চলতি মাসে অবসরে গেছেন ঢাকা মহানগর জেনারেল হাসপাতালের রেডিওলজি বিভাগের কনসালট্যান্ট ডা. সেলিনা আক্তার। নতুন ডাক্তার নিয়োগ না হওয়ায় আপাতত হাসপাতালটির রেডিওলজি বিভাগের সেবা বন্ধ রয়েছে। ফলে রোগীরা এক্স-রে ও আল্ট্রাসনোগ্রাফি করতে পারছে না। অন্যদিকে আগামী জুনে কর্মজীবন শেষ হবে প্যাথলজি বিভাগের প্রধান ও হাসপাতালের পরিচালক ডা. আম্মাতে নূর ওয়াহিদা সুলতানার। তিনি অবসরে গেলে বন্ধ হয়ে যাবে প্যাথলজি বিভাগও।
রেডিওলজি ও প্যাথলজি বিভাগ বন্ধ হওয়ার পর বিভাগ দুটির সঙ্গে সম্পৃক্ত গাইনি বিভাগের সব ধরনের কার্যক্রমও বন্ধ করে দিতে হবে হাসপাতালটিকে। এরই মধ্যে হাসপাতালটির সার্জারি বিভাগে চিকিৎসক না থাকার কারণে সিজারিয়ান ছাড়া আর কোনো অস্ত্রোপচার হচ্ছে না।
হাসপাতালটির ডেঙ্গু চিকিৎসার জন্য বেশ সুনাম রয়েছে। গত বছর দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়লে এ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে ভিড় লেগে যায় মানুষের। তবে এ বছর আর ডেঙ্গুর কোনো রোগী ভর্তি রাখা যাবে না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
ঢাকা মহানগর জেনারেল হাসপাতালটি রাজধানীর নয়াবাজার এলাকায় বুড়িগঙ্গা দ্বিতীয় সেতুর পাশে অবস্থিত। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অধীনে ১৫০ শয্যাবিশিষ্ট এ হাসপাতালে ৩১ ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা আছে। কভিড প্রাদুর্ভাবের সময় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এ হাসপাতালে আইসিইউ স্থাপন করা হয়েছিল। হাই ফ্লো অক্সিজেন সরঞ্জামও বসানো হয়েছিল। হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, জনবল কাঠামো অনুযায়ী এ হাসপাতালে ৩১ জন চিকিৎসক থাকার কথা। কিন্তু আছেন ১৬ জন। চিকিৎসক সংকটের কারণে ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে একের পর এক বিভাগ। এমনকি হাসপাতালটির জরুরি বিভাগও চলছে জোড়াতালি দিয়ে। এ বিভাগে পাঁচজন চিকিৎসক থাকার কথা। বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছেন দুজন। জরুরি বিভাগে চিকিৎসক না থাকায় হাসপাতালটিতে গুরুতর রোগী ভর্তি না রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
হাসপাতালের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসার ক্ষেত্রে হাসপাতালটির বেশ সুনাম রয়েছে। গত বছর অন্তত ৫০০ ডেঙ্গু রোগী এ হাসপাতাল থেকে সেবা নিয়ে সুস্থ হয়েছে। কিন্তু এ বছর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিয়েছে কোনো ডেঙ্গু রোগী ভর্তি নেবে না। এর কারণ হলো জরুরি বিভাগে চিকিৎসক সংকট। তাছাড়া পরীক্ষা-নিরীক্ষারও সুযোগ এখন বন্ধ হয়ে গেছে। ডেঙ্গু রোগীর অবস্থা যেকোনো সময়ই খারাপ হতে পারে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এ ঝুঁকি নেবে না।’
মহানগর জেনারেল হাসপাতালে বিভিন্ন রোগের পরীক্ষা করাতে সর্বনিম্ন ২০ থেকে সর্বোচ্চ ৬০০ টাকা খরচ হয়। এ হাসপাতালে ১০টি কেবিন আছে। কর্তৃপক্ষ ভর্তি রোগীদের অন্তত ৪৫ ধরনের ওষুধ বিনামূল্যে দিয়ে থাকে। গড়ে ৪০০ রোগী বর্তমানে বহির্বিভাগ থেকে দিনে চিকিৎসা নিচ্ছে। ভর্তি হয় পাঁচ-ছয়জন। গতকাল হাসপতালটিতে মোট ১৪ জন রোগী ভর্তি ছিল। যার মধ্যে নয়জনই গাইনি ওয়ার্ডের রোগী।
সরজমিন দেখা গেছে, হাসপাতালের মেডিসিন ও গাইনি বিভাগের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। গাইনি বিভাগেও রয়েছে লোকবল সংকট। এখানে দুজন কনসালট্যান্ট থাকার কথা। বর্তমানে একজন কনসালট্যান্ট রয়েছেন। তিনিই রোগী দেখেন। আবার তিনিই সিজারিয়ান অপারেশন করেন। সপ্তাহে তিনদিন রোগী দেখেন, আর তিনদিন অস্ত্রোপচার করেন।
হাসপাতালটির গাইনি বিভাগের কনসালট্যান্ট ডা. সাকিলা খাতুন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সংকটের মধ্য দিয়ে চলছে হাসপাতালটি। এ নিয়ে অনেক বলা হলেও কোনো সমাধান হয়নি। এক্স-রে ও আল্ট্রাসনোগ্রাম বন্ধ হয়ে গেছে। কয়েকদিন পর প্যাথলজিও বন্ধ হয়ে যাবে। এরপর তো আমি গাইনি বিভাগে কোনো অপারেশন করাতে পারব না। আমার রোগীকে পাঠিয়ে দিতে হবে মিটফোর্ডে। এখানে বিনামূল্যে সিজার করা হয়। এ সেবা থেকে রোগীরা বঞ্চিত হবে। সরকার কেন যে এখানে ডাক্তার দিচ্ছে না বলতে পারছি না।’
করোনাকালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এ হাসপাতালে পাঁচটি আইসিইউ শয্যা ও ১২টি হাই ফ্লো অক্সিজেন সরঞ্জাম স্থাপন করলেও এসব যন্ত্রপাতি একদিনের জন্যও ব্যবহৃত হয়নি বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। এসব যন্ত্র এখন ঠিক আছে কিনা তা-ও তারা বলতে পারছেন না।
হাসপাতালটির পরিচালক ডা. আম্মাতে নূর ওয়াহিদা সুলতানা বলেন, ‘আইসিইউগুলো আমাদের না। এগুলো স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের। এসব যন্ত্রপাতি নিয়ে যেতে আমরা তিনবার চিঠি দিয়েছি। এখন পর্যন্ত মেশিনগুলো সরানো হয়নি।’
সার্বিক বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. নিশাত পারভীন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘একটা সময় হাসপাতালটির জৌলুস ছিল। এখন সেটা ধীরে ধীরে কমছে। আমাদের বড় সংকট চিকিৎসকের। সব ধরনের যন্ত্রপাতি আছে। কিন্তু চিকিৎসক না থাকলে সেগুলো চালু করব কীভাবে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে চিকিৎসক দিলে আবার হাসপাতালটি আগের উদ্যমে চালানো সম্ভব হবে। আগে নার্সও ছিল না। এখন নার্স নিয়োগ হয়েছে। কোনো রকমে হাসপাতালটি চলছে।’










