রাজধানীর প্রধান বাণিজ্যিক এলাকা মতিঝিল। এখানকার একখণ্ড ভূমি যেন সোনার চেয়েও দামি। অথচ এ এলাকায় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) ৫১টি বাণিজ্যিক প্লট বেদখল হয়ে আছে। সরকারি হিসাবে যার আর্থিক মূল্য ১ হাজার ৬৭০ কোটি টাকা। নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে এতগুলো প্লট বেদখলের পেছনে রাজউক কর্মকর্তাদের অসাধু মানসিকতাই দায়ী। শিগগিরই সেগুলো দখলে নিয়ে সরকারকে আর্থিক ক্ষতির হাত থেকে বাঁচানোর তাগিদ দিয়েছেন তারা। তবে রাজউকের দাবি, কাঙ্ক্ষিত দর না পাওয়ায় প্লটগুলো বরাদ্দ দেয়া হয়নি।

রাজউকের ২০১৮-১৯ অর্থবছরের হিসাবসংক্রান্ত কমপ্লায়েন্স অডিট প্রতিবেদনে বেদখল প্লট নিয়ে আপত্তি তুলেছে কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল বাংলাদেশ (সিএজি)। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে তারা জানিয়েছে, মতিঝিলে রাজউকের ৫৫৬ দশমিক ৮১ কাঠা বাণিজ্যিক প্লট বেদখল অবস্থায় রয়েছে। এসব জমিতে অবৈধ দোকান, স্থাপনা, গাড়ির গ্যারেজ, কাউন্টার ইত্যাদি নির্মাণের সুযোগ করে দেয়ায় সরকারের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬৭০ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। এ হিসাব করা হয়েছে প্রতি কাঠা ৩ কোটি টাকা মূল্য ধরে। তবে মতিঝিলের প্লট মালিকরা জানিয়েছেন, বাস্তবে ওই এলাকায় জমির দাম ১০-১৫ গুণ বেশি। অর্থাৎ প্রতি কাঠা জমির দাম অন্তত ৩০-৪০ কোটি টাকা। এ হিসাব ধরলে মতিঝিলে রাজউকের বেদখল জমির মূল্য দাঁড়ায় ২০ থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকা। আর এ ক্ষতির জন্য নিরীক্ষা প্রতিবেদনে রাজউক কর্মকর্তাদের দায়ী করে বলা হয়েছে, প্লটগুলো দখলমুক্ত করার জন্য রাজউক যথাসময়ে কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়ায় বিপুল পরিমাণ এ আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।

গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠান রাজউক। এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে মতিঝিলে প্লট বেহাতের বিষয়ে মন্ত্রণালয় থেকে জরুরি ভিত্তিতে উদ্যোগ নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রণালয়টির সচিব কাজী ওয়াছি উদ্দিন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘নিরীক্ষা প্রতিবেদনের আলোকে যথাযথ প্রক্রিয়ায় বেদখল প্লটগুলো উচ্ছেদের ব্যাপারে শিগগিরই ব্যবস্থা নেয়া হবে।’  

বেদখল প্লটগুলো রয়েছে মতিঝিলের সম্প্রসারিত এলাকায়। বিভিন্ন আকৃতির মোট ৫৩টি প্লট রয়েছে সেখানে। এর মধ্যে কেবল দুটি বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। বাকি ৫১টি প্লটই বেদখলে চলে গেছে; যেখানে গড়ে তোলা হয়েছে অবৈধ দোকান ও গাড়ির গ্যারেজ। সরেজমিনে মতিঝিলের ওই এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বিসমিল্লাহ অটো পার্টস, জনতা অটো পার্টস, শামীম এন্টারপ্রাইজ, বরকতউল্লাহ বাম্পার হাউজ, বরকতউল্লাহ এন্টারপ্রাইজ, সিটি অটোস, ভাই ভাই অটোমোবাইলস, আলামিন মোটরস অ্যান্ড ওয়ার্কশপ, তানভীর অটো পার্টস, মনির কার্পেটিং সেন্টার, শিকদার অটোমোবাইল, রাজিব অটো পার্টস, ভিআইপি অটো পার্টস, এসএফ কার সেন্টার, মেসার্স আলিম মোটরস, মহামায়া ফার্নিচার ঘর ইত্যাদি নামে প্রায় ১৫০ স্থাপনা রয়েছে রাজউকের সেই জমিতে। এগুলো থেকে মূলত ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতারা ভাড়া ওঠায়। বরাদ্দ দিতে না পারা প্লটগুলো কোনো নিরাপত্তা বেষ্টনী ছাড়াই বছরের পর বছর ফেলে রেখে রাজউকই অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের সুযোগ করে দিয়েছে বলে মনে করেন স্থানীয়রা।

এ বিষয়ে কথা হয় স্থানীয় দোকানি মনসুর আলীর সঙ্গে, যিনি দীর্ঘদিন ধরেই মতিঝিল এলাকায় ব্যবসা করছেন। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা পাকিস্তান আমলে ঢাকায় এসেছি। সেই থেকে মতিঝিলেই থাকি। এক সময় এখানে (রাজউকের পড়ে থাকা প্লট) নৌকা দিয়ে চলাচল করতাম। এদিকে যে জমিগুলো আছে, প্রকৃত ম্যাপে দেখা যাবে বেশির ভাগই খাস। অবৈধভাবে দখলে নিয়ে দোকানপাট তুলে ভাড়া দিয়ে রেখেছেন স্থানীয় নেতারা। সরকার অভিযান চালালে প্রায় সব দোকানই ভাঙা পড়বে।’

বেদখল প্লট উদ্ধার করে পরিকল্পিতভাবে ভূমি ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগের অধ্যাপক ড. খন্দকার সাব্বির আহমেদ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘গত দেড় দশকে রাজধানীর অন্যান্য এলাকায় বাণিজ্যিক এরিয়া বাড়ায় মতিঝিলের একক নির্ভরতা অনেকটাই কমে আসে। হয়তো সে কারণে প্লট বরাদ্দ না দেয়ার যুক্তিটা আমরা মেনে নিতে পারি। কিন্তু সেই প্লটগুলো বেদখল থাকবে, স্থাপনা নির্মাণ করে অন্যরা আর্থিকভাবে লাভবান হবে এটা কোন যুক্তিতে মেনে নেব? রাজউককে অবশ্যই অতিদ্রুত প্লটগুলো দখলমুক্ত করে পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করতে হবে। ভালো হয় এখানে যদি মিশ্র ভূমি ব্যবহার করা যেতে পারে।’ 

এত বিশাল অংকের জমি বেদখল থাকা রাজউকের সক্ষমতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে বলে মন্তব্য করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবান ও রিজিওনাল প্ল্যানিং বিভাগের অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান। বণিক বার্তাকে এ নগর পরিকল্পনাবিদ বলেন, ‘রাজউকের নাকের ডগায় যদি তারা বেদখল প্লট উদ্ধার করতে না পারে তাহলে বৃহত্তর ঢাকার দায়িত্ব পালন করবে কীভাবে? সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি অবশ্যই নতুন করে ভাবতে হবে। তাছাড়া রাজউকের হিসাবে যে প্লটের মূল্য ৩ কোটি টাকা, সেটার মূল্য কীভাবে ৪০ কোটি পর্যন্ত গিয়ে ঠেকে, এটাও ভাবার বিষয়। দামের এত হেরফেরের কারণে সরকার আর্থিকভাবে ক্ষতি হচ্ছে। এ সমস্যার জন্যও রাজউক দায়ী বলে মনে করি।’

এত বছর ধরে রাজউকের প্লট বেদখল থাকার পেছনে রাজউকের কোনো কর্মকর্তার যোগসাজশ আছে কিনা বিষয়টি তদন্ত করার দাবি জানিয়ে আদিল মুহাম্মদ বলেন, ‘দখলদাররা এতদিন আর্থিকভাবে লাভবান হলেও ক্ষতি হয়েছে সরকারের। এটা খুবই দুঃখজনক ঘটনা। এর পেছনে সংশ্লিষ্টদের হাত আছে কি না বিষয়টি তদন্ত করা প্রয়োজন।’ 

মতিঝিলের প্লট অবৈধ দখলের বিষয়ে জানতে চাইলে রাজউক চেয়ারম্যান আনিছুর রহমান মিঞা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমার জানামতে বাংলাদেশ ব্যাংকের আশপাশে কিছু প্লট বরাদ্দ দেয়া যায়নি। মূলত যে মূল্যে আমরা সেগুলো বরাদ্দ দিতে চেয়েছি তা না পাওয়ায় প্লটগুলো এভাবেই থেকে যায়। আমরা উদ্যোগ নিয়েছি সেখানে অবৈধ দখল উচ্ছেদ করে একটি ওয়াটার বডি ও পার্ক নির্মাণের। এ বিষয়ে প্রাথমিক পরিকল্পনাও করে ফেলেছি।’