জলবায়ু সহনশীলতা বাড়ানো ও গ্রামীণ জীবিকা উন্নয়নে ১১২ মিলিয়ন বা ১১ কোটি ২০ লাখ ডলারের একটি নতুন প্রকল্প চালু করেছে সরকার। আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিল (ইফাদ) ও ডেনমার্ক সরকারের অংশীদারত্বে নেয়া ‘জলবায়ু সহনশীলতা ও জীবিকা উন্নয়ন’ নামের এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)।

আজ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকল্পটি চালু করা হয়। এটি বন্যাপ্রবণ হাওর ও খরাপ্রবণ উচ্চ বরেন্দ্র অঞ্চলে কাজ করবে।

পরবর্তী ছয় বছরে ৩৩টি উপজেলার প্রায় ১৫ লাখ মানুষের উপকারে আসার লক্ষ্য নিয়ে প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়েছে। হাওরে আকস্মিক বন্যায় মাঠের ফসল নষ্ট হয় এবং অনেক গ্রাম যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে উচ্চ বরেন্দ্র অঞ্চলে খরা ও পানির সংকট কৃষি উৎপাদন এবং গ্রামীণ আয়ের ওপর নেতিবাচক চাপ সৃষ্টি করে। জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো, বিকল্প জীবিকার সুযোগ ও জলবায়ু তথ্যসেবার মাধ্যমে এসব ঝুঁকি মোকাবেলায় সহায়তা করবে এ প্রকল্প।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রতিনিধি মোসলেমা নাজনীন জানান, গ্রামীণ দারিদ্র্য হ্রাস ও সহনশীল অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে ১৯৭৮ সাল থেকে বাংলাদেশ সরকার ও ইফাদের উন্নয়ন অংশীদারত্ব চলে আসছে। প্রকল্পের সাফল্য শুধু অবকাঠামো নির্মাণে সীমিত রাখা উচিত নয়। মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থা, সামাজিক সুরক্ষা, অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং জলবায়ু অভিঘাত মোকাবেলার সক্ষমতা বাড়ছে কিনা, তা দিয়ে সাফল্য বিচার করতে হবে।

প্রকল্পের আওতায় গ্রামীণ সড়ক, স্থানীয় বাজার ও নৌযান ভেড়ানোর ঘাট উন্নত করা হবে, যাতে মানুষ সহজে সেবা নিতে এবং উৎপাদিত পণ্য বাজারে বিক্রি করতে পারে। হাওর অঞ্চলে হাঁটার পথ, পানি ও স্যানিটেশন সুবিধা, মানুষ ও কাটা ফসলের জন্য উঁচু আশ্রয়স্থল এবং নদীভাঙন থেকে গ্রাম রক্ষায় পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।

এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেন বলেন, অবকাঠামো, কৃষি, জীবিকা ও জলবায়ু তথ্য পরস্পর যুক্ত। জলবায়ু সহনশীল সড়ক বাজারে যাতায়াত সহজ করে অর্থনৈতিক সুযোগ বৃদ্ধি করে। দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ কর্মসংস্থানের সক্ষমতা বাড়ায় এবং জলবায়ুর আগাম তথ্য মানুষকে ঝুঁকি বুঝতে সাহায্য করে।

প্রকল্পটি তরুণ নারী ও পুরুষদের কারিগরি ও উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ দেবে এবং দরিদ্র নারীদের কর্মসংস্থানে সহায়তা করবে। হাওরে আকস্মিক বন্যার আগাম সতর্কতা এবং বরেন্দ্র অঞ্চলে খরার পূর্বাভাস স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে প্রস্তুত হতে সাহায্য করবে। পাশাপাশি গ্রামীণ উন্নয়নে জলবায়ু সহনশীল পদ্ধতি প্রয়োগে এলজিইডির সক্ষমতা বাড়ানো হবে।

প্রকল্পটির আনুমানিক মোট ব্যয় ১১২ মিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ইফাদ দেবে ৭০ মিলিয়ন ডলার, বাংলাদেশ সরকার দেবে প্রায় ৩১ দশমিক ৭৫ মিলিয়ন ডলার এবং ডেনমার্ক সরকার দেবে ১০ মিলিয়ন ডলার অনুদান।

বাংলাদেশে ডেনমার্ক দূতাবাসের উপপ্রধান অ্যান্ডার্স বি কার্লসেন বলেন, জলবায়ু ঝুঁকির মধ্যে থাকা দুটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলের জন্য এই উদ্যোগ অত্যন্ত সময়োপযোগী। এর ফলে ক্ষতিকর প্রভাব কমবে এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা বাড়বে।

বাংলাদেশে ইফাদের প্রতিনিধি ড. ভ্যালেন্টাইন আচানচো বলেন, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে মানুষ প্রয়োজনমতো সেবা ও আয় পাচ্ছে কিনা, সেটাই সহনশীলতার আসল পরিচয়। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর যোগাযোগ, তথ্য ও দক্ষতায় বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রকল্পটি জীবিকা রক্ষা করতে সহায়তা করবে। এই অভিজ্ঞতা দেশের অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলেও কাজে লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

সড়ক, বাজার ও গ্রাম সুরক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নের ফলে সেবা ও অর্থনৈতিক সুযোগে মানুষের প্রবেশাধিকার আরো সহজ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে আকস্মিক বন্যা ও খরার পূর্বাভাস পেয়ে কৃষকেরা সময়মতো ফসল ও সম্পদ রক্ষা করতে পারবেন।

তরুণ ও দরিদ্র নারীদের জন্য প্রকল্পটি নতুন কর্মসংস্থানের পথ তৈরি করবে। সব মিলিয়ে প্রকল্পটির মাধ্যমে গ্রামীণ পরিবারগুলোর আয় স্থিতিশীল হবে এবং জলবায়ুজনিত ঝুঁকি কাটিয়ে তারা দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে।