দেশে জাহাজ নির্মাণ শিল্পের অন্যতম বড় প্রতিষ্ঠান আনন্দ শিপইয়ার্ড অ্যান্ড স্লিপওয়েজ লিমিটেড। ২০০৮ সালে ডেনমার্কে স্টেলা মরিস নামে একটি জাহাজ রফতানি দিয়ে যাত্রা শুরু প্রতিষ্ঠানটির। এরপর ছোট-বড় মিলিয়ে ১১টি জাহাজের রফতানি আদেশ পায় আনন্দ শিপইয়ার্ড। ২০০৮-এ শুরু হওয়া বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার অজুহাতে এসব জাহাজের বেশির ভাগই আর নেয়নি ক্রেতারা। এদিকে ক্রয়াদেশ দেখিয়ে ব্যাংক থেকে নেয়া ঋণও পরিশোধ করতে পারেনি আনন্দ শিপইয়ার্ড অ্যান্ড স্লিপওয়েজ লিমিটেড। প্রায় এক যুগ আগে নেয়া ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতার বোঝা আজও টানছে প্রতিষ্ঠানটি।

আনন্দ শিপইয়ার্ডের মতো প্রায় ৩০০ জাহাজ নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে দেশে। তবে এর মধ্যে রফতানিমুখী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ১০টি। তবে প্রতিষ্ঠানগুলোর সবারই রফতানির অভিজ্ঞতা না থাকলেও এরই মধ্যে গড়ে উঠেছে রফতানি সক্ষমতা। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে ওয়েস্টার্ন মেরিন, কর্ণফুলী ড্রাই ডক, থ্রি অ্যাঙ্গেল, এফএমসি, প্রান্তিক মেরিন, রেডিপয়েন্ট শিপইয়ার্ড, নারায়ণগঞ্জ শিপইয়ার্ড, খুলনা শিপইয়ার্ড ও চিটাগং ড্রাই ডক। গবেষণার তথ্য বলছে, দেশীয় এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে রফতানি হওয়া জাহাজের ৮৯ শতাংশই ওয়েস্টার্ন মেরিনের তৈরি।

জাহাজ নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো স্থানীয় চাহিদা মেটাতে কিছুটা সফলতা পেলেও রফতানিতে সফল হিসেবে মেলেনি কোনো ধরনের স্বীকৃতি। বরং পর্যাপ্ত সম্পদ থাকা সত্ত্বেও জাহাজ নির্মাণের নামে নেয়া ঋণ পরিশোধ না করতে পারার পাশাপাশি অন্য খাতে ঋণের টাকা খাটানো, অর্থ পাচার ও বিলাসবহুল জীবনযাপনে ঋণের এ অর্থ ব্যবহারের অভিযোগ আছে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের নামে। এর আগে বণিক বার্তার অনুসন্ধানে জাহাজ নির্মাণ শিল্পে ব্যাংকের বিনিয়োগকৃত অর্থ প্রাসাদোপম ভবন নির্মাণে ব্যয় করার তথ্যও উঠে এসেছে। সব মিলিয়ে দেশে জাহাজ নির্মাণকারীর প্রতিষ্ঠানগুলোর সফলতার চেয়ে এখন পর্যন্ত ব্যর্থতাই বেশি দৃশ্যমান।

জাহাজ নির্মাণ শিল্পে সম্ভাবনা বিবেচনায় বাংলাদেশের ব্যর্থতার পাল্লা তুলনামূলক ভারী হলেও এখনো খাতটিতে যথেষ্ট উন্নতির সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছেন নীতিনির্ধারকরা। এরই মধ্যে এ-সংক্রান্ত একটি নীতিমালার খসড়াও তৈরি করেছে শিল্প মন্ত্রণালয়। খাতসংশ্লিষ্টদের মতামত গ্রহণ শেষে দ্রুতই এ নীতিমালা মন্ত্রিসভার অনুমোদনের জন্য পাঠানোর অপেক্ষায় আছে। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নীতিমালাটি জাহাজ নির্মাণ শিল্পের সম্ভাবনা বিকাশের সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে মন্তব্য করেছেন শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব সালাহউদ্দিন মাহমুদ।

তবে জাহাজ নির্মাণ খাতের বিদ্যমান উদ্যোক্তাদের বাণিজ্যিক পারদর্শিতার ঘাটতি ও অর্থায়নের বিরূপ অভিজ্ঞতার আলোকে নীতিমালার অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের। তাদের দাবি সম্ভাবনা বিকাশে নীতিমালার মাধ্যমে পৃষ্ঠপোষকতা যেমন জরুরি, তেমনি সুযোগসন্ধানী উদ্যোক্তাদের কৃচ্ছ সাধন ঠেকাতে নিয়ন্ত্রণমূলক প্রস্তুতিও গ্রহণ করা প্রয়োজন। আর তা না হলে পরীক্ষিত ব্যর্থরাই আবারো সুযোগ নেয়ার আশঙ্কা থেকে যাবে বলে মনে করছেন তারা। 

নীতিমালা তৈরির উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হয়েছে, পঞ্চদশ থেকে সপ্তদশ শতকে এশিয়া মহাদেশে সমুদ্রগামী জাহাজ নির্মাণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয় বাংলাদেশ। আর আধুনিক জাহাজ রফতানির কার্যক্রম শুরু হয় ২০০৮ সালে। ওই সময় থেকে ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়ার কয়েকটি দেশে ১৮ কোটি ডলারের ৪০টি জাহাজ রফতানি করে দেশের জাহাজ নির্মাণ শিল্পের ভাবমূর্তি উন্নত হয়েছে বলে মনে করছে সরকার। এছাড়া সমুদ্র অর্থনীতি ও স্থানীয় নৌপরিবহন খাতের চাহিদা পূরণে জাহাজ নির্মাণ শিল্প উন্নয়ন নীতিমালা ২০২০-এর খসড়া প্রণয়ন করা হয়েছে। 

নীতিমালা অনুযায়ী, সরকারের সহযোগিতা পেলে আগামী পাঁচ বছরে জাহাজ রফতানির মাধ্যমে বার্ষিক আয় হতে পারে ৪০০ কোটি ডলার। বর্তমানে নিয়োজিত ৩০ হাজার কর্মসংস্থান বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় এক লাখে। সার্বিকভাবে জাহাজ নির্মাণের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে বিশেষ ব্যাংকিং সুবিধার কথা বলা হয়েছে নীতিমালার খসড়ায়। এ খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোকে টিকিয়ে রাখার লক্ষ্যে প্রদেয় ঋণের সুদের হার ৪ শতাংশ করে ২৫ বছর মেয়াদে পরিশোধের সুযোগ প্রদান ও নীতিমালাটি দ্রুততার সঙ্গে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

খসড়া নীতিমালায় ব্যাংকিং সুুবিধার পাশাপাশি রাজস্ব প্রণোদনার বিষয়েও উল্লেখ রয়েছে। সরকারের অবকাঠামো উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে বর্তমানে নিয়োজিত বা রফতানিমুখী জাহাজ নির্মাণকারী শিপইয়ার্ডগুলোকে ১০ বছরের জন্য ট্যাক্স হলিডে সুবিধাও প্রদানের সুযোগ রাখা হয়েছে নীতিমালায়। জাহাজ নির্মাণ শিল্পের উন্নয়নে থাকছে ৫ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল। আর প্রদেয় ঋণ পরিশোধে পাঁচ বছর মোরাটরিয়ামসহ ২৫ বছর সময় পাবেন উদ্যোক্তারা। স্বল্প খরচে সার্বভৌম ব্যাংক গ্যারান্টির জন্য নন-ফান্ডেড ৫০০ কোটি টাকার সঞ্চিত তহবিলের সংস্থান রাখা হয়েছে এ নীতিমালায়।

দেশের আর্থিক ও ব্যাংকিং খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের জাহাজ নির্মাণ ইতিহাস অনেক পুরনো হলেও সাম্প্রতিক কালে খাতের বৈশ্বিক বিপর্যয়ের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে অদক্ষ ও উদ্যোক্তাদের লোভের মানসিকতার কারণে নীতিমালার আওতায় নিয়ন্ত্রণ কাঠামো প্রতিষ্ঠা বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। এ খাতে অনেক প্রতিষ্ঠান থাকলেও আনন্দ শিপইয়ার্ড ও ওয়েস্টার্ন মেরিন ছাড়া রফতানিতে তেমন উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ দেখা যায়নি। যদিও হাজার কোটি টাকার ব্যাংকিং সুবিধা নিয়ে ওই প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসায়িক অদূরদর্শিতা ও ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতায় মন্দ ঋণ বেড়েছে ব্যাপক হারে। তার পরও এ খাতের সম্ভাবনা কাজে লাগানো প্রয়োজন আছে। তবে তা দক্ষ ও যোগ্য উদ্যোক্তারা পাচ্ছেন কি না, সে বিষয়ে নজরদারির মাধ্যমে নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছেন তারা।

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, জাহাজ নির্মাণ শিল্পের ব্যর্থতায় এরই মধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে ঋণ পরিশোধের দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা দেয়া হয়েছে। এ খাতে অন্যতম দুটি প্রতিষ্ঠান হলো ওয়েস্টার্ন মেরিন ও আনন্দ শিপইয়ার্ড। এ দুটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোনো নাম রফতানির ক্ষেত্রে শোনা যায় না। এ খাতে সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক বিপর্যয় যেমন আছে, তেমনি আমাদের স্থানীয় উদ্যোক্তাদের ব্যবসা ও আর্থিক দিকগুলোর পরিচালন দক্ষতাও প্রশ্নবিদ্ধ। সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এসব অভিজ্ঞতার পরও নীতিমালার মাধ্যমে এ খাতের পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজন আছে। তবে অবশ্যই তা হতে হবে ভালো উদ্যোক্তা বা গ্রাহকের জন্য। ব্যাংকারদেরও এ বিষয়ে সতর্ক হতে হবে।

জাহাজ নির্মাণ খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখন পর্যন্ত জাহাজ রফতানিতে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা যেমনই হোক, তার জন্য দায়ী সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা নন। কারণ ২০০৮ সাল-পরবর্তী বৈশ্বিক মন্দায় ওই সময়ে অনেক ক্রেতাই ক্রয়াদেশ দিলেও জাহাজ কিনতে ব্যর্থ হয়। ফলে ঋণ পরিশোধ অনিয়মিত হয়ে পড়ে জাহাজ নির্মাণকারী উদ্যোক্তাদের। ওই সময়ে ব্যাংকঋণের সুদের হারও ছিল ১৪ শতাংশের ওপরে। সার্বিক প্রভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে জাহাজ নির্মাণ খাতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ। আবার এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যসংক্রান্ত চুক্তি গ্রহণের ক্ষেত্রে উদ্যোক্তার অদক্ষতা, অসৎ উদ্দেশ্যর মতো আরো নানা কারণে এ খাতের অগ্রযাত্রা হুমকির মুখে পড়ে। তার পরও এ খাতের সম্ভাবনা টিকিয়ে রাখতে সরকারের নীতিসহায়তার বিকল্প নেই বলে দাবি জানিয়েছেন তারা। 

কর্ণফুলী শিপইয়ার্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার আবদুর রশিদ এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়ার দেশে জাহাজ রফতানি করে বাংলাদেশের শিপইয়ার্ডগুলো ভালো একটি অবস্থান তৈরি করেছে। কিন্তু এ খাতেরই প্রতিষ্ঠিত কিছু উদ্যোক্তা বড় অংকের ঋণ নিয়ে তা ফেরত না দেয়ার মতো ঘটনাগুলো ব্যাংকিং খাতে এক ধরনের আস্থাহীনতা তৈরি করেছে। এ কারণে এ শিল্পে এখন নতুন করে ঋণ দিতে অনাগ্রহ রয়েছে ব্যাংকগুলোর। সম্ভাবনাময় এ শিল্প খাত এগিয়ে নিতে জাহাজ নির্মাণ শিল্প উন্নয়ন নীতিমালার পদক্ষেপটি এখন কোন পর্যায়ে আছে, তাও সঠিক বলতে পারছি না। অবশ্য করোনা পরিস্থিতিতে বাইরের দেশে রফতানি প্রক্রিয়া বেশ ভালোভাবেই হোঁচট খেয়েছে। দেশের অভ্যন্তরেই সরকারের চলমান প্রকল্পগুলোতে জাহাজ নির্মাণে কিছু কাজ হচ্ছে শিপইয়ার্ডগুলোতে।

বণিক বার্তার তথ্যানুুসন্ধান বলছে, রফতানির উদ্দেশ্যে ২০০৮ সালে বাংলাদেশে আসা জাহাজের ক্রয়াদেশগুলোর চুক্তিও ছিল দুর্বল। যার সুযোগ নিয়ে জাহাজের শীর্ষ ক্রেতা জার্মানি ও ডেনমার্কের হিলডা ব্রান ও ওয়াইজেরিটা জাহাজ নিতে অস্বীকৃতি জানায়। কারণ হিসেবে তারা ব্যাংক গ্যারান্টিতে উল্লেখ করা সময় পেরিয়ে যাওয়ার কথা বলে। জাহাজের শীর্ষ ক্রেতাদের মধ্যে হিলডা ব্রান ছাড়াও আছে ওয়েসেলস, ইআরই শিপিং, ওয়াইজেরিটা, ব্লু লাইন ও মার্সক লাইন। প্রতিষ্ঠানগুলোকে জাহাজ কিনতে অর্থায়ন করে এইচএসএইচ নর্ড ব্যাংক। ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাবে ওই ব্যাংকও ব্যাপক ক্ষতির শিকার হয়। মন্দাপরবর্তী সময় থেকে ক্রমেই জাহাজের চাহিদা কমতে থাকে। গত কয়েক বছরে এ শিল্পের রফতানি সম্ভাবনা আবারো ফিরে আশার প্রত্যাশা দেখা গেলেও বর্তমান কভিড-১৯ প্রেক্ষাপটে তা আবার ফিকে হতে শুরু করেছে। 

আনন্দ শিপইয়ার্ড অ্যান্ড স্লিপওয়েজ লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক ড. তারিকুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ২০০৮ সালপরবর্তী বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা ছিল জাহাজ নির্মাণ শিল্পে আনন্দ শিপইয়ার্ডের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর বিপর্যস্ত পরিস্থিতির কারণ। প্রত্যেকটি শিল্পের শুরুতে একটি ধাক্কা খাওয়া স্বাভাবিক। নীতিনির্ধারকদের দেখতে হবে সংশ্লিষ্টদের কোনো খারাপ উদ্দেশ্য ছিল কিনা। পরিস্থিতির শিকার হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত বা বিপদগ্রস্ত হলে সবার সহযোগিতা করা দরকার। বিশেষ করে জাহাজ নির্মাণের মতো সম্ভাবনাময় শ্রমঘন এবং বাংলাদেশের জন্য তুলনামূলক নতুন শিল্প হিসেবে এ খাতে নীতিগত সহায়তা খুবই প্রয়োজন।