শীতের শুরুতেই গোপালগঞ্জে ভাটাগুলোয় শুরু হয়েছে ইট তৈরির কাজ। সাধারণত ইট তৈরিতে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয় মাটি। এসব মাটির জোগান আসছে কৃষিজমি থেকে। এছাড়া অপরিকল্পিত পুকুর খনন, মাছের ঘের তৈরি ও জমির মাটি কেটে বাড়ির ভিটা উঁচু করা হচ্ছে। নির্মাণ হচ্ছে শিল্প-কারখানা, ফিলিং স্টেশন ও বাণিজ্যিক স্থাপনা। এতে কমছে কৃষিজমির পরিমাণ। পাশাপাশি জমির উর্বরতা হারাচ্ছে। কৃষি অধিদপ্তরের হিসাব বলছে, গত পাঁচ বছরে জেলায় কৃষিজমির পরিমাণ কমেছে প্রায় ১২৯ হেক্টর, যার প্রভাব পড়ছে ফসল উৎপাদনে।
স্থানীয় কৃষকরা বলছেন, কৃষিপ্রধান এ অঞ্চলের মোট আবাদি ভূমির প্রায় ৬০ শতাংশ বিলবেষ্টিত নিম্ন জলাভূমির একফসলি জমি। ওইসব জমির টপ সয়েল (উপরিভাগের মাটি) কাটা হচ্ছে না। পাঁচটি উপজেলার মধ্যে মুকসুদপুরে বেশির ভাগ জমিতে তিন-চারটি ফসল ফলে। এ কারণে এ অঞ্চলটির কৃষিজমির টপ সয়েল কাটার প্রবণতা বেশি।
মুকসুদপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এ উপজেলায় মোট কৃষিজমির পরিমাণ প্রায় ২৭ হাজার ৬৩৯ হেক্টর। গত পাঁচ বছরে চাষযোগ্য জমির পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে ২৭ হাজার ৫১০ হেক্টরে। প্রতি বছরই কৃষিজমির শ্রেণী পরিবর্তন করে পুকুর, মাছের ঘের, বাড়িঘর, কারখানা, ফিলিং স্টেশন নির্মাণ করা হচ্ছে। এছাড়া জমির টপ সয়েল কেটে বিক্রি করা হচ্ছে ইটভাটায়।
এ ব্যাপারে মুকসুদপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জমির টপ সয়েল কাটার কথা শুনেছি। এ ঘটনায় উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সম্প্রতি একজনকে কারাদণ্ড দিয়েছেন। তবে কী পরিমাণ জমি থেকে প্রতি বছর টপ সয়েল কাটা হয়, সে পরিসংখ্যান আমাদের কাছে নেই।’
সরজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার কাশালিয়া ও পশারগাতী ইউনিয়নে টপ সয়েল কাটা হচ্ছে। আর জলিপাড়, মহারাজপুর, উজানী, বাঁশবাড়িয়া, বাটিকামারীসহ বিভিন্ন বিলবেষ্টিত ইউনিয়নে জমির শ্রেণী পরিবর্তনের ঘটনা ঘটে চলেছে।
জমির টপ সয়েল কাটা নিয়ে কাশালিয়া গ্রামের কৃষক ফয়েজ শেখ ও পশারগাতী গ্রামের ওসমান মোল্যা বলেন, ‘জমির ওপরের অংশের মাটি কৃষক ইটভাটায় বিক্রি করে দিচ্ছেন। এজন্য তারা ভালো অংকের টাকাও পাচ্ছেন। টপ সয়েল দিয়ে ভালো মানের ইট তৈরি হয় বলে শুনেছি।’
জাতীয় ভূমি ব্যবহার নীতি ২০০১-এর ৫.৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, উর্বর কৃষিজমি, যেখানে বর্তমানে দুই বা ততোধিক ফসল উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে, তা কোনোক্রমেই অকৃষিকাজের জন্য যেমন ব্যক্তি মালিকানাধীন নির্মাণ, গৃহায়ন, ইটভাটা তৈরি ইত্যাদির জন্য ব্যবহার করা যাবে না।
ভূতত্ত্ববিদরা বলছেন, ফসল উৎপাদনে টপ সয়েল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। টপ সয়েল হলো জমির উৎকৃষ্ট প্রাণ। জমির ওপরের ৮-১০ ইঞ্চি পর্যন্ত মাটিকে সাধারণত উর্বর অংশ বলা হয়। মূলত ওই অংশেই থাকে মূল জৈবশক্তি।
বাংলাদেশ মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট গোপালগঞ্জ আঞ্চলিক গবেষণাগারের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. মাহবুবুর রশিদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জমির টপ সয়েলে হাইড্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, দস্তা, জৈব পদার্থ, মাইক্রোঅর্গানসহ বিভিন্ন উপাদান বিদ্যমান। তাই টপ সয়েল কাটলে জামির উর্বরতা শক্তি কমে যায়। এতে কৃষি উৎপাদনও কমে।’
সার্বিক বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর গোপালগঞ্জ খামারবাড়ির উপপরিচালক ড. মো. মামুনুর রহমান বলেন, ‘টপ সয়েল সাধারণত ইটভাটায় বিক্রি হয়। টপ সয়েল কাটা হলে জমির মারাত্মক ক্ষতি হয়। আমরা এটি কাটতে জমির মালিকদের নিরুৎসাহিত করছি। ১৫ সেন্টিমিটার গভীর করে টপ সয়েল কাটলে জমির উর্বরতা ও উৎপাদন অবস্থায় ফিরে আসতে ১০-২০ বছর সময় লাগে। জমির মালিককে এ বিষয়ে সচেতন করা হচ্ছে।’










