার মনে হয় এ বছরের অবস্থা অনেক বেশি গুরুতর হবে। সম্প্রতি জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আমদানীকৃত সারের দাম বৃদ্ধি, বন্যা, বৃষ্টি না হওয়া, প্রাকৃতিক দুর্যোগ—এমন অনেক সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে খাদ্যের জোগান ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অবস্থা অনেক ভয়াবহ হবে। অনেক জায়গায় এখনো আমন ধান লাগানো যায়নি। সামনের বোরো মৌসুমও ঝুঁকিতে থাকবে। এর থেকে পরিত্রাণে সেচের জন্য জ্বালানি তেল ও সারের দাম কমাতে হবে, যেন কৃষকরা চাষে উৎসাহ পান।
খরা আর অনাবৃষ্টির কারণে এ বছর আমন রোপণ ব্যাহত হচ্ছে উল্লেখ করে কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আবদুর রাজ্জাক বলেন, চাল উৎপাদনে দ্বিতীয় বৃহত্তম মৌসুম আমন। খরা আর অনাবৃষ্টির পাশাপাশি জ্বালানি তেলের দাম বেশি। গ্রামগঞ্জে অনেক সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। সেচ সংকট তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দেরিতে লাগানো আমনের ক্ষেত এখন সেচের অভাবে ফেটে চৌচির হয়ে গিয়েছে। ফলে আমন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। গতকাল ক্যাবিনেটে এ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আমি বলেছি, আগস্টের পর ধান রোপণ করলে উৎপাদন কমে যাবে। তাই আগামী ১৫ দিন সেচের কাজে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রী সেটি বিবেচনায় নিয়ে বিদ্যুৎ বিভাগকে রাতে সেচের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। আশা করছি, এ সিদ্ধান্ত তারা (বিদ্যুৎ বিভাগ) পালন করবে।
ফসলের ভবিষ্যৎ চাহিদা ও জোগান নিয়ে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের গবেষণা প্রতিবেদন প্রসঙ্গে কৃষিমন্ত্রী বলেন, এ ধরনের স্টাডি খুবই প্রয়োজন। সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে চাল, গমসহ বিভিন্ন ফসলের চাহিদা ও উৎপাদনের পরিসংখ্যান থাকলে সুষ্ঠু পরিকল্পনা প্রয়োজন করা সম্ভব হয়। পরিস্থিতি মোকাবেলায় আগাম ব্যবস্থা গ্রহণ করাও সম্ভব হবে।










