স্বাধীনতার ৫০ বছরেও নড়াইলে নড়াইল বিসিক শিল্পনগরী গড়ে ওঠেনি। অনুকূল পরিবেশ, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও বিসিক শিল্পনগরী না থাকায় এ জেলায় আজও কোনো ধরনের শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে প্রথম দিকে অর্থ ছাড় না দেয়ায় এবং পরে জায়গা নির্ধারণে জটিলতাসহ বিভিন্ন কারণে নড়াইলে বিসিক শিল্পনগরীর কার্যক্রম ফাইলবন্দি হয়ে আছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা শিল্পনগরী স্থাপনের ব্যাপারে বিসিক চেয়ারম্যান ও শিল্পসচিবের কাছে একাধিক আবেদন করেও সুফল পাননি। ৩৪ বছরে চারবার জায়গা নির্ধারণী কার্যক্রমেই সীমাবদ্ধ নড়াইল বিসিক শিল্পনগরী। সর্বশেষ ২০২১ সালে নড়াইল-যশোর সড়কের ধোপাখোলা এলাকার উজিরপুর মৌজায় প্রায় ২০০ একর জায়গা নির্ধারণ করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হলেও এ পর্যন্ত কোনো অগ্রগতি হয়নি। এরই মধ্যে দেশের ৬১টি জেলায় বিসিক শিল্পনগরী গড়ে উঠেছে। স্বাধীনতার এত বছর পেরিয়ে গেলেও নড়াইলে শিল্পনগরী গড়ে না ওঠায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নড়াইলের বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ। দ্রুত বিসিক শিল্পনগরী গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮৪ সালে নড়াইল জেলা প্রতিষ্ঠা হয়। এর তিন বছর পর ১৯৮৭ সালে জেলায় বিসিকের কার্যক্রম শুরু হয়। পরের বছর ১৯৮৮ সালে বিসিক শিল্পনগরী স্থাপনের লক্ষ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু হয়। সে লক্ষ্যে পরিকল্পনা কমিশনের আইএমইডি (ইন্টারনাল মনিটরিং অ্যান্ড ইভাল্যুয়েশন ডিভিশন) বিসিক, শিল্প মন্ত্রণালয়সহ আন্তঃমন্ত্রণালয়ের চার সদস্যের কমিটি পরিদর্শনে এসে শহর থেকে তিন কিলোমিটার দূরে নড়াইল-মাগুরা সড়কের রঘুনাথপুর মৌজায় ১৫ একর জমি নির্বাচন করে এবং ১৯৯০ সালের ১১ জুন ভূমি মন্ত্রণালয় জমি অধিগ্রহণের চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়। জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণও নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু ওই সময় শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে টাকা ছাড় না পাওয়ায় জমি অধিগ্রহণ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
দীর্ঘ আট বছর পর ১৯৯৮ সালে বিসিক খুলনার আঞ্চলিক পরিচালকসহ চার সদস্যের একটি টিম নড়াইলে এসে নতুন করে নড়াইল শহর থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার দূরে চিত্রা নদীর অন্য পারে বোড়াবাদুরিয়া-সীমাখালী মৌজার ১৫ একর জমি নির্বাচন করে প্রতিবেদন দাখিল করে। এ লক্ষ্যে জমি অধিগ্রহণের জন্য বিসিক ২০০১ সালের ২৮ আগস্ট জেলা প্রশাসকের কাছে চিঠি পাঠালেও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের একটি অংশের বিরোধিতার কারণে জেলা প্রশাসক ২০০১ সালের ৬ নভেম্বর শিল্পনগরীর স্থান পরিবর্তনের জন্য বিসিকের ঢাকা কার্যালয়ের চেয়ারম্যানের কাছে চিঠি পাঠান।
এরপর প্রায় ১৭ বছর পর ২০১৬ সালের ৮ নভেম্বর সদর উপজেলার মুলিয়া ইউনিয়নের নড়াইল-যশোর সড়কসংলগ্ন বাঁশভিটা নামক স্থানে নড়াইলের সাবেক উপব্যবস্থাপক জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে বিসিক শিল্পনগরী গড়ে তুলতে স্থান নির্ধারণ করেন এবং ১৫ একর জমি ক্রয়ের সুপারিশ পাঠান। বিভিন্ন কারণে এ জমিতেও (বাঁশভিটা নামক স্থানে) বিসিক গড়ে তোলার জন্য স্থানীরা বাধা দেন। পরে ২০২১ সালে বিসিকের চেয়ারম্যান নড়াইল পরিদর্শনে এসে শহরের ধোপাখোলা এলাকায় বিসিক শিল্পনগরী গড়ে তোলার আশ্বাস দিয়ে জেলা প্রশাসককে ৩০০ একর জমি অধিগ্রহণের জন্য নির্দেশনা দেন। নড়াইল-যশোর সড়কের ধোপাখোলা এলাকায় উজিরপুর মৌজায় প্রায় ২০০ একর জায়গা নির্ধারণ করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাবনা পাঠানো হলেও আজ পর্যন্ত এর অগ্রগতি নেই।
স্থানীয় ব্যবসায়ী কাজী জহিরুল হক জানান, পদ্মা সেতু এবং কালনা সেতু চালু হলে নড়াইল থেকে ঢাকার দূরত্ব হবে মাত্র ১২৬ কিলোমিটার। তখন ২ ঘণ্টায় নড়াইল থেকে ঢাকা যাওয়া সম্ভব হবে। এতে ভৌগোলিকভাবে নড়াইল জেলার গুরুত্ব বেড়ে যাবে। নড়াইলে শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার জন্য এরই মধ্যে দেশের খ্যাতনামা কোম্পানিগুলো জমি কিনতে শুরু করেছে। এ কারণে নড়াইলে সরকারিভাবে বিসিক শিল্পনগরী গড়ে তোলা প্রয়োজন।
স্থানীয় ব্যবসায়ী মুন্সী মিশন বলেন, নড়াইলে সড়ক ও নৌ-পথের সহজ এবং উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা রয়েছে। কাঁচামাল সরবরাহসহ এ জেলায় রয়েছে প্রচুর জনশক্তি। শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোক্তাও রয়েছেন কিন্তু জায়গার অভাবে তারা শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারছেন না। ১৯৮৪ সালে নড়াইল জেলা প্রতিষ্ঠার পর এ পর্যন্ত চারবার বিসিক শিল্পনগরী প্রতিষ্ঠার জন্য জায়গা নির্ধারণ করা হলেও তা আজও বাস্তবায়ন হয়নি। অবিলম্বে জায়গা নির্ধারণ করে বিসিক শিল্পনগরী স্থাপনের দাবি জানান তিনি। নড়াইল জেলা উন্নয়ন কমিটির নেতা কাজী হাফিজুর রহমান বলেন, জেলার উন্নয়নের স্বার্থে কমপক্ষে বিসিক শিল্পনগরী স্থাপন হওয়া প্রয়োজন।
নড়াইল চেম্বারের সভাপতি হাসানুজ্জামান জানান, নড়াইলে বিসিক শিল্পনগরী গড়ে উঠলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১০ জেলার উদ্যোক্তারা আকৃষ্ট হবেন। শুধু জায়গা নির্ধারণ নয়, চাই বিসিক শিল্পনগরী গড়ে ওঠায় জরুরি পদক্ষেপ। বিসিক নড়াইল কার্যালয়ের উপব্যবস্থাপক মো. মামুনুর রশীদ বলেন, নড়াইলে বিসিক শিল্পনগরী গড়ে তোলার জন্য কার্যক্রম চলমান। বর্তমানে ডিপিপি প্রণয়নের কাজ চলছে। দ্রুত বিসিক শিল্পনগরী গড়ে তোলা হবে বলে আশা প্রকাশ করেন বিসিকের এ কর্মকর্তা।










