দেশের স্বাস্থ্য খাতের জন্য প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে বরাদ্দ দিয়ে আগামীর প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করা কঠিন। সর্বজনীন স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ইতোমধ্যে বেশি কিছু প্রতিবন্ধকতা সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। এগুলো মোকাবেলায় বাজেটে স্বাস্থ্যের জন্য যেমন বরাদ্দ প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন অর্থের সঠিক ব্যবস্থাপনা।

মঙ্গলবার (১১ জুন) রাতে ইউনিভার্সাল হেলথ কাভারেজ (ইউএইচসি) ফোরাম ও পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) উদ্যোগে এক আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন। আলোচনা সভাটি অনলাইন প্লাটফর্ম জুম মিটিংয়ে অনুষ্ঠিত হয়।

পিপিআরসি নির্বাহী চেয়ারম্যান ও ইউএইচসি ফোরামের আহবায়ক হোসেন জিল্লুর রহমানের সভাপতিত্বে ‘হাউ হেলদি ইস দ্য হেলথ বাজেট ২০২৪’ শীর্ষক সভায় আলোচক ছিলেন অর্থনীতিবিদ, স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ, চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন পর্যায়ে ব্যক্তিরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক রুমানা হক বক্তব্যে বলেন, ‘এবারের স্বাস্থ্য খাতের বাজেটে বেশ কিছু দর্শনের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে এসডিজি অর্জন, মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেয়া এবং স্মার্ট স্বাস্থ্যসেবার কথা বলা হয়েছে। শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ই যে স্বাস্থ্যের জন্য ব্যয় করে এমনটি নয়, অনেক মন্ত্রণালয়ই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করে। গত বছরের তুলনায় এবারের স্বাস্থ্য বাজেট বেড়েছে ৮ শতাংশের কিছু বেশি। তবে যদি মূল্যস্ফীতির কথা চিন্তা করি তাহলে দেখা যাবে এই বাজেট বাড়েনি। ২০১১-১২ অর্থ বছরের জাতীয় বাজেটের ৬ শতাংশ ছিল স্বাস্থ্যের জন্য। প্রায় এক দশকের বেশি সময় ধরে স্বাস্থ্যের জন্য জাতীয় বাজেটে পাঁচ শতাংশ বরাদ্দ থাকছে। বিশ্ব ব্যাংকের হিসাবে স্বাস্থ্যের জন্য মাথাপিছু বরাদ্দ বাংলাদেশে থাকছে ৫৮ মার্কিন ডলার। আর ভারতে রয়েছে ৭৪ ডলার। নেপালেও বেশি। অন্য দিকে স্বাস্থ্যসেবায় রোগীর নিজস্ব ব্যয় (আউট অব পকেট এক্সপেন্ডিচার) বাংলাদেশে বেশি। প্রায় ৭৩ শতাংশ। ভারতে যেখানে ৫০ শতাংশ আর নেপালে ৫১ শতাংশের কিছু বেশি। আগামী অর্থ বছরের চেয়ে ৩ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকা স্বাস্থ্য খাতে বাজেটে বেশি বরাদ্দ নিয়ে তা সোয়া ৪১ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। তবে জিডিপির মাত্র শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ। অথচ ৮ম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় বলা হয়েছিল যে জিডিপির ২ শতাংশ থাকবে স্বাস্থ্যের জন্য।’

গরীব মানুষের জন্য স্বাস্থ্য সুবিধা ও সমতার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হলে যেসব বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেয়া উচিত তা বাজেটে অনুপস্থিত বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আব্দুল হামিদ। তিনি বলেন, ‘আগের তুলনায় বাজেট বাড়েনি। মোটা দাগে দেশে দুইটি সেফটি নেট (সহায়ক কর্মসূচি) রয়েছে যেমন স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচি (এসএসকে) এবং মাতৃস্বাস্থ্য স্কিম। এই দুই স্কিমে বাজেট বাড়েনি। মানুষ সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে সেবা নেয়। তবে সেবা নেয়ার ক্ষেত্রে যদি মানুষকে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স ও রোগ নির্ণয় কেন্দ্রের অপর নির্ভর করতে হয় তবে তাতে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে। বর্তমান প্রস্তাবিত স্বাস্থ্য বাজেট দিয়ে অনেক কাজই করা যাবে না। কমিউনিটি ক্লিনিক ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করে তাতে খুব বেশি পরিবর্তনের কথা বলা হয়নি। স্বাস্থ্য বীমা নিয়ে বাজেটে নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি। বর্তমান প্রস্তাবিত স্বাস্থ্য বাজেটে স্বাস্থ্যসেবার সমতা নিশ্চিত করা কঠিন হবে।’

সাবেক স্বাস্থ্য সচিব এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেন, ‘শুধু স্বাস্থ্য নয় সব খাতের বাজেট নিয়েই প্রায় একই রকম আলোচনা হয়। গত এক দশকে স্বাস্থ্য খাতের বাজেট একই রকম। স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বাস্তবায়ন কম এমন অভিযোগ একটু বেশি। কিন্তু যাদের দিয়ে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে তাদের প্রস্তুত করা হচ্ছে না। দেখা যায়, নিয়ম মেনে কেনাকাটা এবং খরচ করা হয়নি এমন অভিযোগ অনেক চিকিৎসকের বিরুদ্ধে হচ্ছে। তাদের সরকারি প্রকিউরমেন্টের বিষয়টির জন্য প্রশিক্ষিত না করে তাদের দায়িত্ব দেয়ায় অনেক সময় অভিযোগ ওঠে। এই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে। অন্যদিকে সহযোগী সংস্থাগুলো থেকে যে অর্থ ঋণ বা অনুদান আসার কথা সেখানেও তাদের নিজস্ব আমলাতন্ত্রের কারণে অর্থ ছাড়ে বিলম্ব হয়। ঠিকাদারদের সঠিক সময় টাকা পরিশোধ করা হয় না। এমন অনেক জটিলতা রয়েছে। এগুলোকে সঠিকভাবে বিবেচনায় নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। অন্যদিকে চাহিদা অনুযায়ী কেনাকাটার ক্ষমতা হাসপাতাল বা প্রতিষ্ঠানের প্রধানের নেই। তিনি কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে অপেক্ষা করেন। এতেও বিলম্ব হয়।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক (হাসপাতাল) ডা. মো. আমিনুল ইসলাম তার বক্তব্যে বলেন, ‘জিডিপিতে স্বাস্থ্য খাতের জন্য বরাদ্দ না বাড়ালে আমরা স্বাস্থ্যে উন্নতি করতে পারব না। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) ও সার্বজনীন স্বাস্থ্য সেবা (ইউএসসি) বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, মা ও শিশু স্বাস্থ্য এবং অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ ও চিকিৎসা। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার প্রাপ্তির সুনিশ্চিত করতে না পারলে এসডিজি অর্জন হবে না। এক্ষেত্রে জনবলের সংকট রয়েছে। গ্রাম ও শহরের মধ্যে বৈষম্য রয়েছে। জনবলকে প্রশিক্ষিত করতে হবে এবং অবকাঠামোর উন্নয়ন করতে হবে। অন্যদিকে মা ও শিশু স্বাস্থ্যের জন্য প্রসব পূর্ব সেবা (এএনসি) ও প্রসব পরিবর্তী সেবা (পিএনসি) নিশ্চিত করতে সীমিত বরাদ্দ কঠিন হবে। একই সঙ্গে এখন অসংক্রামক রোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই অবস্থা অসংক্রামক রোগের সেবা কতটুকু নিশ্চিত করা যাবে তাতে সন্দেহ থাকে। অন্য দিকে চিকিৎসায় রোগীর নিজস্ব ব্যয় দিন দিন বেড়ে চলছে।’