দেশের অন্যতম রফতানিযোগ্য শিল্প চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য। রফতানি আয় আরো বাড়ানোর লক্ষ্যে সাভারের চামড়া শিল্পনগরীর জন্য ১ হাজার ১৫ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছিল। কিন্তু এর পরও সেভাবে দাঁড়াতে পারেনি এ নগরী। উল্টো বর্জ্য ব্যবস্থাপনা যথাযথ না হওয়ায় সাভারের চামড়া শিল্পনগরী বন্ধ করে দেয়ার জন্য গত বছরের আগস্টে সুপারিশ করেছিল সংসদীয় কমিটি। যদিও সে সুপারিশ এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিসিকের পরিকল্পনা ত্রুটির কারণে ডুবছে ট্যানারি শিল্প। অন্যদিকে সাভারে চরম ব্যর্থতার পরও আরো দুটো চামড়া শিল্পনগরী স্থাপনের কাজে হাত দিয়েছে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)।
১৯৫০ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত রাজধানীর হাজারীবাগ ছিল ট্যানারি শিল্পের বৃহৎ ঠিকানা। কিন্তু ট্যানারি শিল্প এলাকায় ছিল না আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। আবার লোকালয়ের কাছে হওয়ায় এর দূষণ বিপর্যস্ত করছিল স্থানীয়দের, দূষিত হচ্ছিল বুড়িগঙ্গা। হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি শিল্প সরাতে ২০০৩ সালে সাভার চামড়া শিল্পনগরীর প্রকল্প হাতে নেয় শিল্প মন্ত্রণালয়। মোট ১২ দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে ১ হাজার ১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি হয় নগরী। ২০১৭ সালে বিসিকের নেতৃত্বে হেমায়েতপুরে স্থানান্তর হয় ট্যানারি শিল্প। কিন্তু তখনো শেষ হয়নি সেন্ট্রাল অ্যাফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্টের (সিইটিপি) কাজ। ফলে সিইটিপি ছাড়াই কাজ শুরু করে ১০০টির বেশি প্রতিষ্ঠান। ট্যানারির দূষিত পানি মিশতে থাকে ধলেশ্বরীতে। নতুন শিল্পনগরীও আগের মতোই দূষণ ছড়াতে থাকে।
সব মিলিয়ে এত বিনিয়োগের পরও চামড়া শিল্পের সফল ক্ষেত্র হিসেবে দাঁড়াতে পারেনি এ নগরী। এমনকি সঠিক পরিকল্পনার অভাবে ব্যবসায়ীদের বিপুল বিনিয়োগও কাজে লাগেনি। উল্টো পরিবেশ দূষণের দায়ে বন্ধ করে দেয়ার জন্য সংসদীয় কমিটি সুপারিশ করেছে। এ বিষয়ে ট্যানারি মালিকরা বলছেন, বিসিকের ভুল পরিকল্পনার খেসারত দিতে হচ্ছে শিল্পটিকে। হাজারীবাগ থেকে সাভারে স্থানান্তরের সময় বিসিকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, পরিবেশবান্ধব শিল্পনগরী নিশ্চিত করা হয়েছে। হেমায়েতপুরে স্থানান্তর হলে ইউরোপের ক্রেতাদের আকৃষ্ট করা যাবে। পাওয়া যাবে লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) সনদও। চামড়ার দামও অনেক বেশি পাওয়া যাবে বলে আশ্বাস দেয়া হয়েছিল। এসব আশ্বাস বিশ্বাস করেই হাজারীবাগ থেকে কারখানা স্থানান্তর করে সাভারে যান তারা। কিন্তু বাস্তবতা এখন ভিন্ন রূপ নিয়েছে।
আরব লেদারের স্বত্বাধিকারী মো. ইলিয়াসুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, আমাদের বলা হয়েছিল সাভারে গেলে ভালো দামে চামড়া বিক্রি করতে পারব, বিদেশী ক্রেতারা আসবে। কিন্তু এখন এমন অবস্থা হয়েছে যে ব্যবসাই বন্ধ হওয়ার পথে।
কেন চামড়া শিল্প সাভারে দাঁড়াতে পারেনি এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিসিক ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প নিয়ে কাজ করে। কিন্তু চামড়া শিল্প কখনই ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের আওতায় পড়ে না। আমাদের একেকটি মেশিনের দামই ২-৫ কোটি টাকা। একটি কারখানা স্থাপন করতে হলে অন্তত ১৫-২০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে হয়। এটা কোনোভাবেই ক্ষুদ্র শিল্প নয়। বৃহৎ শিল্প যদি ক্ষুদ্র শিল্পের পরিকল্পনা দিয়ে চলে, তাহলে সেটা কখনই সফল হতে পারে না। এক্ষেত্রেও তাই হয়েছে।
সাভারের হেমায়েতপুর গিয়ে দেখা যায়, বিসিকের চামড়া শিল্পনগরী ঘিরে রয়েছে নানা অব্যবস্থাপনা। প্রায় ২০০ ট্যানারি কারখানার জন্য কোনো ধরনের ডাম্পিং স্টেশন নেই। যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলে রাখা হয়েছে। শিল্পনগরীর শেষ মাথায় বিশাল চামড়ার স্তূপ। আশপাশে দুর্গন্ধে টেকা দায়। দীর্ঘদিনের চামড়া পড়ে থাকায় নষ্ট হয়ে গেছে মাটিও। দেয়াল ভেঙে গেছে চামড়ার আবর্জনার বিশাল স্তূপের চাপে।
বেশ কয়েকজন চামড়া শিল্প মালিকের সঙ্গে কথা হয় বণিক বার্তার। তারা বলেন, যে আশা নিয়ে সাভারে এসেছিলেন তার কিছুই পূরণ হয়নি। উল্টো চরম ক্ষতির শিকার হয়েছেন তারা। এখানে থিতু হওয়ার জন্য শুরুতেই ৫-১০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন তারা। পরে বিসিক কোনো ধরনের সুবিধা না দিতে পারায় বিপাকে পড়েন শিল্প মালিকরা।
বিসিকের পরিকল্পনায় ভুল ছিল উল্লেখ করে একটি কারখানার স্বত্বাধিকারী বলেন, বিসিকের সিইটিপির ধারণক্ষমতার চেয়েও বেশি পরিমাণ পানি নির্গত হয় কারখানাগুলো থেকে। প্রতিটি কারখানায় যে ড্রেনেজ সিস্টেম রয়েছে, সেটিও অপরিকল্পিত। হাজারীবাগে একেকটি ড্রেনের গভীরতা ছিল চার-পাঁচ ফুট। সাভারে তার অর্ধেকও নেই। ফলে পানিপ্রবাহের ভার সইতে পারছে না ড্রেনগুলো। যখন সিইটিপির নির্ধারিত ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি পানি ছেড়ে দেয়া হয় তখন ময়লা পানি সরাসরি নদীতে ফেলে দেয় সিইটিপির দায়িত্বরতরা। ফলে হাজারীবাগ থেকে যে নদীর দূষণ এড়াতে সাভার এল শিল্পনগরী, সে নদী দূষণ এখানেও হচ্ছে।
বিসিক শিল্পনগরী ব্যর্থ হওয়ার মূল কারণ সম্পর্কে সালমা লেদারের লেদার ইঞ্জিনিয়ার মো. মোস্তফা বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়াজাত পণ্য রফতানির জন্য এলডব্লিউজির সার্টিফিকেট প্রয়োজন। সংস্থাটির সনদ পাওয়ার প্রধান শর্ত হলো আবেদন করা ট্যানারি পরিবেশ দূষণ করতে পারবে না। কিন্তু পরিবেশ দূষণের মাত্রা কমাতে না পারায় সাভার চামড়া শিল্পনগরী এলডব্লিউজির সদস্য হতে পারেনি। ফলে বিদেশী ক্রেতারাও আসেনি, আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়া বিক্রির পরিস্থিতিও তৈরি হয়নি।
হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে গড়া সাভারের চামড়া শিল্পনগরী ব্যর্থ হলেও সফল পার্শ্ববর্তী দেশের কলকাতার বানতলা চামড়া শিল্প কমপ্লেক্স। বাংলাদেশে এলডব্লিউজির সদস্য প্রতিষ্ঠান মাত্র তিনটি। অন্যদিকে ভারতে সংস্থাটি সদস্য পদ পেয়েছে ১৩৯টি। যার বেশির ভাগই কলকাতার বানতলা লেদার কমপ্লেক্সের। ১৯৯৬ সালে ১১৫০ একর জমির ওপর এম এল ডালমিয়া অ্যান্ড কোম্পানির নেতৃত্বে কলকাতার বানতলায় প্রতিষ্ঠিত হয় কলকাতা লেদার কমপ্লেক্স। হাজারীবাগের প্রায় ৫০ বছর পর প্রতিষ্ঠিত বানতলা এখন ভারতের মোট রফতানি চামড়ার ৫০ শতাংশের জোগান দিচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কলকাতার চামড়া শিল্প এগিয়ে যাওয়ার আরেকটি বড় কারণ হলো তাদের নিজস্ব রাসায়নিকের কারখানা আছে। কিন্তু বাংলাদেশে সব ধরনের রাসায়নিক আমদানি করতে হয়। কলকাতায় সরকারি উদ্যোগে এসব রাসায়নিক কারখানা গড়ে উঠেছে। এমনকি সেখানে চামড়া বিষয়ে গবেষণার জন্য একাধিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানও গড়ে উঠেছে।
কলকাতার পানি ও পরিবেশ চামড়া শিল্পের জন্য পুরো ভারতের মধ্যে সবচেয়ে ভালো উল্লেখ করে সাভারের একাধিক ট্যানারি মালিক বলেন, বাংলাদেশের পানি ও পরিবেশ কলকাতার চেয়ে ভালো। এখানে চামড়ার পরিমাণও বেশি। সঠিকভাবে চামড়া শিল্পকে নেতৃত্ব দেয়া গেলে রফতানি আয়ে এটি পোশাক খাতকেও ছাড়িয়ে যেত।
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) চেয়ারম্যান মো. শাহীন আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, কলকাতার ট্যানারি শিল্প এত দ্রুত সফল হওয়ার কারণ ওখানের বেশকিছু কারখানাকে এলডব্লিউজির সদস্য হতে সরকার সহযোগিতা করেছে। যেসব কারখানা তুলানমূলক এগিয়ে ছিল ওইসব কারখানাকে সরকার বিভিন্ন সুবিধা দিয়েছে। কারখানাগুলোর পরিবেশ যেন এলডব্লিউজির মানমাত্রা অনুযায়ী থাকে, সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি দেয়া হয়েছে। নির্দিষ্ট করে বললে, এসব কারখানায় সরাসরি কাঁচা চামড়া প্রক্রিয়া না করে প্রক্রিয়াজাত চামড়া থেকে পণ্য তৈরির ব্যবস্থা করে দেয়া হয়েছে সরকারি উদ্যোগে। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত সনদ পেয়ে গেছে।
মো. শাহীন আহমেদ আরো বলেন, শুরুর দিকে যেকোনো প্রতিষ্ঠানকেই ভুলত্রুটিসহ সুবিধা দিতে হয়। কোনো প্রতিষ্ঠানই শতভাগ সঠিক হয়ে কাজ শুরু করতে পারে না। এক্ষেত্রে যেসব প্রতিষ্ঠান তুলনামূলক কম পরিবেশ দূষণ করছে, মানমাত্রায় অন্যদের চেয়ে এগিয়ে আছে, সরকার চাইলে তাদের পরিবেশ ছাড়পত্র দিতে পারে। কিন্তু এ ব্যাপারে পরিবেশ অধিদপ্তর সহযোগিতা করে না। সাভারে দেড়শর বেশি কারখানা আছে। সবার অবস্থা তো খারাপ না। এগুলোর মধ্যে যারা ভালো করছে, সরকার চাইলে তাদের এগিয়ে নিতে পারে, পরিবেশ অধিদপ্তর ছাড়পত্র দিতে পারে। এলডব্লিউজির মানমাত্রায় আমরা যদি ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ নম্বরও পাই, তবু সনদ পেতে পারি। হয়তো গোল্ডেন বা সিলভার সনদ পাওয়া যাবে না, কিন্তু এলডব্লিউজির জন্য মনোনীত হতে পারাও এ মুহূর্তে বাংলাদেশের চামড়া শিল্পের জন্য অনেক বড় বিষয়।
অন্যদিকে সাভারে নানা ধরনের ভুল পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পর এবার আরো দুটি নতুন চামড়া শিল্পনগরীর পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে বিসিক। সংস্থাটির বার্ষিক প্রতিবেদনে (২০২০-২১) বলা হয়েছে, রাজশাহী ও চট্টগ্রামে আরো দুটি চামড়া শিল্পনগরী স্থাপনের প্রাথমিক কাজ চলমান। ২০১৭ সালের নভেম্বরে এ দুটি চামড়া শিল্পনগরীর পরিকল্পনা হয়। এরই মধ্যে প্রাথমিক সমীক্ষা শেষ হয়ে জমি অধিগ্রহণের কাজ চলছে।
ট্যানারি মালিকরা বলছেন, সাভারে ব্যর্থতার পরও আরো চামড়া শিল্পনগরী তৈরি করা হলে স্রেফ রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়ই হবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিসিকের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেছেন, সাভারে চামড়া শিল্পনগরী দাঁড়াতে না পারার পেছনে বিসিকের যেমন ব্যর্থতা রয়েছে, একই সঙ্গে শিল্প মালিকদেরও গাফিলতি রয়েছে। শিল্প মালিকরা বিসিকের সঠিক নির্দেশনা মানছে না। পানি কখন ছাড়তে হবে, কতটুকু ছাড়তে হবে এ মানমাত্রা তারা না মানার ফলে সিইটিপির ওপর চাপ পড়ে।
অবশ্য সিইটিপির দুর্বলতার কথা স্বীকারও করেছেন একাধিক কর্মকর্তা। সাভারে চামড়া শিল্পের ব্যর্থতার পর নতুন শিল্পনগরীর কাজে হাত দেয়া ঝুঁকিপূর্ণ বলেও মনে করছেন তারা।
সাভারের চামড়া শিল্পনগরী নিয়ে পরিকল্পনায় ভুল ছিল কিনা সে বিষয়ে স্পষ্ট করে কোনো উত্তর দেননি বিসিকের চেয়ারম্যান মুহ. মাহবুবর রহমান। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, বিসিক চামড়া শিল্পনগরী প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আমাদের পরিকল্পনায় ভুল ছিল কিনা বা সামনে ভুল হচ্ছে কিনা এসব তো তাত্ক্ষণিকভাবে বলার বিষয় নয়। কাগজপত্র দেখে যথার্থ অনুসন্ধান করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাতে হবে।










