করোনা মহামারীর মধ্যেই নতুন করে ভয়ের কারণ হয়ে উঠছে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী গতকাল সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ৩২ জনের ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তির তথ্য পাওয়া গিয়েছে। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনায় এডিস মশার লার্ভার উত্পত্তিস্থল শনাক্তে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। কোনো কারণে এ অভিযানে ভাটা পড়লেই আবার ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। 

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) বলছে, গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ৩২ জনের ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তির তথ্য পাওয়া গিয়েছে। এর মধ্যে শুধু রাজধানীতেই ভর্তি হয়েছেন ২৬ জন। ঢাকার বাইরে ভর্তি হয়েছেন ছয়জন। চলতি বছর এখন পর্যন্ত আইইডিসিআরে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ছয়টি মৃত্যুর তথ্য এসেছে। তথ্য পর্যালোচনায় এর মধ্যে একটির বিষয়ে নিশ্চিত হতে পেরেছে সংস্থাটি। 

রাজধানীতে এডিস নির্মূলে পরিচালিত অভিযানে কোনো কারণে ভাটা পড়তে দেখা গেলেও মশাটির প্রকোপ বাড়তে দেখা গিয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য বলছে, এডিস মশা নির্মূলে গত ১০ মে থেকে ৫ জুন পর্যন্ত চিরুনি অভিযান পরিচালিত হয়। সে সময় ঢাকা উত্তরে ১ দশমিক ৯৮ শতাংশ স্থানে এডিস মশার লার্ভা ও ৬২ দশমিক ৩০ শতাংশ এলাকায় এডিসের বংশবিস্তার উপযোগী স্থান পাওয়া গিয়েছে। ৬ থেকে ১৪ জুন পর্যন্ত পরিচালিত দ্বিতীয় দফার অভিযানে এডিসের লার্ভা পাওয়া যায় ১ দশমিক ১৯ শতাংশ বাড়িতে। এভাবে পর্যায়ক্রমে অভিযান চালানোর পর আগস্টের মধ্যে তা নেমে আসে দশমিক ৫৩ শতাংশে। এরপর বিরতি দিয়ে ২-১৪ নভেম্বর পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে দেখা যায়, এডিসের লার্ভা জন্ম নেয়ার স্থান শনাক্তের হার বেড়েছে। ওই সময়ে এডিসের লার্ভা শনাক্ত হয়েছে দশমিক ৬৬ শতাংশ স্থানে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল ও এডিস মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. আফসানা আলমগীর খান জানান, চলতি বছরের শুরু থেকে গতকাল পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন সর্বমোট ৯৫৪ জন। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৮৫৬ জন। 

বর্তমানে দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৮৫ জন রোগী। তবে প্রথম দিকের তুলনায় চলতি মাসে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। 

এডিস মশা নির্মূলে পুরো ঢাকাজুড়ে বিশেষ চিরুনি অভিযান পরিচালনা করছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) ও ডিএনসিসি। দুই সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে লার্ভিসাইড স্প্রে করা হলেও স্থায়ীভাবে এডিস মশার লার্ভা বা প্রজনন সহায়ক পরিবেশ ধ্বংস করা যাচ্ছে না। এর কারণ হিসেবে কর্মকর্তারা বলছেন, যত্রতত্র ডাবের খোসা, চিপসের প্যাকেট ও গাড়ির ব্যবহূত টায়ার ফেলে রাখার কারণে সেখানে স্বচ্ছ পানি জমে এডিস মশার লার্ভা ও প্রজনন সহায়ক পরিবেশ তৈরি করছে। এ স্থানগুলো একবার ধ্বংস করে এলেও কয়েক ঘণ্টার মধ্যে নতুন করে ডাবের খোসা, চিপসের প্যাকেট এবং পরিত্যক্ত টায়ারে পানি জমে ফের একই পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। এ কারণেই অভিযানে ভাটা পড়লে এডিস মশার উত্পত্তিস্থলও বেড়ে যাচ্ছে।

করোনা মহামারীর মধ্যে ডেঙ্গু ভয়ের কারণ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। স্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলন সম্পর্কিত জাতীয় কমিটির চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই-মাহবুব বণিক বার্তাকে বলেন, করোনার মতো ডেঙ্গুও একটি ভাইরাসজনিত রোগ। দুটি রোগের লক্ষণও অনেকটা একই। এজন্য একই সময়ে যদি দুই ধরনের ভাইরাসের প্রকোপ চলতে থাকে, সেক্ষেত্রে কিছুটা ভয়ের কারণ রয়েছে। এজন্য আগে থেকেই আমাদের ডেঙ্গু ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমকে আরো শক্তিশালী করে তুলতে হবে। পাশাপাশি রোগীদের মনিটরিং ব্যবস্থাও বাড়াতে হবে। 

চলতি মাসের প্রথম দুই সপ্তাহে ডিএনসিসি পরিচালিত অভিযানে ৪২টি স্থানে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গিয়েছে। পাশাপাশি এডিস মশার প্রজননবান্ধব পরিবেশ পাওয়া গেছে ৫ হাজার ৭৯টি স্থানে। এসব স্থানে এডিসের লার্ভা শনাক্ত হয়েছে ডাবের খোসা, পানির মিটার, রঙের কৌটা, ফুলের টব, বালতি, দইয়ের পাত্র ইত্যাদি দ্রব্যে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি শনাক্ত হয়েছে ডাবের খোসা ও চিপসের প্যাকেটে। এডিস মশা নির্মূল করতে সংশ্লিষ্ট জায়গাগুলোয় লার্ভিসাইড স্প্রে করা হয়েছে। 

মোট ৫৪টি ওয়ার্ডকে ১০টি অঞ্চলে অন্তর্ভুক্ত করে এ অভিযান শুরু করে ডিএনসিসি। সংস্থাটির স্বাস্থ্য বিভাগের হিসাব মতে, মিরপুর ২ নম্বর ও এর আশপাশের এলাকা নিয়ে গঠিত ডিএনসিসির অঞ্চল-২-এর ২ হাজার ৯০টি বাড়ি ও স্থাপনা পরিদর্শন করে ছয়টি স্থানে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গিয়েছে। প্রজনন উপযোগী পরিবেশ পাওয়া গিয়েছে ২৯৩টি স্থানে। 

মহাখালী ও এর আশপাশের ১০টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত অঞ্চল-৩-এ ১ হাজার ৩১৬টি বাড়ি ও স্থাপনায় অভিযান চালিয়ে ১৯টি স্থান থেকে লার্ভা পাওয়া গিয়েছে। পাশাপাশি মশার প্রজনন উপযোগী পরিবেশ মিলেছে ৮৭৫টি স্থানে। এ অঞ্চলের পরিচালিত চিরুনি অভিযানের নেতৃত্ব দেন অঞ্চলটির নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জুলকার নায়ন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, মহাখালী এলাকায় বাস টার্মিনাল থাকায় সেখানে ভ্রাম্যমাণ মানুষের আনাগোনা বেশি। আবার হকারদের উপস্থিতিও অন্যান্য এলাকার চেয়ে বেশি। এজন্য এলাকাটিতে ডাবের খোসা এবং চিপসের অসংখ্য প্যাকেট পড়ে থাকতে দেখা যায়। সেসব খোসা ও প্যাকেটে জমে থাকা স্বচ্ছ পানি এডিস মশার প্রজননে সহায়ক ভূমিকা রাখে। 

মিরপুর ১০ নম্বর ও এর আশপাশের সাতটি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত ডিএনসিসির অঞ্চল-৪। চিরুনি অভিযানে অঞ্চলটির ১ হাজার ৪০৫টি বাড়ি ও স্থাপনা পরিদর্শন শেষে তিনটি স্থানে লার্ভা পাওয়া যায়। পাশাপাশি অঞ্চলটির ৬৮১টি স্থানে মিলেছে এডিস মশার প্রজননবান্ধব পরিবেশ। কারওয়ানবাজার এলাকার নয়টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত ডিএনসিসির অঞ্চল-৫। এ অঞ্চলের ২ হাজার ৩১টি বাড়ি ও স্থাপনা পরিদর্শন করে ১০টি স্থানে লার্ভা পাওয়া গিয়েছে। পাশাপাশি অঞ্চলটির ১ হাজার ৬০২টি স্থানে এডিস মশার প্রজনন সহায়ক পরিবেশ পাওয়া গিয়েছে। 

দক্ষিণখান এলাকার চারটি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত ডিএনসিসির অঞ্চল ৭। এ অঞ্চলের ৭৭৩টি বাড়ি ও স্থাপনা পরিদর্শন শেষে তিনটি স্থানে লার্ভা পাওয়া গিয়েছে। পাশাপাশি এডিস মশার প্রজননবান্ধব ৬৩৪টি স্থান শনাক্ত হয়েছে। ভাটারা ও এর আশপাশের তিনটি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত ডিএনসিসির অঞ্চল-৩-এর ৫২৯টি বাড়ি ও স্থাপনা পরিদর্শন করে একটি স্থানে লার্ভা পাওয়া গিয়েছে। এডিসের প্রজননসহায়ক পরিবেশ মিলেছে ৩২৯টি স্থানে। সাঁতারকুলের চারটি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত ডিএনসিসির অঞ্চল-১০-এর ৭৯৩টি স্থাপনা পরিদর্শন করে কোথাও এডিস মশার লার্ভা পাওয়া যায়নি। তবে ৬৬৫টি স্থানকে এডিস মশার প্রজনন সহায়ক স্থান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। 

ডিএনসিসির মতো ডিএসসিসির ওয়ার্ডগুলোতেও এডিস নির্মূলে চিরুনি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। ডিএসসিসির অন্তর্ভুক্ত ২, ৪, ৮, ৯, ১২, ১৩, ১৪, ১৫, ১৬, ১৮, ২৫, ৩৪, ৪০, ৪১, ৪৫ ও ৫১ নম্বর ওয়ার্ডে এডিস মশার লার্ভা ও প্রজনন সহায়ক পরিবেশ চিহ্নিত করে লার্ভিসাইড স্প্রে করা হয়েছে। ডিএসসিসির স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের দাবি, এলাকা ও স্থাপনার সংখ্যা ডিএসসিসিতে তুলনামূলক বেশি হওয়ায় সেখানে এডিস মশার লার্ভা ও প্রজনন সহায়ক পরিবেশও চিহ্নিত হয়েছে বেশি।