জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, জরুরি ভিত্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে টিকাদান কার্যক্রম জোরদার ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা উন্নত না করলে পরিস্থিতি আরো নাজুক হতে পারে। একই সঙ্গে টিকা নেয়ার পরও অনেক শিশু আক্রান্ত হওয়ার ঘটনাকে উদ্বেগজনক হিসেবে দেখছেন তারা।
স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত আট সপ্তাহে ঢাকা বিভাগে ২৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ২১ জন মারা গেছে মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে। বাকি তিনজনের মৃত্যু হয়েছে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে। এছাড়া গত দুই সপ্তাহে শুধু রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালেই ১২টিরও বেশি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জে গত তিন মাসে চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৭ মার্চ থেকে গতকাল সকাল পর্যন্ত শতাধিক শিশু ভর্তি হয়েছে। এ হাসপাতালে মৃত্যু হয়েছে পাঁচ শিশুর। চট্টগ্রামে অন্তত ২৪ শিশু বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে। সিলেটেও গত তিনদিনে ৩০ জন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছে। এছাড়া রংপুর বিভাগের আট জেলায় গত দুই সপ্তাহে ১১৬টি নমুনা পরীক্ষায় ছয়জনের হাম ও চারজনের রুবেলা শনাক্ত হয়েছে। এছাড়া স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২৪ মার্চ পর্যন্ত খুলনায় নয় এবং বরিশালে ৩৯ জন আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আগের সরকারের স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাতের দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি বন্ধ করে স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনায় যাওয়ায় টিকাদান কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়। এ কারণে হামের প্রাদুর্ভাব বাড়তে পারে বলে মনে করেন জ্যেষ্ঠ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. আবু জামিল ফয়সাল। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘বর্তমানে হঠাৎ করে হামসহ টিকা প্রতিরোধযোগ্য রোগের বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে, যার পেছনে একাধিক কাঠামোগত ও প্রশাসনিক কারণ রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পূর্বের স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাতের দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি বন্ধ করে স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনায় যাওয়ায় টিকাদান কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়। এতে অপারেশনাল পরিকল্পনার মাধ্যমে টিকা সরবরাহ, অর্থায়ন ও মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়। এছাড়া আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর অর্থায়ন কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠেছে।’
স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে পাওয়া তথ্যে ঢাকা বিভাগের ভেতরে সংক্রমণের আরো বিস্তৃত চিত্র উঠে এসেছে। ২৮ মার্চ পর্যন্ত গত দুই মাসে এ বিভাগে ৬০১ জন আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকায় সর্বোচ্চ ৩৯১ রোগী শনাক্ত হয়েছে। এছাড়া ঢাকা জেলায় ৩০, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকায় ৬৯, নারায়ণগঞ্জে ৩১, নারসিংদীতে ১৬ ও গাজীপুরে ২০ জন আক্রান্ত হয়েছে। পাশাপাশি কিশোরগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, শরীয়তপুর ও টাঙ্গাইলেও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে।
রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, চলতি বছরের শুরু থেকে ২৬ মার্চ পর্যন্ত রাজশাহী বিভাগে মোট ৩৪২টি সন্দেহজনক হাম (মিজলস) রোগীর তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ২৪৬ জনের নমুনা ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করা হয় এবং ৭৭ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে।
রাজশাহী বিভাগে হামের প্রকোপ অন্যান্য সময়ের তুলনায় বেড়েছে বলে জানান রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক হাবিবুর রহমান। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জাতীয় হাম রুবেলা টিকাদান (এমআর) ক্যাম্পেইন চলে চার বছর পরপর। সর্বশেষ ক্যাম্পেইন হয়েছিল ২০২০-২৪ সাল পর্যন্ত। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নানা কারণে এমআর ক্যাম্পেইনে বিলম্ব হয়। প্রজেক্ট না থাকায় ক্যাম্পেইন চালাতে পারেনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তবে আশা করছি শিগগিরই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা হাম রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন চালু করতে পারব।’
তিনি আরো জানান, রাজশাহী বিভাগের চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পাবনা ও কুষ্টিয়া জেলায় প্রকোপ বেশি। অন্য জেলায় তেমন নেই। রাজশাহীতেও হামের প্রকোপ তুলনামূলকভাবে কম। তাছাড়া রামেক হাসপাতালে আইসিইউ ফ্যাসিলিটি থাকার কারণে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর ও পাবনা থেকে রোগী আসছে। এ কারণে রামেক হাসপাতালে চাপ বেশি পড়ছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, শিবগঞ্জ, গোমস্তাপুরসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় শিশুদের মধ্যে এ রোগের প্রাদুর্ভাব দ্রুত বাড়ছে। গত তিন মাসে হামে আক্রান্ত হয়ে চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে প্রায় ৬০০ শিশু হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে। জেলার শিশু ও নবজাতক বিভাগের কনসালট্যান্ট মাহফুজ রায়হান এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
পাবনা জেনারেল হাসপাতালেও হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। গতকাল বেলা ১টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় সাতজন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছে। চিকিৎসাধীন ২৫ জন। ছোঁয়াচে রোগ হামের পরিস্থিতি সামলাতে হাসপাতালের এক কোণে পৃথক ‘হাম আইসোলেশন কর্নার’ খোলা হয়েছে। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বছরের শুরু থেকেই দু-একজন হামে আক্রান্ত রোগী আসছিল। জানুয়ারি থেকে গতকাল দুপুর পর্যন্ত মোট ১১৮ রোগী চিকিৎসা নিয়েছে। গত এক সপ্তাহে রোগীর চাপ কিছুটা বেড়েছে। অধিকাংশ রোগী নয় মাসের কম বয়সী। হাসপাতালের পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম জানান, ৩৮ শয্যার শিশু ওয়ার্ডে রোগী ভর্তি আছে ২০৬ জন। এর মধ্যে হামে আক্রান্ত রোগী ২৫ জন। ফলে চিকিৎসক-নার্সদের কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে।
হামের সংক্রমণ দেখা গেছে সিলেটেও। সিলেট শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালের ৪ নম্বর ইউনিটকে আইসোলেশন সেন্টার হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। সেখানে ২৬ মার্চ থেকে গত তিনদিনে ৩০ রোগী ভর্তি হয়েছে। হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে হাসপাতালে ১৬ জন ভর্তি আছে।
সিলেট শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মো. মিজানুর রহমান জানান, এখানে গত তিনদিনে ৩০ জন ভর্তি হয়েছিল। এর মধ্যে ১৪ জন বাড়ি ফিরেছে। গতকাল তিনজন নতুন করে ভর্তি হয়েছে।
সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মাহবুবুর রহমান জানান, যেহেতু এটি ছোঁয়াচে রোগ, তাই প্রথমদিকে ওসমানীতে আলাদা আইসোলেশন করে রোগীদের চিকিৎসা দেয়া হয়। রোগীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় ২৬ মার্চ শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালকে আইসোলেশন কেন্দ্র করা হয়েছে।
চট্টগ্রামেও হামের উপসর্গ নিয়ে অন্তত ২৪ জন বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হাম ও হামজনিত নিউমোনিয়ার লক্ষণ নিয়ে ১২ জন, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে দুই, মা ও শিশু হাসপাতালে ছয়, চট্টগ্রাম ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দুই এবং বোয়ালখালী ও হাটহাজারীতে দুই শিশু ভর্তি আছে।
চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মিশু তালুকদার জানান, মা ও শিশু হাসপাতালে গত ১০ দিনে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হওয়া তিনজন মারা গেছে। মারা যাওয়া তিন শিশুর মধ্যে একজনের স্যাম্পল সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছিল। বাকি দুজনের উপসর্গ ছিল। বর্তমানে আইসিইউতে ভর্তি আছে ছয়জন।
তবে হামে মৃত্যুর ঘটনা সঠিক নয় বলে দাবি করেন চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘হামে আক্রান্ত হয়ে কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। গত কয়েকদিনে বেশ কয়েকজন আক্রান্ত রোগী এসেছে। তাদের মধ্যে কেউ মারা গেছে বলে আমার কাছে কোনো তথ্য নেই। চট্টগ্রামে হাম টিকার কোনো সংকট নেই। এটি স্বাভাবিক নিয়মে চলছে। হাসপাতালগুলোতে আমাদের হাম প্রতিরোধে সব প্রস্তুতি আছে।’
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত ১২ দিনে হামে আক্রান্ত হয়ে পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গতকাল সকাল ১০টা পর্যন্ত হামে আক্রান্ত ৭০ শিশু ময়মনসিংহ মেডিকেলে ভর্তি আছে। শিশুদের জন্য কোনো আইসিইউ না থাকায় শিশুমৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ছে। হাসপাতালের শিশু বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. আক্তারুজ্জামান বলেন, ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধিরা নিয়মিত নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করছেন। শিশুদের টিকাদানে কোনো সমস্যা বা গ্যাপ থাকার কারণে এ প্রাদুর্ভাব কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। টিকা দেয়ার পরও অনেক শিশুর হাম হয়েছে। বিষয়টি আমাদের চিন্তায় ফেলেছে।’
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মোহাম্মদ মাঈন উদ্দিন খান জানান, চলতি মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে হাসপাতালে হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা অস্বাভাবিক হারে বাড়তে শুরু করে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ২৪ মার্চ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তিনটি পৃথক মেডিকেল দল গঠন করে এবং শিশু ওয়ার্ডে তিনটি কক্ষে ১০ শয্যাবিশিষ্ট ‘হাম কর্নার’ চালু করা হয়েছে।
এদিকে পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার নতুন করে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা টিকা ক্রয়ের জন্য বরাদ্দ দিয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, গত আট বছর নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে ঘাটতির কারণেই এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এদিকে স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, আগামী জুলাই-আগস্টে সারা দেশে বিশেষ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে শিশুদের হামের টিকা দেয়া হবে।










