শহরকে উন্মুক্ত তারবিহীন করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে সিলেট সিটি
করপোরেশন (সিসিক)। এরই
মধ্যে শহরের শাহজালাল মাজার সড়কের কিছু অংশে ভূগর্ভস্থ বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন
স্থাপনও করা হয়েছে, যা বিভিন্ন মহলে
প্রশংসা কুড়িয়েছে। তবে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের
ভূগর্ভস্থ বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন
প্রকল্পের কারণে বিপাকে পড়েছে শহরের ইন্টারনেট সংযোগদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো।
তারা বলছেন, বৈদ্যুতিক খুঁটিতে
তার পেঁচিয়ে এত দিন ইন্টারনেট সংযোগ দেয়া হতো।
কিন্তু ভূগর্ভস্থ বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন
স্থাপনের ফলে শহরের বৈদ্যুতিক খুঁটিগুলো অপসারণ করা হবে। এ অবস্থায় সড়কে খুঁটি না
থাকলে ইন্টারনেট সংযোগ দেয়া সম্ভব হবে না। কারণ বিদ্যুতের মতো ইন্টারনেট সংযোগের
লাইন ভূগর্ভে স্থাপনে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। যা বর্তমানে ইন্টারনেট সেবাদানকারী
প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। এছাড়া ভূগর্ভস্থ লাইনের কারণে গ্রহকদের
খরচও কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। রয়েছে কারিগরী সমস্যাও।
সিলেটের কয়েকটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলে
জানা গেছে, এসব প্রতিষ্ঠান
ইন্টারনেট সংযোগের তার টানানোর জন্য বিদ্যুতের খুঁটি ব্যবহার করে। সেই খুঁটি না
থাকলে ইন্টারনেটের তার টানানো যাবে না। আবার মাটির নিচ দিয়ে তার নিয়ে যাওয়ার ব্যয়
বহনের ক্ষমতা নেই বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানের। ফলে নগরীর প্রায় ৬০ হাজার ব্রডব্যান্ড
ইন্টারনেট গ্রাহকের ভোগান্তিতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে সিলেট সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ বলছে, ভূগর্ভস্থ লাইন
স্থাপন করা হয়ে গেলে বিদ্যুতের সব খুঁটি অপসারণ করতেই হবে। এতে ইন্টারনেট সেবা
ব্যাহত হলে আইনগতভাবে তাদের কোনো দায়দায়িত্ব নেই।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের
সিলেট কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে,
প্রাথমিক
অবস্থায় সিলেট নগরীর সাত কিলোমিটার বিদ্যুৎ লাইন ভূগর্ভস্থ
করার কাজ চলছে। এতে ব্যয় হচ্ছে ৫৫ কোটি টাকা। এরই মধ্যে নগরের হজরত শাহজালাল (রহ.) দরগা এলাকায়
ভূগর্ভস্থ বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন
পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হয়েছে। এছাড়া বিদ্যুতের তার ভূগর্ভে স্থানান্তরের কাজ
শেষ হয়েছে আরো কয়েকটি এলাকায়। এর মধ্যে রয়েছে আম্বরখানা ইলেকট্রিক সাপ্লাই থেকে
চৌহাট্টা মোড় ও বন্দরবাজার এলাকার সিটি পয়েন্ট হয়ে সিলেট সার্কিট হাউজ, চৌহাট্টা মোড় থেকে
রিকাবীবাজার হয়ে নবাব রোড এলাকার বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড বাগবাড়ি কার্যালয়, পূর্ব জিন্দাবাজার
থেকে জেলরোড মোড় পর্যন্ত। চলতি মাসের শেষের দিকে এসব এলাকার বিদ্যুতের খুঁটি
অপসারণের কাজ শুরু করবে কর্তৃপক্ষ।
এসব প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, সিলেটে ব্রডব্যান্ড
ইন্টারনেট সেবা দেয় ছোট-বড় ৩৫-৪০টি প্রতিষ্ঠান। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় সরকারি, বেসরকারি ও
ব্যক্তিগত মিলিয়ে প্রায় ৬০ হাজার গ্রাহক রয়েছেন এসব প্রতিষ্ঠানের। অধিকাংশ
প্রতিষ্ঠানেরই কার্যালয় নগরীর জিন্দাবাজার এলাকায়। এই এলাকায়ও ভূগর্ভস্থ বিদ্যুৎ সঞ্চালন স্থাপনের
আওতাভুক্ত। তাই এখানকার বিদ্যুতের খুঁটিগুলোও অপসারণ করা হবে। আর খুঁটিগুলো সরিয়ে
নেয়া হলে ইন্টারনেট সেবা দেয়ার ক্ষেত্রে বিপাকে পড়বে প্রতিষ্ঠানগুলো।
ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান লিংক থ্রির সিলেট শাখার প্রধান
মাসুদ রানা বলেন, মাটির নিচ দিয়ে লাইন
নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত ব্যয়বহুল। বর্তমানে আমরা গ্রাহকদের মাত্র ১ হাজার
টাকায় ইন্টারনেট সংযোগ দিতে পারছি। মাটির নিচ দিয়ে তার টানাতে হলে সেই খরচ ৫-৬
হাজার টাকায় উঠে যাবে।
এ সমস্যা নিয়ে এরই মধ্যে একাধিকবার সিসিক ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের
সঙ্গে বৈঠকও করেছে ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। তবে এতে কোনো সুরাহা
হয়নি। শুরুতে বিদ্যুতের খুঁটি অপসারিত হলে সড়কবাতির খুঁটিগুলোয় সুশৃঙ্খলভাবে
কয়েকটি ইন্টারনেট সঞ্চালন লাইনের ব্যবস্থা করার কথা দিয়েছিল সিটি কর্তৃপক্ষ।
কিন্তু ২০ ফেব্রুয়ারি তারা আগের দেয়া আশ্বাস থেকে সরে এসেছে। সর্বশেষ গত শনিবার
বিকালে সাধারণ নাগরিকদের অবগতির জন্য একটি বিশেষ বিজ্ঞপ্তি গণমাধ্যমে পাঠায় সিসিক।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়,
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের
উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় মাটির নিচ দিয়ে বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন নেয়ার কাজ এখন শেষ পর্যায়ে।
কিছুদিনের মধ্যে ভূগর্ভস্থ বিদ্যুৎ লাইনের আওতায় আসা
এলাকার বৈদ্যুতিক খুঁটি এবং তাতে থাকা সব তার অপসারণ করা হবে। খুঁটিতে থাকা
ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের তারগুলোও অপসারণ করা হবে। এতে ইন্টারনেট সংযোগ বিঘ্নিত
হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এসব বিষয়ে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি), নেশনওয়াইড
টেলিকমিউনিকেশন ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক
(এনটিটিএন) ও ইন্টারনেট সার্ভিস
প্রোভাইডার (আইএসপি) কর্তৃপক্ষের সঙ্গে
কয়েক দফা সভা করেও কোনো সমাধানে পৌঁছানো যায়নি।
সিলেট নেট ব্রডব্যান্ডের পরিচালক ওয়াহিদুর রহমান বলেন, শুধু আমাদের ব্যবসার
স্বার্থে নয়, নগরবাসীর নির্বিঘ্ন
ইন্টারনেট সেবা পাওয়ার সুবিধার্থেই বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা দরকার।
সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বিধায়ক রায় চৌধুরী বলেন, নগরীর বিদ্যুতের
খুঁটিগুলোয় তারের জঞ্জাল রয়েছে। খুঁটিগুলো সরিয়ে নিলে জঞ্জাল কমবে। খুঁটিগুলো
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের।
এতে সিটি করপোরেশনের কোনো দায়িত্ব থাকার কথা নয়। তিনি বলেন, ইন্টারনেট
সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরে এসব খুঁটি ব্যবহার করছে। এখন ভূগর্ভস্থ
বিদ্যুৎ লাইন হলে সেগুলো
সরিয়ে নেয়া ছাড়া বিকল্প নেই।
এ বিষয়ে তারবিহীন বিদ্যুৎ উন্নয়ন প্রকল্পের
পরিচালক কেএম নাজিম উদ্দিন বলেন,
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড
নিজেদের প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। ভূগর্ভস্থ বিদ্যুৎ লাইনের কাজ শেষে হলে সড়কের পাশের বিদ্যুতের
খুঁটিগুলো সরিয়ে নেয়া হবে। ইন্টারনেট কেবল অথবা স্থানীয় কেবল অপারেটর সেবাদানকারী
প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নিজ দায়িত্বে গ্রাহকদের লাইন সঞ্চালন করবে।










