ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের শিবচর এলাকায় গত ১৯ মার্চ দুর্ঘটনায় পড়ে ইমাদ পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাস। এ ঘটনায় মৃত্যু হয় ১৯ যাত্রীর। আহতের সংখ্যাও কম নয়, ২৬। মাঠ পর্যায়ে গিয়ে এ দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করেছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) একটি বিশেষজ্ঞ দল। দুর্ঘটনার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে টায়ার ফেটে যাওয়াকে চিহ্নিত করেছেন প্রতিষ্ঠানটির বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, ইমাদ পরিবহনে ব্যবহূত টায়ারটি ছিল ‘দুর্বল মানের’।

মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার ওই দুর্ঘটনাটির তদন্ত হয়েছে এআরআইয়ের পরিচালক অধ্যাপক ড. সামছুল হকের নেতৃত্বে। বাংলাদেশে বাণিজ্যিক পরিবহনের টায়ার ব্যবহারের ক্ষেত্রে মানের দিক দিয়ে ছাড় দেয়া হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দুর্ঘটনাকবলিত ইমাদ পরিবহনের বাসে ব্যবহূত টায়ারটি মানের দিক দিয়ে ছিল দুর্বল। ঘটনাটি তদন্ত করতে গিয়ে আমরা দেখেছি, টায়ারের গায়ে লেখা আছে ১৪টি প্লাই। কিন্তু টায়ার কেটে ছয়টি প্লাইও পাইনি।’

টায়ার ফেটে দুর্ঘটনায় শীর্ষে ট্রাক: দেশে যত দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়, তার একটি বড় অংশের জন্য যানবাহনে নিম্নমানের টায়ার ব্যবহারকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। ২০০৭ সালে টাঙ্গাইল-বঙ্গবন্ধু সেতু-সিরাজগঞ্জ করিডোরে দুর্ঘটনা নিয়ে একটি গবেষণা করেছিল বুয়েট। ২০টি বড় দুর্ঘটনা তদন্ত করে নয়টির জন্য যানবাহনের ত্রুটিকে দায়ী করা হয়। এর আটটিই ছিল টায়ার ফেটে যাওয়ার কারণে সংঘটিত দুর্ঘটনা। বুয়েট থেকে সম্পাদিত ‘ইনভলভমেন্ট অব ভেহিকল ফ্যাক্টরস ইন রোড অ্যাকসিডেন্টস’ শীর্ষক গবেষণায় বলা হয়েছে, টায়ার ফেটে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা হয় ট্রাকে। দুর্ঘটনার হার ৫৯ শতাংশ। আর ২০ শতাংশ দুর্ঘটনা হয় হালকা যানবাহনে। বাসের ক্ষেত্রে টায়ার ফেটে দুর্ঘটনায় পড়ার হার ১৮ শতাংশ। অন্যদিকে টায়ার ফেটে যত দুর্ঘটনা ঘটে, তার ৩ শতাংশ সংঘটিত হয় মোটরসাইকেলে।

দাম বেশি, মানে ছাড়: দেশের শীর্ষস্থানীয় পরিবহন কোম্পানিগুলোর একটি হানিফ এন্টারপ্রাইজ। বাসে ব্যবহূত বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রাংশ কেনার দায়িত্বে রয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) মো. শামীম হোসেন। বণিক বার্তাকে তিনি জানিয়েছেন, বর্তমানে হানিফ পরিবহনের বাসগুলোয় যেসব টায়ার ব্যবহার করা হয়, সেগুলোর প্রতিটির দাম পড়ে ৩৫ হাজার টাকা। এক বছর আগেও তা ৩০ হাজার ২০০ টাকায় কিনেছেন তারা। ২০২০ সালে প্রতিটি টায়ারের দাম ছিল ২৭ হাজার ৪০০ টাকা। ভালো রাস্তায় চলাচল করলে একটি নতুন টায়ার পেছনের চাকায় ছয় মাস আর সামনের চাকায় দুই মাস চালানো যায় বলে জানিয়েছেন এ পরিবহন কর্মকর্তা।

দেশে প্রতি বছরই বাড়ছে টায়ারের দাম। পণ্যটির চাহিদার সিংহভাগই পূরণ হয় আমদানির মাধ্যমে। বর্তমানে টায়ারের বাজারে বাড়তি প্রভাবক হিসেবে দাঁড়িয়েছে ডলারের ঊর্ধ্বমূল্য। ফলে দাম বেড়ে যাওয়ায় বাণিজ্যিক পরিবহনের মালিকরা টায়ারের মানে ছাড় দিচ্ছেন বলে মনে করেন বুয়েটের অধ্যাপক ড. সামছুল হক। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রেই আমরা দেখেছি টায়ার ব্যবহারের ক্ষেত্রে মানে ছাড় দেয়া হচ্ছে। ২০১৯ সালের দিকে একটা টায়ারের দাম ছিল ২২ থেকে ২৮ হাজার টাকা। এখন সেটার দাম অনেক বেড়েছে। স্বাভাবিকভাবেই পয়সা বাঁচানোর জন্য দুর্বল মানের টায়ার ব্যবহারের প্রবণতা মালিকদের মধ্যে রয়েছে।’

বড় হচ্ছে টায়ারের বাজার: অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দেশে বাড়ছে বাণিজ্যিক পরিবহনের সংখ্যা। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে টায়ার ব্যবহার, বড় হচ্ছে বাজার। বুয়েটের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি মাসে টায়ারের চাহিদা রয়েছে ৬০ হাজার ইউনিট, যার সিংহভাগই পূরণ হয় আমদানির মাধ্যমে। বাণিজ্যিক যানবাহনের ক্ষেত্রে এ দেশের টায়ারের বাজারে শীর্ষস্থানে রয়েছে ভারতীয় টায়ার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান মাদ্রাজ রাবার ফ্যাক্টরি বা এমআরএফ। খাতসংশ্লিষ্টদের হিসাবে বাণিজ্যিক গাড়ির ৩০ শতাংশ টায়ারের চাহিদাই এমআরএফ পূরণ করে। ভারতীয় আরো তিন প্রতিষ্ঠান বিড়লা, অ্যাপোলো, সিয়াট পূরণ করে যথাক্রমে ১০, ৫ ও ৩ শতাংশ বাণিজ্যিক গাড়ির টায়ারের চাহিদা। দক্ষিণ কোরিয়ার টায়ার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হ্যানকক পূরণ করে ১ শতাংশ চাহিদা। বাকি ৫১ শতাংশই পূরণ করা হয় চীনের বিভিন্ন নন-ব্র্যান্ড কোম্পানি ও বাংলাদেশের গাজী টায়ার, হুসেইন টায়ারের মতো প্রতিষ্ঠান থেকে। বর্তমানে বাংলাদেশে বাণিজ্যিক গাড়ির টায়ারের বাজার ৫ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি চলে এসেছে বলে জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

বাণিজ্যিক গাড়িতেও ব্যবহার হচ্ছে রিসাইকেল টায়ার: হানিফ এন্টারপ্রাইজের ডিজিএম শামীম হোসেন জানিয়েছেন, আদর্শ মানদণ্ড অনুযায়ী হানিফ এন্টারপ্রাইজসহ অনেক প্রতিষ্ঠান ও বাণিজ্যিক যানবাহনে একটি নতুন টায়ার ব্যবহার হয় দুই থেকে ছয় মাস পর্যন্ত। এরপর এসব টায়ারের একটা বড় অংশই রাবারিং করে রিসাইকেল করা হয়। বর্তমানে রাবারিং করা একেকটি টায়ারের দাম পড়ে মানভেদে ১৪-১৮ হাজার টাকা। পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে চলাচল করা ট্রাকগুলোয় রিসাইকেল টায়ার ব্যবহার বেশি হচ্ছে। দামে কম হওয়ার কারণে ট্রাকচালক ও মালিকরা কম দামের এসব টায়ার ব্যবহার করেন। নিম্নমানের টায়ার ব্যবহারের কারণে ট্রাকের টায়ার ফেটে দুর্ঘটনার হার বেশি বলে জানিয়েছেন তারা।

আমদানি ও মাঠ পর্যায়ে তদারকি নেই: দেশে বাণিজ্যিক পরিবহনের টায়ারের বাজার ৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেলেও পণ্যটি আমদানির ক্ষেত্রে কোনো ধরনের তদারকি হয় না বলে জানিয়েছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. সামছুল হক। তিনি বলেন, ‘দেশে যেসব টায়ার আমদানি করা হচ্ছে, সেগুলোর মান নিয়েও কিন্তু সরকারিভাবে কোনো নজরদারি নেই। ফলে দেশের বাজারে নিম্নমানের টায়ার প্রবেশের একটা সুযোগ থেকেই যাচ্ছে।’ টায়ারের ব্যাপারে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) বড় ভূমিকা রাখার সুযোগ আছে বলে মনে করেন এ বিশেষজ্ঞ।

সাধারণত একটি টায়ারের মেয়াদ ধরা হয় উৎপাদনের পর থেকে পাঁচ বছর। তবে অভিযোগ রয়েছে, বাণিজ্যিক গাড়িতে ব্যবহারের ক্ষেত্রে মেয়াদের এ সময়সীমা নিয়ে পরিবহন চালক বা পরিবহন মালিক কেউই সচেতন নন। অন্যদিকে মাইলেজ বেশি পাওয়ার জন্য টায়ারের নির্ধারিত ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি বাতাস ভরে রাখেন চালকরা। নিম্নমানের টায়ারে ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি বাতাস ভরে রাখার কারণে প্রতিনিয়ত টায়ার ফেটে দুর্ঘটনা ঘটছে।

টায়ার নিয়ে এসব অনিয়ম দূর করতে আমদানি পর্যায় থেকেই আদর্শ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা উচিত বলে মনে করেন দেশের সড়ক পরিবহন খাতের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ মজুমদার। এ প্রসঙ্গে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাণিজ্যিক পরিবহনগুলোকে প্রতি বছর ফিটনেস সনদ হালনাগাদ করতে হয়। এক্ষেত্রে আমরা ব্যবহূত টায়ারের মানসহ আনুষঙ্গিক বিষয় খতিয়ে দেখি। কিন্তু শুধু আমাদের এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশে ব্যবহূত টায়ারের মান নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। প্রথম উদ্যোগটি আসতে হবে আমদানি পর্যায় থেকে। মানসম্মত টায়ার আমদানি করতে হবে। পাশাপাশি পরিবহন মালিক ও চালকদেরও টায়ার ব্যবহার সম্পর্কে সচেতন হবে।’