স্বাধীনতার পর দেশে গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম সবচেয়ে জোরালো হয় নব্বইয়ের দশকে। এ সময়ই উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের আবিষ্কার হয় সবচেয়ে বেশি। এখন পর্যন্ত দেশে গ্যাসের উত্তোলনযোগ্য মজুদ শনাক্ত হয়েছে প্রায় ৩০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ)। এর মধ্যে নব্বইয়ের দশকেই আবিষ্কার হয়েছিল প্রায় ১০ টিসিএফ বা এক-তৃতীয়াংশ। অনুসন্ধান ও উত্তোলনযোগ্য মজুদ আবিষ্কারের দিক থেকে নব্বইয়ের দশককেই গ্যাস খাতের উজ্জ্বলতম সময় হিসেবে দেখছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। তাদের ভাষ্যমতে, এর পরের দশকগুলোয় গ্যাসের চাহিদা ও উত্তোলন বাড়লেও অনুসন্ধান-আবিষ্কারে তেমন কোনো বিনিয়োগ হয়নি। বরং খাতটি নিয়ে এক ধরনের সিদ্ধান্তহীনতা ও ত্রুটিযুক্ত প্রাক্কলনের প্রবণতা দেখা গেছে। এছাড়া জ্বালানি খাতে দক্ষতার অভাব দেখা দেয়ার পাশাপাশি বিদেশী বিনিয়োগ বন্ধ হয়ে পড়া এবং রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি বাপেক্সকে কাজে লাগাতে না পারায় গ্যাস খাতের সম্ভাবনাগুলোকে কাজে লাগানো যায়নি। বরং দেশে গ্যাসের চাহিদা পূরণের জন্য এক পর্যায়ে এলএনজি আমদানি শুরু ও পরে এর ওপর নির্ভরতা বাড়াতে হয়েছে।
নব্বইয়ের দশককে দেশের গ্যাস খাতের টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে দেখছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক বদরূল ইমাম। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘স্বাধীনতাপরবর্তী গ্যাসের আবিষ্কার-অনুসন্ধান সবচেয়ে বেশি হয়েছিল নব্বইয়ের দশকে। সেই সময় বিদেশী কোম্পানি শেভরনের অনুসন্ধানে বিবিয়ানা গ্যাস ফিল্ড আবিষ্কার হয়। সেখানে বড় মজুদ পাওয়া যায়। দেশের গ্যাস খাতের মজুদ ও উন্নয়নে এটা ছিল একটা টার্নিং পয়েন্ট। ওই দশকে বিদেশী কোম্পানিগুলোর তৎপরতার পাশাপাশি পেট্রোবাংলা ও বাপেক্স শাহবাজপুরের মতো বড় গ্যাস ফিল্ড আবিষ্কার করে। গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রমে বিদেশী ও স্থানীয় কোম্পানিগুলোর আগ্রহ ছিল অনেক বেশি।’
দেশে এ পর্যন্ত ২৯টি গ্যাস ফিল্ড আবিষ্কার হয়েছে। এর মধ্যে নব্বইয়ের দশকে (১৯৯০ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত) দেশের স্থলভাগ ও সাগরে মোট সাতটি গ্যাস ফিল্ড আবিষ্কার হয়। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুসারে, এসব গ্যাস ফিল্ডে মোট মজুদ ৯ হাজার ৯০৩ বিলিয়ন ঘনফুট (বিসিএফ) বা ৯ দশমিক ৯ টিসিএফ (১ টিসিএফ = ১ হাজার বিসিএফ)। গ্যাস ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে সাঙ্গু বাদে বাকি ছয়টি এখন সক্রিয় আছে। জাতীয় গ্রিডে মোট সরবরাহে এ ছয় গ্যাস ফিল্ডের অবদান এখন ৪৩ শতাংশ।
নব্বইয়ের দশকেই দেশের সবচেয়ে বড় গ্যাস ফিল্ড আবিষ্কৃত হয়। মার্কিন কোম্পানি শেভরন ১৯৯৮ সালে বিবিয়ানা গ্যাস ফিল্ড আবিষ্কার করে। এ গ্যাস ক্ষেত্রে মজুদ আবিষ্কার হয় (থ্রি-পি অনুযায়ী) ৭ হাজার ৮৪ বিসিএফ বা সাত টিসিএফের বেশি। দেশে গ্যাসের জাতীয় গ্রিডে গ্যাস ক্ষেত্রটির অবদান ৪০ শতাংশের কাছাকাছি। পেট্রোবাংলার সর্বশেষ গ্যাস উত্তোলন ও সরবরাহ প্রতিবেদন অনুসারে, জাতীয় গ্রিডে গতকাল গ্যাসের সরবরাহ হয়েছে ২ হাজার ৬৬০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে শুধু বিবিয়ানা থেকেই সরবরাহ হয়েছে ১ হাজার ৩১ মিলিয়ন ঘনফুট।
বিবিয়ানা বাদে বাকি ছয় গ্যাস ক্ষেত্রে আরো প্রায় তিন হাজার বিসিএফের (তিন টিসিএফ) মতো গ্যাস মজুদ আবিষ্কার হয়েছে। এর মধ্যে মৌলভীবাজার গ্যাস ফিল্ড আবিষ্কার হয় ১৯৯৭ সালে। সেখানে গ্যাসের মজুদ পাওয়া যায় ৮১২ বিসিএফ। ১৯৯৬ সালে সাগরের সাঙ্গু গ্যাস ফিল্ডে পাওয়া যায় ৬৩৯ বিসিএফ গ্যাস। ১৯৯৫ সালে ভোলার শাহবাজপুর গ্যাস ক্ষেত্রে প্রায় ৬৪৩ বিসিএফ গ্যাসের সন্ধান পায় স্থানীয় কোম্পানি বাপেক্স। সালদা নদী গ্যাস ফিল্ডে ১৯৯৬ সালে আবিষ্কৃত হয় ৩২৭ বিসিএফ গ্যাস। নরসিংদী গ্যাস ফিল্ড আবিষ্কার হয় ১৯৯০ সালে। সেখানে গ্যাস পাওয়া যায় ২৯৯ বিসিএফ। মেঘনা গ্যাস ফিল্ডে একই বছর আবিষ্কার হয় ১০১ বিসিএফ। গ্যাস ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে এখন উৎপাদনে নেই শুধু সাঙ্গু। সাগরবক্ষের একমাত্র গ্যাস ফিল্ডটি ২০১৩ সালের অক্টোবরে নিঃশেষ ও পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। সেখানে ৬৩৮ বিসিএফ গ্যাসের মজুদ আবিষ্কার হলেও উত্তোলন হয়েছে ৪৯০ বিসিএফের মতো।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক ম. তামিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ষাটের দশকের পর বাংলাদেশে নব্বইয়ের দশকে সবচেয়ে বড় আবিষ্কার বিবিয়ানা গ্যাস ফিল্ড। এটি ওই সময়ের এক বড় আবিষ্কার। পরে পেট্রোবাংলা ও বাপেক্স যেসব গ্যাস ফিল্ড আবিষ্কার করেছে সেগুলো সে অর্থে গুরুত্ব পায়নি। সেগুলো খুব ছোট গ্যাস ক্ষেত্র। ১৯৯৯ সালের পরেই সব স্থবির হয়ে পড়ে। দেশে এখন গ্যাসের সরবরাহ কমে যাচ্ছে। জ্বালানি বিভাগ কীভাবে সরবরাহ করবে তা নিয়ে সব সময় দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে থেকেছে। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির প্রয়োজন নেই এমনটি বলছি না। কিন্তু সমান্তরালভাবে দেশীয় উৎপাদন কেন বাড়ানো হলো না, সেটি খুবই রহস্যজনক। পেট্রোবাংলার নেতৃত্ব এখানে ব্যর্থ হয়েছে। মাটির নিচে গ্যাসের কেমন মজুদ আছে, তা কীভাবে উত্তোলন করতে হবে, কীভাবে বিনিয়োগ করতে হবে, সে ধরনের জ্ঞানসম্পন্ন বা টেকনিক্যাল নেতৃত্বের অভাব আছে। তারা সরকারকে একই সঙ্গে ঝুঁকি ও আশা দেখিয়ে বড় কোনো বরাদ্দও নিতে পারেনি। আর আমদানির ক্ষেত্রে দালালি, কমিশন বাণিজ্য এসব তো আছেই।’
পেট্রোবাংলার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর তৎপরতা সবচেয়ে বেশি দেখা যায় নব্বইয়ের দশকে। পিএসসি (প্রডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট) চুক্তির আওতায় ওই দশকে দুটি দরপত্র আহ্বান করা হয়। এ দুই দরপত্রের আওতায় সে সময় পাঁচটি গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কার হয়। এর মধ্যে একটি আহ্বান করা হয় ১৯৯৩ সালে। অন্যটি ১৯৯৭ সালে। এ দুই দরপত্রের ভিত্তিতে কয়েকটি বহুজাতিক কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি সই করে পেট্রোবাংলা। এর মধ্যে ১৯৯৩ সালের দরপত্রের মাধ্যমে আটটি ব্লকে গ্যাস অনুসন্ধানে কোম্পানিগুলোর সঙ্গে চুক্তি হয়। পিএসসির আওতায় ১২, ১৩ ও ১৪ নম্বর ব্লকে গ্যাস অনুসন্ধানের চুক্তি করে মার্কিন কোম্পানি অক্সিডেন্টাল। ১৫ ও ১৬ নম্বর ব্লকে তৎকালীন হল্যান্ডভিত্তিক গ্যাস অনুসন্ধান কোম্পানি কেয়ার্ন এনার্জির সঙ্গে চুক্তি হয় পেট্রোবাংলার। এছাড়া ১৭ ও ১৮ নম্বর ব্লকে রেক্সউড অকল্যান্ড এবং ১২ নম্বর ব্লকে ইউনাইটেড মেরিডিয়ানের সঙ্গে চুক্তি হয় রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাটির।
পিএসসির আওতায় চারটি ব্লকে গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য ১৯৯৭ সালে আন্তর্জাতিক একটি দরপত্র আহ্বান করে পেট্রোবাংলা। এতে ৫ নম্বর ব্লকে যৌথভাবে শেল ও কেয়ার্ন এনার্জি, ৭ নম্বর ব্লকে ইউনোকল, ৯ নম্বর ব্লকে তাল্লোর সঙ্গে শেভরন-টেক্সাকো এবং ১০ নম্বর ব্লকে শেল ও কেয়ার্ন এনার্জি যৌথভাবে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান করে। এর আওতায় ৯ নম্বর ব্লকে আবিষ্কার হয় বাঙ্গুরা গ্যাস ক্ষেত্র। তাল্লোর আবিষ্কৃত ওই গ্যাস ক্ষেত্রে ১ হাজার ১০০ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যায়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নব্বইয়ের দশকেই দেশে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে দেশী ও বিদেশী কোম্পানিগুলোর তৎপরতা ছিল সবচেয়ে বেশি। ওই সময় বিদেশী তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলো বাংলাদেশের গ্যাস খাতে বিনিয়োগকে প্রবল সম্ভাবনাময় হিসেবে দেখছিল। সমন্বিত পরিকল্পনা, বিবিয়ানা গ্যাস ফিল্ড আবিষ্কারসহ স্থানীয় কোম্পানিগুলোর কাজের ক্ষেত্রও সে সময় সম্প্রসারিত হয়েছিল বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
১৯৯৮ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত পেট্রোবাংলার শীর্ষ কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেছিলেন খন্দকার সালেক সুফি। বর্তমানে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরামর্শক হিসেবে কাজ করছেন। নব্বইয়ের দশকে গ্যাসের অনুসন্ধান ও আবিষ্কারের বিষয়ে জানতে চাইলে এ বিশেষজ্ঞ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নব্বইয়ের দশকে গ্যাসের মজুদ ও অনুসন্ধান কার্যক্রমের পেছনে কাজ করেছিল মূলত সমন্বিত পরিকল্পনা। সেই সময় গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নে সমন্বিতভাবে কাজ করতে গিয়েছিল। বিশেষ করে পেট্রোবাংলা অনুসন্ধান কার্যক্রমে উন্মুক্তভাবে কাজ করতে পারত। আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হলে ৪০-৫০ কোম্পানি দরপত্রে (বিডিং) অংশ নিত। বড় গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কার হলে গ্যাস রফতানি করা যাবে না, এমন বিষয়গুলো যখন সামনে এল তখন বিদেশী কোম্পানিগুলো বিমুখ হলো। পরে বিভিন্ন সময়ে পেট্রোবাংলার ক্ষমতা নানাভাবে খর্ব হয়। সংস্থাটির দক্ষ অনেক মানুষের কাজের সুযোগ কমে যায়। আমদানিনির্ভরতা বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়। যে কারণে পরবর্তী সময়গুলো গ্যাসের বড় অনুসন্ধান ও আবিষ্কারে কোনো সুফলই পাওয়া যায়নি।’
দেশে গ্যাস অনুসন্ধানে ২০০০ সালের পর গত দুই দশকের বেশি সময় বড় কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি বলে মনে করেন খাতসংশ্লিষ্টরা। এ সময়ে সাতটি গ্যাস ফিল্ড আবিষ্কৃত হলেও এসব ফিল্ডে গ্যাসের মজুদ পাওয়া গেছে মোট দেড় টিসিএফের কিছু বেশি। গ্রিডেও এসব ফিল্ডের উৎপাদন যৎসামান্য। যদিও জ্বালানি বিভাগ ২০২২ সালের প্রথমার্ধের পর গ্যাস অনুসন্ধানে ৪৬টি গ্যাসকূপ খননের উদ্যোগ নিয়েছে। যার সময়সীমা নির্ধারিত রয়েছে ২০২৫ সাল পর্যন্ত। যদিও এসব কূপের মধ্যে এখন পর্যন্ত ১০টি কূপের খনন, ওয়ার্কওভার কাজ শেষ হয়েছে। যেখান থেকে প্রত্যাশিত আকারে গ্রিডে গ্যাস যুক্ত হয়নি। নতুন করে আরো ১০০টি কূপ খননের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, যা ২০২৮ সালের মধ্যে খনন করা হবে।
নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে জ্বালানি বিভাগের শীর্ষ এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম বিভিন্ন সময়ে ছিল। কখনো বৃহৎ, কখনো স্বল্প। বর্তমানে ৪৬টি কূপ খনন করা হচ্ছে। আরো ১০০টি খনন করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ফলে চেষ্টা যে একদমই হয়নি, উদ্যোগ ছিল না, সেটি বলা যাবে না। তবে অযৌক্তিক পরিকল্পনার কারণে অনুসন্ধান কার্যক্রম গতি পায়নি, সেটি অস্বীকার করারও কোনো উপায় নেই। কখনো কখনো আমদানিনির্ভরতা বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে।’
হাইড্রোকার্বন বিভাগের তথ্য অনুসারে, দেশে ২০২২-২৩ অর্থবছর পর্যন্ত গ্যাসের মজুদ পাওয়া গেছে ৪০ দশমিক শূন্য ৯ টিসিএফ। এর মধ্যে উত্তোলনযোগ্য মজুদ ২৯ দশমিক ৯৩ টিসিএফ। চলতি অর্থবছর পর্যন্ত উত্তোলন হয়েছে ২০ দশমিক ৩৫ টিসিএফ। মজুদ থাকার কথা ৯ দশমিক ৫৭ টিসিএফ। তবে এর মধ্যেই আরো প্রায় ৫০০ বিসিএফের বেশি গ্যাস উত্তোলন করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।










