ভোলা সদর উপজেলার তুলাতলী ঘাটে গড়ে উঠেছে ইলিশের বড় হাট। মেঘনার-তীরবর্তী এ হাট চলাকালে দেখা যায়, কিছুক্ষণ পরপর নদীর তীরে এসে ভিড়ছে ইলিশ বোঝাই জেলে নৌকা। ঝুড়ি ভর্তি করে এনে এসব ইলিশ রাখা হয় স্তূপ করে। শুধু জেলে নয়, এ ইলিশের স্তূপকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে হাটের পাইকার, আড়তদার, দাদনদার, খুচরা ব্যবসায়ীসহ আরো অনেকের জীবিকা। তুলাতলী হাটে কবে এভাবে ইলিশ বেচাকেনা শুরু হয়েছে, তা বলতে পারছেন না কেউই। যদিও কারো কারো মতে হাটটির বয়স শতবর্ষের কম নয়। একসময় হাটের ব্যবসায়ীরা বেচাকেনা করতেন মাটি বা মেঝেতে বসে। এখন সেখানে গড়ে উঠেছে পরিপূর্ণ এক বাজার অবকাঠামো।

ভোলায় তুলাতলীর মতো এমন বেশকিছু হাট গড়ে উঠেছে, যেখানে প্রধান পণ্য ইলিশ। মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন জেলাটিই এখন দেশে ইলিশের সবচেয়ে বড় উৎস। বঙ্গোপসাগর, মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীর মোহনায় গড়ে ওঠা জেলাটিকে এখন কেউ কেউ অভিহিত করছেন ইলিশের খনি হিসেবে। মেঘনা নদীর নিম্ন অববাহিকা অঞ্চলে যত ইলিশ পাওয়া যায়, তার অর্ধেকই ধরা পড়ে ভোলার জলসীমায়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বুড়িগঙ্গা থেকে চাঁদপুর পর্যন্ত দূষণের মাত্রা বেশি হওয়ায় এর মধ্যবর্তী নদ-নদীগুলোয় এখন ইলিশ আসে কম। অন্যদিকে ভোলা জেলার আশপাশে এ দূষণের মাত্রা কম। পাশাপাশি এখানে মেঘনা ও তেঁতুলিয়ায় গড়ে উঠেছে ইলিশের অভয়াশ্রম। এ কারণে জেলাটি এখন হয়ে উঠেছে সাগর থেকে আসা ইলিশের সবচেয়ে বড় বিচরণক্ষেত্র।

ভোলায় এখন শুধু ইলিশ মাছকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে কয়েক ডজন বাজার। এর মধ্যে তুলাতলীর হাট, কোরার হাট মাছের মোকাম, বিশ্বরোড মাছের ঘাট, জংশন এলাকার মাছঘাট, ইলিশা মাছঘাট, তেঁতুলিয়ার ভেদুরিয়া মাছঘাট, শান্তির হাটের মাছঘাট, দৌলতখান উপজেলার পাতার খাল, চরফ্যাশনের সামরাজ মাছঘাট ইত্যাদি। ইলিশের মৌসুমে এসব হাটের মোকামে মৎস্য শিকারি ও সংশ্লিষ্ট পেশার লোকজনের ভিড় থাকে চোখে পড়ার মতো।

মৎস্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে সবচেয়ে বেশি ইলিশ আহরিত হয় মেঘনার নিম্ন অববাহিকার অঞ্চল থেকে। এ অঞ্চলে নদীটিতে বছরে ইলিশ ধরা পড়ে প্রায় ১ লাখ ৭৭ হাজার ২৫৪ টন। এর মধ্যে শুধু ভোলায়ই আহরিত হচ্ছে ৮১ হাজার ১৬২ টন। এছাড়া এ অঞ্চলভুক্ত এলাকাগুলোর মধ্যে নোয়াখালী জেলায় ৯ হাজার ৩৮৭ টন, বরিশালে ৩৪ হাজার ৩০, লক্ষ্মীপুরে ২০ হাজার ৮২৫, চাঁদপুরে ৩০ হাজার ৬৪৮ ও শরীয়তপুরে ১ হাজার ১৬৬ টন ইলিশ আহরিত হচ্ছে। অন্যদিকে পদ্মার নিম্ন অববাহিকায় মোট ইলিশ আহরিত হয় ৫ হাজার ২৭৯ টন। এর মধ্যে শরীয়তপুরে ২ হাজার ৩৮৪ ও মানিকগঞ্জে ১ হাজার ১৪০ টন ইলিশ ধরা পড়ছে।

বিশ্বব্যাপী মৎস্যসম্পদকে কাজে লাগিয়ে ক্ষুধা ও দারিদ্র্য বিমোচনে কাজ করে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়ার্ল্ডফিশ। সংস্থাটির ইলিশ গবেষণা প্রকল্প ইকোফিশ বিডির টিম লিডার ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আবদুল ওহাব মনে করছেন, ভূপ্রাকৃতিক গঠনসহ বেশকিছু কারণে ভোলা এখন নদীতে আহরিত ইলিশের সবচেয়ে বড় জোগানদাতা জেলায় পরিণত হয়েছে।

বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, দেশে ইলিশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভয়াশ্রম ও প্রজনন কেন্দ্র ভোলা জেলায়ই রয়েছে। জেলায় মেঘনা নদীর প্রায় ৯৮ কিলোমিটার ও তেঁতুলিয়া নদীর প্রায় ১০০ কিলোমিটার এলাকায় ইলিশ অভয়াশ্রম রয়েছে। পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগে এখানকার জেলেদের মধ্যে সচেতনতাও বেড়েছে। ফলে নিষিদ্ধ সময়ে তারা মাছ ধরতে নিরুৎসাহিত হচ্ছে। ভোলাকে ইলিশের অভয়ারণ্য হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সরকারের সচেতনতা কার্যক্রমে এখানকার মানুষ অংশগ্রহণ করেছে।

ইকোফিশ বিডি ছাড়াও সরকারি-বেসরকারি কয়েকটি সংস্থা এখন ভোলায় ব্যাপকভাবে ইলিশ রক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ইলিশ ব্যবস্থাপনায় জনগণকে সম্পৃক্ত করায় স্থানীয়রাই এখন স্বতঃস্ফূর্তভাবে মাছটির সংরক্ষণ নিশ্চিত ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছেন। জেলায় চালু হয়েছে কমিউনিটি ফিশগার্ড ব্যবস্থা। এ কমিউনিটি ফিশগার্ডের সদস্যরা মা-মাছ রক্ষা ও জাটকা নিধনসহ অবৈধ জালের বিস্তার রোধে স্বেচ্ছায় পাহারা কার্যক্রম চালাচ্ছেন। এছাড়া ইলিশের আহরণ নিষিদ্ধ সময়ে জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা এবং নানা আর্থিক সুবিধা দেয়ার কারণে জেলেরা মাছটির প্রজননকালে মৎস্য শিকার থেকে বিরত থাকছেন।

পেশায় শিক্ষক মো. লোকমান এখন ভোলা সদর উপজেলার জেলেদের সচেতনতা বৃদ্ধিতে গৃহীত বিভিন্ন কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, এখানে ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হলো জেলার স্থানীয়দের মধ্যে ইলিশ রক্ষায় গৃহীত কার্যক্রমগুলো বেশ জনপ্রিয় হয়েছে। এখানে সরকার যে আইন মানতে বলছে, জনগণ সেটা মানছে। প্রায় ১০-১৫ বছরের প্রচেষ্টার ফলে স্থানীয়রা এখন আর জাটকা ধরছে না। অবৈধ জাল ব্যবহারও কমে গিয়েছে অনেক। ব্রুডের নিষিদ্ধ সময়ে ডিম দেয়া মা-মাছ ধরা হচ্ছে না। এ নিয়মগুলো মানার কারণে জেলায় এখন ইলিশ উৎপাদন বেড়ে চলেছে। স্থানীয় মানুষকে ব্যাপকভাবে সচেতন করা, জেলেদের সাপোর্ট দেয়া, বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা এবং জেলে ও ইলিশের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা, মহাজন, আড়তদার, নৌকার মালিক, জালের মালিক সবাইকে আইন অমান্য করলে আইনের আওতায় আনার কারণে এখানে ইলিশ উৎপাদনে প্রভাব রাখছে।

জানা গেছে, ১৯৯০ সালের দিকেও সারা দেশে সাগর-নদী মিলিয়ে ইলিশের বার্ষিক উৎপাদন ছিল দুই লাখ টনের নিচে। ২০০১-০২ অর্থবছরে দেশে মোট ইলিশ আহরণ হয় ২ লাখ ২০ হাজার টন। সেখান থেকে ক্রমান্বয়ে বাড়তে বাড়তে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে তা দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৩৩ হাজার টনে। বর্তমান বিশ্বে ইলিশের মোট আহরণের ৮০ শতাংশই হয় বাংলাদেশে। এক্ষেত্রে নদী থেকে ইলিশ আহরণের দিক থেকে সবচেয়ে বড় ভূমিকা ভোলা জেলাই রাখছে।

এ বিষয়ে মৎস্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ড. সৈয়দ আরিফ আজাদ বলেন, ইলিশ উৎপাদন ও আহরণ বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার যে পরিকল্পনা নিয়েছে, তা বাস্তবায়নের জন্য প্রজননস্থল ও অভয়ারণ্য এলাকাগুলোকে সংরক্ষণ করতে হবে, যেটি ভোলায় বেশ ভালোভাবেই হচ্ছে বিধায় স্থানীয়রা তার সুফল পাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে মাছের ব্রিডিং জোনে (প্রজননস্থল) পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। নদীর ঊর্ধ্ব অববাহিকা অঞ্চল এখন অনিরাপদ হয়ে উঠেছে। অতিমাত্রায় দূষণের কারণে বুড়িগঙ্গা থেকে চাঁদপুর পর্যন্ত নদী এলাকায় ইলিশের বিচরণ কমে গিয়েছে। অন্যদিকে ভোলার নদী এলাকায় দূষণ অনেক কম। সামনের দিনগুলোয় জেলাটিতে ইলিশ উৎপাদন ধরে রাখতে হলে সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ নিতে হবে।